আমাকে মুক্তি দাও রাইনি! পাথরে পরিণত হতে দাও তুমি আমায়। আমার পথ এক, তোমার পথ আরেক। তোমার-আমার একপথে চলা সম্ভব নয় বোন! ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলল ওসমান।
ভালবাসা ত্যাগ চায়- বলল রাইনি- কী ত্যাগ দিতে হবে বল আমায়। আমি তোমায় কথা দিচ্ছি, তোমার যা মনে চায় কর, আমি তোমাকে বন্দী হতে দেব না।
আর আমি তোমায় ওয়াদা দিচ্ছি-কঠোর ভাষায় বলল ওসমান- আমার মন কি চায়, আমি কি করতে যাচ্ছি, কক্ষনো তা তোমায় বলব না। তোমার এই রূপসী শরীর আর রেশম-সুন্দর চুলের যাদুতে আমাকে আটকাতে পারবে না তুমি।
তারপরও আমার প্রমাণ দিতে হবে যে, তোমার জন্য আমি কি ত্যাগ দিতে পারি-রাইনি বলল- তাড়া আছে তো যাও ওসমান! তবে তোমার ঘরে যাওয়া থেকে আমি বিরত হবনা বলে রাখছি। যাব, আগের চেয়ে বেশী যাব।
আর দাঁড়ায় না ওসমানী ছুটে চলে সম্মুখপানে। রাইনি তাকিয়ে থাকে তার প্রতি। অন্ধকারে হারিয়ে যায় ওসমান। বেদনার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দেয় মেয়েটি।
***
ওসমান ঘরে পৌঁছে দেখে বারজিস তার দেউরিতে বসা। সোজা ভিতরে চলে যায় ওসমান। বাবা-মা-বোনের কাছে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে বলে, আমি সঙ্গীদের নিয়ে মেয়ে দুটোকে উদ্ধার করতে যাচ্ছি। আমাদের এ অভিযানে আন নূরকে প্রয়োজন।
ওসমান সারেমের বাবা পঙ্গু। যুবক বয়সে খৃষ্টানদের সঙ্গে লড়াই করে একটা পা ভেঙ্গে ফেলেছেন তিনি। পরবর্তী জীবনটা তিনি এই আফসোস করে করে কাটিয়ে দিয়েছেন যে, আহ! এখন আর আমার জিহাদ করার সামর্থ নেই। তিনি ওসমানকে বললেন- বৎস! এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সংকল্প নিয়েই ফেলেছ যখন, তো আমার যেন একথা শুনতে না হয় যে, তুমি তোমার সঙ্গীদের সাথে গাদ্দারী করেছ। এ অভিযানে ধরা পড়ার আশংকাই বেশী। শোন, যদি তুমি ধরা পড়ে যাও আর তোমার সঙ্গীরা নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়, তাহলে জীবন দিয়ে দেবে, তবু সঙ্গীদের নাম বলবে না। আমি তোমাকে সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনীর সৈনিক হয়ে যুদ্ধ করার জন্য বড় করেছি। ভেবেছিলাম, তোমার বোনটার বিয়ের কাজটা সম্পন্ন করে তোমাকে বিদায় দেব। যা হোক, তুমি যাও, আমার আত্মাকে শান্তি দাও! আবার শুনে নাও, আমি কারো মুখে একথা শুনতে চাই না যে, ওসমানের শিরায় সারেমের রক্ত নেই।
কন্যাকেও অনুমতি দিয়ে দেন পিতা। ওসমান সারেম জানায়, বারজিস দেউরীতে বসে আছেন। তিনিই এ অভিযানে আমাদের নেতত্ব দেবেন। বারজিসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য দেউরীতে চলে যান ওসমানের পিতা।
ওসমান সারেম আন-নূরকে বলে, এক্ষুণি তুমি তোমার এমন দুজন বান্ধবীকে ডেকে আন, যারা আমাদের এ অভিযানে অংশ নেয়ার সাহস রাখে। আন-নূর তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে পড়ে এবং দুবান্ধবীকে নিয়ে খানিক পরেই ফিরে আসে। এর মধ্যে ওসমান সারেমের এক সঙ্গী তার বোনকে সঙ্গে করে এসে উপস্থিত হয়।
এক এক করে এসে হাজির হয় ওসমান সারেমের সাত সঙ্গী। মেয়েরা কোন পথে কোথায় যাবে এবং কি করবে, বিষয়টা তাদের পরিস্কার করে বুঝিয়ে দেন বারজিস। বললেন, পথে একজন সেন্ট্রি তোমাদের পথ রোধ করবে। তোমরা তার কাছে উপরে যাওয়ার পথ কোন্ দিকে জিজ্ঞেস করবে। বলবে, সম্রাট রেনাল্ড আমাদের আসতে বলেছেন। কিন্তু আমরা পথটা ভুলে গেছি। তোমাদের একজন থাকবে চাকরানীর বেশে। তার মাথায় থাকবে টুকরি। সেন্ট্রিকে হত্যা করে আগুন লাগাতে হবে। আগুন লাগাবার উপাদান থাকবে চাকরানীর মাথার টুকরিতে। আগুন লাগাবার পর খঞ্জর দ্বারা উট-ঘোড়ার রশি কেটে দেবে। দুচারটি ঘোড়াকে খঞ্জর দ্বারা আঘাত করতে হবে। আঘাত খেয়ে ঘোড়াগুলো চীৎকার করে উঠে ছুটাছুটি করতে শুরু করবে এবং তাদের দেখা-দেখি অন্যান্য ঘোড়ার মধ্যেও আতংক সৃষ্টি হবে।
অল্প সময়ের মধ্যে মেয়েদের বেশ-ভুষা ঠিক করে নিতে বলেন বারজিস। চাকরানী সাজিয়ে দেন একজনকে। তাকে ছেঁড়া-মলিন-পুরাতন পোশাক পরতে দেন। মুখমন্ডলে ছাই-কালি মাখিয়ে দেন।
ওসমান সারেম ও তার সঙ্গীদের দিক-নির্দেশনা দিতে শুরু করেন বারজিস। ওসমান সারেমের পিতাও কিছু পরামর্শ দেন। তারপর প্রত্যেকের হাতে তুলে দেয়া হল একটি করে খঞ্জর। এ সব কাজে কেটে যায় অনেক সময়। সব আয়োজন সম্পন্ন। কিন্তু রাত গম্ভীর হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরো কিছুক্ষণ।
রওনা করার সময় হয়ে গেছে। আলাদা আলাদা গিয়ে নির্ধারিত এক স্থানে সমবেত হবে সকলে। মেয়েদের পথ আলাদা। কাজও ভিন্ন। আগুন লাগাবার দায়িত্ব তাদের। আগুন কখন লাগাবে, তার একটা নির্দিষ্ট সময় বলে দেয়া হয়েছে। ঠিক সে সময়ে আক্রমণের স্থানে উপস্থিত থাকতে হবে বারজিসের দলের। এ এক স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান। সময়ের সামন্য হেরফের কিংবা কারো একটুখানি ভুল হয়ে গেলে ফল বিপরীত। নির্ঘাত ধরা খাওয়া আর বন্দীশালার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষিপ্ত হওয়া। তারপর জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করা। সবচে বেশী ঝুঁকি মেয়েদের। কারণ ওরা নারী। ধরা খেয়ে গেলে তাদের পরিণতি কি হবে, তা অনুমান করা কঠিন নয়। আন নূর বলল, ধরা পড়ে গেলে খঞ্জর দ্বারা আমরা আত্মহত্যা করে ফেলব। জীবিত যাব না কাফেরদের হাতে।
.
গভীর রাত। নীরব-নিস্তব্দ কার্ক শহর। কোথাও কেউ জেগে নেই। নেই কোন সাড়াশব্দ। এক ফোঁটা আলো দেখা যাচ্ছে না কোথাও। জেগে আছে শুধু একটি প্রাসাদ। খৃস্টানদের সম্মিলিত বাহিনীর হেডকোয়ার্টার। খৃস্টান সম্রাট ও উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাদের আবাসও এটি। এটি তাদের পানশালা। শহর ঘুমিয়ে পড়ার পর জেগে ওঠে এ প্রাসাদ। রাত ভর চলে মদ-নারী আর নাচ-গানের আসর।
