***
বাড়ি অভিমুখে রওনা হয়েছে ওসমান সারেম। ঘরে পৌঁছুতে এখনো খানিক দেরী। হঠাৎ রাইনি আলেকজান্ডার তার মুখোমুখী দাঁড়িয়ে।
রাইনি ওসমানের বোন আন-নূরের বান্ধবী। এখন ভাই-বোন দুজনই চায় মেয়েটা তাদের ঘরে না আসুক। কিন্তু হঠাৎ নিষেধ করে দিয়ে মেয়েটাকে সন্দেহে ফেলতে চাইছে না ওসমান সারেম। ওসমানের সঙ্গেও অকৃত্রিম হতে চায় রাইনি। ওসমানের ধারণা, এভাবে চরিত্র নষ্ট করে মেয়েটা তার ঈমানী চেতনা ধ্বংস করার চেষ্টা করছে।
আজ রাস্তায় রাইনির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ওসমানের সন্ধ্যাবেলা। মুখে সামান্য হাসির রেশ টেনে না দাঁড়িয়ে মেয়েটাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চেষ্টা করে ওসমান। কিন্তু ওসমানের পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে যায় রাইনি। ওসমান সারেমের মনে এমন কোন ভয় নেই যে, একটি খৃস্টান মেয়ের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আলাপরত অবস্থায় ধরা পড়লে তাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে। ইহুদী-খৃস্টানরা বরং খুশীই হবে যে, যাহোক তাদের একটি মেয়ে একজন সন্দেহভাজন মুসলমানকে আপন করে নিতে পেরেছে। অগত্যা দাঁড়িয়ে যায় ওসমান। বলে, এখন পথ ছাড়, বড় তাড়া আছে আমার রাইনি!
না, তোমার কোন তাড়া নেই ওসমান! এত সহজে তুমি আমাকে দূরে সরিয়ে দিতে পারবে? বন্ধুসুলভ কণ্ঠে বলল রাইনি।
কই, তোমাকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি নাকি আমি! ওসমানের কণ্ঠে বিস্ময়।
মিথ্যা বল না ওসমান!- মুচকি হেসে বলল রাইনি- এই আমি তোমার ঘর– থেকে আসলাম। তোমার বোন আমাকে পরিস্কার বলে দিল, আমি যেন তোমার ঘরে কম আসি। আমি আসলে নাকি ওসমান নারাজ হয়….? কেন ওসমান! কথাটা তুমি আমায় নিজে বললে না কেন?
কোন জবাব দেয় না ওসমান। বোনের প্রতি রাগ আসে তার। এভাবে সরাসরি বলার তো কথা ছিল না। তাই রাইনির কথার জবাব দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে ওসমানের। ওসমানকে নীরব দেখে রাইনি বলে, আমাকে কারণটা তো বলবে যে, আমি কেন তোমার ঘরে আসব না?
রাইনির কথাটা কানে পৌঁছে না ওসমান সারেমের। মন তার অন্যত্র। মেজাজ ক্ষিপ্ত। বড় ব্যস্ত। রাইনিকে একটা বুঝ দিয়ে চলে যাওয়ার মত উপযুক্ত কোন জবাব মাথায় আসল না তার। অগত্যা সাদা-মাটা করে মনের আসল কথাটাই বলে ফেলে ওসমান। রাইনি! তুমি আমার ঘরে এস না কথাটা কেন যে আমি তোমাকে বলতে পারলাম না, জানিনা। এখন শুনে নাও। আমাদের পরস্পর যত প্রেম-ভালবাসাই থাকুক, জাতীয় পরিচয়ে আমি-তুমি একে অপরের দুশমন। তুমি হয়ত বলবে, এ ভালবাসা আমাদের ব্যক্তিগত, জাতিগত সম্পর্ক এখানে অবান্তর। কিন্তু আমি জাতীয় ভালবাসায় বিশ্বাসী, যা ক্রুশ ও কুরআনের মাঝে কখনো সৃষ্টি হতে পারে না। এটা আমার জন্মভূমি, বাসভূমি। তোমার জাতি এখানে করছে কি? যতদিন পর্যন্ত তোমার জাতির সর্বশেষ ব্যক্তিটিও এ মাটিতে বর্তমান থাকবে, ততদিন পর্যন্ত তোমর-আমার বন্ধুত্ব হতে পারে না। আমার মনের কথাটা আমি অকপটে তোমাকে বলে দিলাম। এবার যা বুঝ বুঝতে পার।
আর আমার মনে কী আছে, তাও তুমি শুনে নাও- রাইনি বলল- আমার হৃদয় থেকে তোমার ভালবাসা না বের করতে পারবে ক্রুশ, না পারবে কুরআন। তোমাকে না দেখলে আমি মনে শান্তি পাইনা। তোমাকে হাসতে দেখলে আমার আত্মাও হেসে উঠে। শোন ওসমান! তুমি যদি আমাকে তোমার ঘরে আসতে বারণই কর, তাহলে ভাল হবে না।
তুমি আমাকে হুকুম দিতে পার। তুমি শাসক সম্প্রদায়ের কন্যা। ঠান্ডা মাথায় বলল ওসমান।
আমার মনে যদি ক্ষমতার দম্ভ থাকত, তাহলে এ মুহূর্তে তুমি এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারতে না। অনেক আগ থেকেই তুমি পঁচে মরতে আমাদের বন্দীশালায়- রাইনি বলল- তুমি কি ভাবছ, আমি তোমার তৎপরতা সম্পর্কে কিছু জানি না? বল, তোমার আন্ডারগ্রাইন্ড তৎপরতার বিস্তারিত বিবরণ আমি তোমাকে শুনিয়ে দিই। বল, তোমার ঘর থেকে সমস্ত খঞ্জর,তীর-ধনুক, গোলা-বারুদ বের করে নিই, যা তুমি তোমার ঘরে লুকিয়ে রেখেছ আমার জাতি ও আমার সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য, যা তোমার ঘরে রাখার অনুমতি নেই। আন-নূরকে যে তুমি তরবারী চালনা শিক্ষা দিচ্ছ, তা কি আমি জানিনা? তোমার দলে আর কে কে কাজ করছে, তাও কি আমার অজানা? কিন্তু ওসমান! তুমি হয়ত জান না যে, তোমার আর বন্দীশালার মাঝে যে বস্তুটি প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি করে রেখেছে, তা হল আমার অস্তিত্ব। তুমি তো জান, আমার পিতা কে। জান তো, তিনি কি জানেন না আর কি করতে পারেন না। এই পাঁচবার তিনি ঘরে বলেছেন, ওসমানকে গ্রেফতার কথা আবশ্যক হয়ে পড়েছে। আমি সব কবার তার নিকট তোমার জন্য বিনীত সুপারিশ করে বলেছি, ওসমানের বোন আমার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। তার বাবা একজন পঙ্গু মানুষ। আপনি ছেলেটাকে রেহাই দিন। বাবা দু-তিনবার আমাকে ধমক দিয়ে বলেছেন, প্রয়োজনে আমি তোমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করব, তবু ছেলেটাকে ছাড়া যাবে না। তিনি আমায় এ-ও বলেছেন যে, মুসলমানের সঙ্গে তোমার এত মাখামাখি-ঘনিষ্ঠতা ঠিক হচ্ছে না। এসব তুমি ছেড়ে দাও। কিন্তু যেহেতু আমি বাবা-মার একমাত্র কন্যা, আদরের দুলালী, তাই তিনি আমাকে অসন্তুষ্টও করতে চাচ্ছেন না।
.
সূর্য ডুবে গেছে। অন্ধকার হয়ে আসছে চারদিক। নিঃশব্দ দাঁড়িয়ে আছে ওসমান সারেম। মন তার অন্য কোথাও। এবার কোন উত্তর না দিয়েই হাঁটা দেয় সে। দুপা ও এগুতে পারল না ওসমান। রাইনি ছুটে গিয়ে সম্মুখ থেকে এমনভাবে তার পথ আগলে দাঁড়ায় যে, বুকটা তার লেগে গেছে ওসমানের বুকের সঙ্গে। আলতোভাবে হাত দুটো রেখে দেয় ওসমানের দুকাঁধের উপর। ওসমানের আরো ঘনিষ্ঠ হয় মেয়েটি। যৌবনভরা দেহের উষ্ণ পরশে ওসমানকে ঘায়েল করার চেষ্টা করে রাইনি। রাইনির রেশম-কোমল চুলগুলো ছুঁয়ে যায় ওসমানের দুগন্ড। কেঁপে উঠে ওসমান। শিকারীর ফাঁদ থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য পিছনে সরে আসার চেষ্টা করে সে। বন্ধন ছেড়ে দেয় রাইনি।
