প্রয়োজন হামলার, না? অর্থাৎ প্রয়োজন উক্ত প্রাসাদে যারা আছে, তাদের সেখান থেকে সরে যাওয়া এবং মেয়েগুলোর সেখানে অবস্থান করা। অমনটি হলে আমাদের এই যুবকরা প্রাসাদে ঢুকে পড়ে মেয়েগুলোকে তুলে আনবে। এই তো বলতে চাচ্ছেন আপনি? বারজিসের পরিকল্পনাটা খোলাসা করে বুঝে নিতে চান ইমাম।
জি হ্যাঁ- পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে জবাব দেন বারজিস- যদি শহরে মারাত্মক ধরনের কোন হাঙ্গামা সৃষ্টি করে দেয়া যায়- যেমন, কোথাও আগুন লাগিয়ে দেয়া হল আর সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ল খৃস্টানদের সমর সরঞ্জামাদিতে, তাহলে হয়ত সম্রাটগণ এবং অন্যান্যরা প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে চলে যাবেন। এই সুযোগে…।
গভীর চিন্তায় হারিয়ে যান বারজিস। ওসমান সারেম ও তার সঙ্গীদের প্রতি এক এক করে দৃষ্টিপাত করেন তিনি। খানিক পরে বললেন, হ্যাঁ আমার মুজাহিদগণ! একটি জায়গায় যদি তোমরা আগুন লাগাতে পার, তাহলে মেয়েদের মুক্ত করার সুযোগ বেরিয়ে আসতে পারে।
জলদি বলুন, মোহতারাম! বলুন কোথায় আগুন লাগাতে হবে? আপনি বললে গোটা শহরেও আমরা আগুন ধরিয়ে দিতে প্রস্তুত আছি। অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে ওসমান সারেম।
খৃস্টানদের সামরিক ঘোড়াগুলো কোথায় বাঁধা থাকে, তা তো তোমরা জান-বারজিস বললেন- এ মুহূর্তে সেখানে অন্ততঃ ছয়শত ঘোড়া বাঁধা আছে। বাকীগুলো অন্যান্য স্থানে। নিকটেই বাধা আছে প্রায় সমপরিমাণ ঊট। তার খানিক দূরে দাঁড়িয়ে আছে শুকনো খড়ের বিশাল এক পাহাড়। তার থেকে সামান্য ব্যবধানে সেনা ছাউনির সারি। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে অনেকগুলো ঘোড়-গাড়ী আর বিপুল পরিমাণ এমন কিছু সরজ্ঞাম, যাতে সহজে আগুন ধরে যেতে পারে। কিন্তু চাইলেই সেখানে যাওয়া যায় না। অস্ত্র হাতে টহল দিচ্ছে সেন্ট্রিরা। রাতের বেলা সে পথে গমন করার অনুমতি নেই কারুর। তোমরা যদি এই খড়ের গাদা আর তাঁবুর সারিতে আগুন ধরিয়ে দিতে পারি, তাহলে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, খৃস্টান সম্রাটগণ জগতের সবকিছু ভুলে গিয়ে তৎক্ষণাৎ প্রাসাদ ত্যাগ করে সেখানে ছুটে যাবে। আগুনের লেলিহান শিখা আকাশ স্পর্শ করবে। আতংক ছড়িয়ে পড়বে শহরময়। তাছাড়া আগুন লাগাবার সঙ্গে সঙ্গে যদি তোমরা যত সম্ভব ঘোড়ার রশি খুলে দিতে পার, তাহলে আতংকিত ঘোড়াগুলো এদিক-ওদিক ছুটাছুটি শুরু করে সৃষ্টি করবে আরেক প্রলয়কান্ড। মানুষজন পিষ্ট হবে তাদের পায়ের তলায়। কিন্তু আগুন কে লাগাবে, ঘোড়ার বাঁধন কে খুলবে এবং আগুন লাগাবার জন্য সেখানে কিভাবে পৌঁছুবে, তাই আগে ভাববার বিষয়।
ধরে নিন, আগুন লেগে গেছে। প্রাসাদও শূন্য হয়ে গেছে। এখন আমাদের করণীয় কি? জিজ্ঞেস করে এক যুবক।
আমি সঙ্গে থাকব- জবাব দেন বারজিস-উক্ত প্রাসাদে আমাকে ছাড়া তোমরা যেতে পারবে না। ওখানে আমার দুজন সহকর্মী আছে। তারাই জানাবে, মেয়েরা কোথায় আছে। কিন্তু মেয়ে দুটোকে উদ্ধার করে এনে রাখবে কোথায়? তাছাড়া ঘটনার পর কার্কের সাধারণ মুসলমানদের উপর যে কেয়ামত নেমে আসবে, তা-ও তোমাদের ভেবে দেখা দরকার। এ যে মুসলমান ছাড়া অন্য কারো কাজ নয়, খৃস্টানরা তা নিশ্চিতভাবেই বুঝে নেবে।
মুসলমানরা এখন কি সুখে আছে! বললেন ইমাম- আমার পরামর্শ, কাজটা হয়ে যাক। খৃস্টানরা জানা দরকার যে, মুসলমান যতই নিরাশ্রয়, যতই অসহায় হোক না কেন, কারো গোলাম হয়ে থাকতে রাজী নয়। আর মুসলমানের আঘাত যে দুশমনের কলিজা ছেদিয়ে দেয়, তাও ওদের টের পাইয়ে দেয়া জরুরী।
বারজিস কমান্ডো ধরনের গোয়েন্দা বটে। কিন্তু এ জাতীয় নাশকতামূলক অভিযানের সুযোগ তার কখনো ঘটেনি। এমন দুর্ধর্ষ অভিযান পরিচালনা করা তার মতেও আবশ্যক, যাতে খৃষ্টানরা বুঝতে পারে যে, মুসলমান কেমন চীজ।
ওসমান সারেম ও তাঁর সঙ্গীদের কর্তব্য বুঝাতে শুরু করলেন বারজিস। দুটি কাজ বেশী স্পর্শকাতর। প্রথমতঃ আগুন ধরানোর জন্য যাবে তিন-চারটি মেয়ে। সেনা প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার নাম করে সেন্ট্রির কাছে গিয়ে আলাপ জুড়ে দিয়ে এক পর্যায়ে সেন্টিকে খুন করে ফেলবে তারা। বারজিসের এ কাজের জন্য মেয়েদের নির্বাচন করার কারণ, মহিলারা, বিশেষত যুবতী মেয়েরা পুরুষের মনে যে প্রভাব ফেলতে পারে, তা পুরুষরা পারে না। দ্বিতীয়তঃ কজন যুবক সম্রাটদের প্রাসাদে আক্রমণ চালাবে। বারজিস ও ইমাম একমত হলেন যে, বেশী প্রয়োজন নেই-মাত্র এই আটজনই যথেষ্ট। কারণ, লোক বেশী হলে কেউ না কেউ ধরা পড়ে যাওয়ার আশংকা থাকবে।
প্রশ্ন আসে, এতগুলো সাহসী বুদ্ধিমতী মেয়ে পাওয়া যাবে কোথায়। ওসমান সারেম বলল, একজন থাকবে আমার বোন আন-নূর। আরেক যুবক বলল, আমার বোনকেও নেয়া যাবে। অপুর ছয় যুবকের বোন নেই। তবে এরা দুজন এদের বান্ধবীদের মধ্য থেকে একজন করে নিতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়। চারজনই যথেষ্ট। মেয়েদেরকে কাজ বুঝিয়ে দেয়ার দায়িত্ব নিজের হাতে রাখেন বারজিস।
সূর্য ডুবে গেছে। ইমাম সাহেব উঠে চলে গেছেন একদিকে। অন্যরা এক এক করে বেরিয়ে পড়ে ইমামের ঘর থেকে। সকলের শেষে বের হলেন বারজিস। এখন আবার তিনি মুচি। হাতে বাক্স। দুনিয়াটায় কি ঘটছে কিছু জানেন না। এঁকে-বেঁকে, হেলে দুলে হাঁটছে। গায়ে এক ফোঁটা বল নেই যেন। জগতের সব বেদনা আর দুঃখ যেন এসে চেপে বসেছে তার ঘাড়ে।
