অস্থিরচিত্তে ঘরের বারান্দায় পায়চারী করছেন ইমাম। ওসমান সারেমকে দেখেই তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, তুমি কি ঐ বন্দী মুসলমানটার আহাজারি শুনেছ ওসমান?
আমি সেই ডাকে লাব্বাইক বলতেই এসেছি মহামান্য ইমাম! বারজিস আসছেন। আমার সাত বন্ধুও আসছে। বলল ওসমান সারেম।
তুমি কী করবে? করতে পারবেই বা কী? আমাদের অনেক মেয়েই তো কাফেরদের হাতে বন্দী। কিন্তু এ মেয়ে দুটো আমাকে মহা এক পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছে। বললেন ইমাম। খানিক নীরব থেকে মাথাটা উপরে তুলে গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ইমাম আবার বললেন, ইয়া আল্লাহ! এই একটি রাতের জন্য তুমি আমায় যুবক বানিয়ে দাও, না হয় আজ রাতেই আমাকে তুমি তোমার কাছে নিয়ে যাও। বেঁচে থাকলে আজীবন মেয়ে দুটোর আর্তচীৎকার আমার কানে বাজতেই থাকবে আর আমি পাগল হয়ে যাব।
আপনি আমাদের পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করুন। আমি আশা করি, এক রাতের বেশী আপনাকে অস্থির থাকবে দেব না। বলল ওসমান সারেম।
ভিতরে প্রবেশ করে ওসমান সারেম-এর দুসঙ্গী। ইমাম তাদের বসতে বলে তিনজনকেই উদ্দেশ করে বললেন
আজ আমার মনে হচ্ছে, আমার বিবেক-বুদ্ধি সব হারিয়ে গেছে। আমি আমার নিয়ন্ত্রণ হারিয়া ফেলেছি। কিন্তু কেউ যদি আত্মমর্যাদাবোধের কথা স্মরণ করিয়ে আহ্বান জানায়, তাহলে চেতনা ক্ষেপে উঠে আর তখনই তাকে শান্ত করার জন্য যুবক হতে হয়। কিন্তু বৎসরা! আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি। এখন আর আমার সহনশক্তি নেই। তোমরা যা কিছু করতে চাও, সামলে কর।
এক একজন করে সাত যুবকই সমবেত হয় ইমামের ঘরে। মুচিও এসে পড়ে খানিক পরে। হাতে তার বাক্স। ভিতরে পুরনো ছেঁড়া জুতো আর জুতা সেলাইয়ের যন্ত্রপাতি। ভিতরে ঢুকেই বাক্সটা এক ধারে রেখে কোমর সোজা করে দাঁড়ায় সে। এবার কে বলবে লোকটা দুনিয়ার সব কোলাহল- ঝক্কি-ঝামেলার সাথে সম্পর্কহীন একজন মুচি, যে রাস্তার পার্শ্বে বসে মানুষের ছেঁড়া জুতা সেলাই করে?
ইমাম সাহেবের রুদ্ধদ্বার ঘরে এখন সে মুচি নয়- বারজিস। আলী বিন সুফিয়ানের গোয়েন্দা বিভাগের গোপন শাখার একজন অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ গুপ্তচর। ইমামকে উদ্দেশ করে তিনি বললেন
এ ছেলেটি আজই ঐ মেয়ে দুটোকে খৃস্টানদের বন্দীদশা থেকে উদ্ধার করে আনতে চায়। আমি মনে করি, এতে ধরা পড়ার কিংবা ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিই নয়- মৃত্যুর ঝুঁকিও প্রায় ষোল আনা।
আমরা এ ঝুঁকি বরণ করে নিচ্ছি মোহতারাম বারজিস! আপনি এ বিদ্যার গুরু। আপনি আমাদের পথনির্দেশ করবেন। বলল এক যুবক।
তাহলে আমার পরামর্শ শোন- বারজিস বললেন- খৃস্টানদের কাছে অনেক মুসলমান মেয়ে আছে। তাদের কতিপয়কে তারা শৈশবে বিভিন্ন কাফেলা ও বাড়ি-ঘর থেকে অপহরণ করে এনেছিল এবং তাদের মত করে শিক্ষা-প্রশিক্ষণ দিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি ও তোমাদের চরিত্র-ধ্বংসের কাজে ব্যবহার করছে। এই সব মেয়েকে তোমরা মুক্ত করাতে পারবে না। তোমরা যদি আমার বিদ্যা থেকে উপকৃত হতে চাও, তাহলে আমি বলব, দুটি মাত্র মেয়ের জন্য আটটি যুবক কোরবান করে দেয়া বুদ্ধিমত্তা নয় এবং তোমাদের ধৈর্যের সাথে কাজ করা দরকার।
কিন্তু আমি কিভাবে ধৈর্যধারণ করতে পারি? গর্জে উঠে ওসমান সারেম।
আমার ন্যায়- বারজিস বললেন-আমি কি পেশাদার মুচি? আমি যখন মিসরে অবস্থান করি, তখন আমার সওয়ারীর জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকে আরবী ঘোড়া। আমার ঘরে আছে দুটি চাকর। আর এখানে কিনা তিনটি মাস ধরে আমি মুচিগিরি করছি। রাস্তায় বসে মানুষের ময়লাযুক্ত পুরনো জুতা মেরামত করছি। আমি তোমাদেরকে সমগ্র কার্ক এবং তারপরেরও বিস্তীর্ণ অঞ্চল মুক্ত করার জন্য জীবিত রাখতে চাই। তোমরা ধৈর্য ধর, অপেক্ষা কর।
ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে ওসমান সারেম ও তার সঙ্গীদের। তাদের কথা-বার্তায় বুঝা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে অপেক্ষা করার হিম্মত অবশিষ্ট নেই। কেউ রাহনুমায়ী না করলেও নিজেরাই সেখানে হামলা করতে প্রস্তুত। ইমামের কথাও মান্য করতে অস্বীকৃতি জানায় তারা। অগত্যা বারজিস তাদের জানায়, খৃস্টান সম্রাটগণ রাতে যে স্থানে সমবেত হন এবং যেখানে তাদের মদের আসর বসে, তার দুগোয়েন্দা সেখানকার সাধারণ কর্মচারী। শোবক জয়ের পর সেখান থেকে পালিয়ে আসা খৃস্টানদের সাথে এসে এখানে এসেছিল তারা। এখন তারা খৃস্টান সরকারের চাকরী করছে আর সফল গুপ্তচরবৃত্তি করছে।
বৃটেন, ইটালী, ফ্রান্স ও জার্মানী প্রভৃতি দেশ থেকে আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আসা খৃস্টান সম্রাটগণ যে প্রাসাদটিতে থাকেন, সেটি তোমরা অবশ্যই দেখেছ। প্রাসাদে বড় একটি কক্ষ আছে। সে কক্ষে সন্ধ্যার পর তারা একত্রিত হন এবং মদপান করেন। তাদের বিনোদনের জন্য থাকে অনেকগুলো সুন্দরী মেয়ে। আধা রাত পর্যন্ত চলে তাদের আসর।
স্থানটি খানিকটা উঁচুতে। সশস্ত্র পাহারাও থাকে। সেই ভবন পর্যন্ত পৌঁছানো তোমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, বিশিষ্ট কোন নাগরিকের পক্ষেও তার কাছে যাওয়া অসম্ভব। মেয়ে দুটোকে কোথায় রাখা হয়েছে, সে খবর আমি তোমাদের দিতে পারব। কিন্তু তাদের পর্যন্ত পৌঁছানোর একমাত্র পন্থা, আমাদের সৈন্যরা বাইরে থেকে এক্ষুণি হামলা করবে। তাহলে খৃস্টান সম্রাট ও সামরিক কর্মকর্তাগণ ভবন ছেড়ে চলে যাবে এবং হামলা প্রতিহত করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। কিন্তু হামলা যে আজ রাতে হবে না, তাতো নিশ্চিত। সালাহুদ্দীন আইউবী কবে হামলা করবেন, তারও কোন ঠিক নেই।
