কাফেলা প্রবেশ করছে কার্কে। সম্মুখে মুসলিম বন্দীরা। তাদের পিছনে দুটি ঘোড়ায় সওয়ার মেয়ে দুটো। তাদের পোষাকই বলে দিচ্ছে, তারা মুসলমান। মেয়েদের পিছনে মুখোশপরিহিত খৃস্টান দস্যুরা। সর্ব পিছনে মাল বোঝাই উটের বহর।
মেয়ে দুটো কাঁদছে। তামাশা দেখার জন্য রাস্তায় নেমে এসেছে কার্কের লোকজন। হাত তালি দিচ্ছে তারা। দাঁত বের করে খিলখিল করে হাসছে। কারণ, তারা জানে লুণ্ঠিত এ কাফেলাটি মুসলমানের। বন্দীরাও মুসলমান।
বন্দীদের একজনের নাম আফাক। বয়সে যুবক। অপহৃত মেয়ে দুটো তার বোন। আফাক আহত। কপাল ও কাঁধ থেকে রক্ত ঝরছে দ দ করে। কাফেলার আগে আগে শহরে প্রবেশ করে সে। উৎফুল্ল জনতাকে উদ্দেশ করে উচ্চস্বরে সে বলে, কার্কের মুসলমানগণ! তোমরা আমাদের তামাশা দেখছ? গলায় রশি বেঁধে ডুবে মরতে পার না? ঐ মেয়ে দুটোর প্রতি চেয়ে দেখ। ওরা শুধু আমার বোন নয়- তোমাদেরও বোন। ওরা মুসলমান।
পেছন থেকে আফাকের ঘাড়ে ধাক্কা মারে এক খৃস্টান। উপুড় হয়ে পড়ে যায় আফাক। হাত দুটো তার রশি দিয়ে পিঠমোড়া করে বাঁধা। তাঁকে ধরে তুলে দেয় বন্দীদের একজন। চীৎকার করে আফাক। বলে, কার্কের মুসলমানগণ! এরা তোমাদের কন্যা…। আর বলতে পারে না আফাক। পেটাতে শুরু করে তাকে দুতিনজন মুখোশধারী। চীৎকার করে করে কাঁদছে তার বোনরা। তারা ফরিয়াদ করছে-আল্লাহর ওয়াস্তে তোমরা আমার ভাইকে মের না। আমাদের সাথে তোমরা যেমন আচরণ করতে চাও,কর। তবু মের না আমাদের ভাইকে।
এক বোন চীৎকার করে বলে, চুপ হয়ে যাও আফাক! তুমি ওদের কিছু করতে পারবে না। কিন্তু আফাক থামছে না।
কিছু মুসলমানও আছে উৎসুক জনতার মধ্যে। আগুন জ্বলছে তাদের গায়ে। কিন্তু তারা অসহায়। তাদের অনেকে যুবক। আছে ওসমান সারেমও। যুবক বন্ধুদের প্রতি তাকায় ওসমান। চোখগুলো লাল হয়ে গেছে তাদের সকলের। প্রতিশোধের আগুন ঠিকরে পড়ছে যেন তাদের চোখ থেকে।
.
অনেক দূর পর্যন্ত কাফেলার সাথে হেঁটে যায় ওসমান সারেম। এক জায়গায় রাস্তার পাশে বসে আছে এক মুচি। মানুষের জুতা সেলাই করছে সে। একজন মুসলমানের ঘরের আঙ্গিনায় রাত কাটায় লোকটা। সারাদিন বাইরে বসে জুতা সেলাই করে। এটা তার পেশা। কিন্তু আশ্চর্য, কাফেলাটি তার সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করল, আফাকের ডাক-চীৎকার তার কানে ঢুকল, শুনল মেয়ে দুটোর আহাজারি। অথচ একটি মাত্র নজর চোখ তুলে তাকিয়ে সাথে সাথে মাথা নুইয়ে মন দিল নিজের কাজে। আবার। জুতা সেলাই। যেন কিছুই দেখল না, কিছুই শুনল না লোকটা।
এই মুচিকে কেউ না দেখেছে মসজিদে যেতে, না দেখেছে গীর্জায়, না দেখেছে ইহুদীদের উপাসনালয়ে। কারো কোন কৌতূহল নেই তাকে নিয়ে। পায়ের জুতা ছিঁড়ে গেলেই তার কথা মনে পড়ে সকলের। লোকটাকে কেউ কখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলতে শুনেনি। সৃষ্টির এক আজব প্রাণী লোকটা। লোকটার না আছে ঐ খৃস্টানদের প্রতি কোন আগ্রহ, না আছে মুসলমানদের সাথে কোন সম্পর্ক।
কাফেলার সাথে হাঁটছে ওসমান সারেম। মুচির সন্নিকটে গিয়ে থেমে যায় সে। বন্দীরা চলে গেছে আগে। এখন যাচ্ছে উটের বহর। একেবারে পিছনের উটটাও অতিক্রম করে এগিয়ে গেছে। এবার পায়ের জুতা জোড়া খুলে নিয়ে রেখে দেয় মুচির সামনে। বসে পড়ে লোকটার সম্মুখে। মাথা নুইয়ে একজনের জুতা মেরামত করছিল মুচি। ওসমান সারেমের প্রতি মাথা তুলে তাকালও না সে। ওসমান ইতিউতি দৃষ্টিপাত করে ফিসফিসিয়ে বলে, মেয়ে দুটোকে আজ রাতেই মুক্ত করতে হবে।
জান রাতে তারা কোথায় থাকবে? মাথা না তুলেই ক্ষীণ কণ্ঠে ওসমানকে জিজ্ঞেস করে মুচি।
জানি। থাকবে খৃস্টান সম্রাটদের কাছে। কিন্তু আমাদের কেউ সেই স্থানটি ভেতর থেকে দেখেনি। জবাব দেয় ওসমান সারেম।
আমি দেখেছি। সেখান থেকে মেয়েদের বের করে আনা সম্ভব নয়। নিজের কাজে নিমগ্ন থেকে জবাব দেয় মুচি।
তুমি তাহলে কোন্ ব্যধির দাওয়াই? ওসমানের কণ্ঠে যেমন তীব্র আবেগ, তেমনি প্রচন্ড ক্ষোভ। বলে, তুমি আমাদের রাহবরী কর। আমরা যদি মেয়েদের পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে ধরা পড়ি, তাহলে মেয়ে দুটোকে খুন করে ফেলব। তারপর যা হওয়ার হবে। খৃস্টানদের নিকট ওদেরকে জীবিত থাকতে দিব না।
তুমি কজন যুবকের কুরবানী দিতে চাও? জিজ্ঞেস করে মুচি।
যে কজন দরকার।
ঠিক আছে, কাল রাত।
না, আজ রাত। আজ রাতেই বারজিস! আজ রাতেই।
ইমামের নিকট চলে যাও। বলল মুচি।
যুবক কজন? জিজ্ঞেস করে ওসমান।
খানিক চিন্তা করে বারজিস বলল, আট… অস্ত্র শুনে নাও-খঞ্জর।
জুতো জোড়া পায়ে দিয়ে উঠে চলে যায় ওসমান সারেম।
***
সূর্য এখনও ডুবেনি। ওসমান সারেম সাতজন বন্ধুকে ঘর থেকে ডেকে নেয়। ঈমাম সাহেবের নিকট যেতে বলে এবং নিজে ঈমামের ঘরে চলে যায়। ইনি সেই মসজিদের ঈমাম, যেখানে পাগলের সাথে সাক্ষাত হয়েছিল ওসমানের। ওমসানই ঈমামকে তার আন্ডারগ্রাউন্ড দলের নেতা হওয়ার প্রস্তাব করেছিল। দলের সব সদস্য বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিয়েছিল সে প্রস্তাব। এরা এক সময় একজনের ঘরে বসে মিটিং করছে এবং কর্মসূচী প্রস্তুত করছে। এখন তাদের সামনে অপহৃতা এই মেয়ে দুটোর উদ্ধার করার পালা। ওসমান সারেম মেয়েদের উদ্ধারের সংকল্প নিয়েছে, যা মূলত আত্মহত্যার শামিল। মুচির কথা অনুযায়ী ইমামের ঘরে চলে গেছে সে।
