তাহলে কী করা যায়? সেখানকার যুবকরা তো প্রস্তুতি নিয়ে আমাদের পরিকল্পনার অপেক্ষায় প্রহর গুণছে। জিজ্ঞেস করলেন জাহেদান।
তাদেরকে হুঁশ-জ্ঞান ঠিক রেখে অগ্রসর হতে বল- জবাব দেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী- তাদের চিন্তা-চেতনাকে জাগিয়ে তোল। সেখানকার পরিস্থিতি অনুপাতে তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেবে, কি করতে হবে। আবেগের বশীভূত হয়ে যেন কিছু না করে ফেলে, সে মানসিকতা তাদের মধ্যে সৃষ্টি কর। সেখানে আরো বেশী করে বিচক্ষণ চর পাঠাও। স্মরণ রেখ জাহেদান! দুশমন আমাদের নয়-ধ্বংস করতে চাইছে আমাদের যুবসমাজের চরিত্র কিংবা সেই কর্মকতাদের, যাদের বিবেক কিশোরদের ন্যায় আনাড়ী। একটি জাতিকে যদি তুমি যুদ্ধ ছাড়া পরাজিত করতে চাও, তা হলে সে জাতির যুবকদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিলাসিতায় ডুবিয়ে দাও। দেখবে, সে জাতি এমনভাবে তোমাদের গোলামে পরিণত হবে যে, তারা আপন স্ত্রী-কন্যা-বোনদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দিয়ে গর্ববোধ করবে। ইহুদী-খৃস্টানরা আমাদেরকে এ ধারায়ই ধ্বংস করতে চাইছে।
হঠাৎ কি যেন মনে পড়ে গেল সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর। জাহেদানকে বললেন, কার্কের যেসব মুসলমান অস্ত্র তৈরি করছে, কাকে যেন বলেছিলাম, যেন তাদের কাছে বারুদ পৌঁছিয়ে দেয় কিংবা তাদেরকে বারুদ তৈরি করার ফর্মুলা এবং ব্যবহারের প্রক্রিয়া শিখিয়ে দেয়। কিন্তু তার কি হল, জানতে পারলাম না।
হ্যাঁ, তা তাদের শিখিয়ে দেয়া হয়েছে। খবর পেয়েছি, মুসলমানরা বারুদ তৈরির কাজ শুরুও করে দিয়েছে। জবাব দেন জাহেদান।
***
আকষ্মিকভাবেই কার্কে এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে গেল যে, সেখানকার মুসলিম যুবকেরা আপনা-আপনিই জেগে উঠল। অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে খৃস্টানরা কাফেলা লুণ্ঠনেরও ধারা শুরু করে রেখেছিল। দস্যু-তস্করের ভয়ে ব্যবসায়ী ও অন্যান্য ভ্রমণকারীরা একত্রিতভাবে সফর করত। অনেক সময় এক একটি কাফেলার সদস্য সংখ্যা দেড়-দুশ হয়ে যেত। সশস্ত্র যোদ্ধাও থাকত কাফেলায়। উট-ঘোড়া থাকত প্রচুর। বিপুল পণ্যদ্রব্য নিয়ে এক স্থান থেকে অন্যত্র যেত বণিকরা। এক এক সময় এক এক স্থানে অবস্থান করত তারা। অল্প কজন ডাকাতের পক্ষে এসব কাফেলা লুট করা সম্ভব ছিল না। আক্রান্ত হলে মোকাবেলা করত তারা। এই লুটতরাজের কাজটা করত খৃস্টান সৈন্যরা। কোন পথে কোন মুসলিম কাফেলার গমনের সংবাদ পেলেই দুএক প্লাটুন সৈন্যকে মরুচারী লোকের বেশে প্রেরণ করে সেটি লুট করাত। কাফেলায় থাকত শুধু মুসলমান। এই অপকর্ম সেসব খৃস্টান সম্রাটগণও করিয়েছেন এবং লুণ্ঠিত সম্পদের ভাগ গ্রহণ করেছেন, যাদেরকে আজ ইতিহাসে ক্রুশের লড়াইয়ের হিরো বলে পরিচিত করা হচ্ছে।
এ অপকর্মে কতিপয় মুসলমান আমীরও শামিল ছিল। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কতগুলো প্রদেশের শাসক ছিল তারা। সৈন্যও ছিল তাদের কাছে। লুণ্ঠিত কাফেলার দুচারজন লোক তাদের নিকট গিয়ে ফরিয়াদও পেশ করত। কিন্তু মজলুমের সেই আহজারি ঢুকত না তাদের কানে। কারণ, নারী,মদ আর উপঢৌকনের নামে তাদেরও ভাগ দিত খৃস্টানরা। মদ-নারী আর অর্থের লোভে পড়ে নিজেদের ঈমান ও স্বধীনতা-স্বকীয়তা খৃস্টানদের কাছে বিকিয়ে দিয়েছিল তারা।
এ মুসলিম প্রদেশগুলো কজা করতে চাইছেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। এ মুসলিম শাসকদেরকে খৃস্টানদের চাইতেও ভয়ংকর মনে করছেন তিনি। সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গী একবার তার নিকট একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন। তাতে তিনি নানা প্রসঙ্গের মধ্যে এ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুসলিম প্রদেশগুলো সম্পর্কে একথাটিও লিখেছিলেন যে, এ মুসলিম শাসকগণ নিজেদের জাগতিক সুখ-শান্তি ও ভোগ-বিলাসের নিমিত্ত প্রদেশগুলোকে খৃস্টানদের কাছে বন্ধক রেখেছে। কাফেরদের নিকট থেকে উপঢৌকন, সোনা-চাদী আর অপহৃত মুসলিম যুবতীদের গ্রহণ করছে আর ইসলামের নাম ডুবিয়ে চলেছে। এ মুসলমানরা খৃস্টানদের চেয়েও বেশী অপবিত্র ও অধিক ভয়ংকর। ক্ষমতার নেশায় বুঁদ হয়ে আছে তারা। খৃস্টানরা ঢুকে পড়েছে তাদের একেবারে শিকড়ে। তাই খৃস্টানদের পরাজিত করার আগে প্রদেশগুলো কজা করে সালতানাতে ইসলামিয়ার সাথে একীভূত করে ফেলা এবং বাগদাদের খেলাফতের অধীনে নিয়ে আনা একান্ত আবশ্যক হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া ইসলামের সুরক্ষা সম্ভব নয়।
.
একদিনের ঘটনা। কার্ক থেকে মাইল কয়েক দূর দিয়ে পথ অতিক্রম করছে বিশাল এক কাফেলা। কাফেলায় আছে একশরও বেশী উট, আছে অসংখ্য ঘোড়া। উটের পিঠে বোঝাই ব্যবসায়ীদের পণ্য। আছে এমন একটি পরিবার, যার দুসদস্য যুবতী মেয়ে। সম্পর্কে তারা বোন।
কার্ক থেকে মাইল কয়েক দূর দিয়ে অতিক্রম করছিল কাফেলাটি। এ সংবাদ পেয়ে গেছে খৃস্টানরা। সাথে সাথে এক দল সৈন্য পাঠিয়ে দেয় তারা। দিন দুপুরে হামলা করে বসে কাফেলার উপরে। আক্রমণ মোকাবেলা করে কাফেলার অশ্বারোহী যাত্রীরা। কিন্তু সংখ্যায় খৃস্টানরা অনেক। রক্তে লাল হয়ে যায় সেখানকার বালুকাময় ভূমি। কাফেলার শিশু-কিশোরদের পর্যন্ত রেহাই দেয়নি খৃস্টান দস্যুরা। যুদ্ধ শেষে এখন বেঁচে আছে মাত্র পনের-ষোলজন মুসলমান। বন্দী করে ফেলা হয় তাদের। আটক করা হয় মেয়ে দুটোকে। উট-ঘোড়া ও মালামালসহ তাদের নিয়ে যাওয়া হয় কার্কে।
