তাহলে কি আমি রাইনীকে এখানে আসতে নিষেধ করে দেব? ওতো তোমার সঙ্গেও ফ্রি হয়ে গেছে। জিজ্ঞেস করে আন-নূর।
ওকে আমি বলে দেব যে, তুমি আর আমাদের ঘরে এসো না। মেয়েটা বড় চটপটে ও বিচক্ষণ। বলল ওসমান।
রাইনী এক খৃস্টান যুবতী। ওসমান সারেমের ঘরের সামান্য দূরে তার ঘর। পিতা প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তা। মেয়েটির পুরো নাম রাইনী আলেকজান্ডার। আন-নূরের বান্ধবী। ওসমান সারেমের সাথেও প্রেম নিবেদন করতে চেষ্টা করছে মেয়েটি। কিন্তু ওসমান পাত্তা দিচ্ছে না তাকে। আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন ওসমান জানে যে, এই খৃস্টান মেয়েটি তাদের কাছে ঘেঁষছে গুপ্তচরবৃত্তি করার জন্য। তবে ওসমান উপরে উপরে ভাব দেখাত, যাতে তার মনে কোন সন্দেহ জাগতে না পারে। কিন্তু এখন তো এ ঘরে তার আনাগোনা বিপজ্জনক। কিন্তু ওসমান তাকে কি করে বলবে যে, তুমি আর আমাদের ঘরে এসো না। অথচ আনাগোনা তার বন্ধ না করলেই নয়। ওসমানের ঘরে এখন চলবে সামরিক প্রশিক্ষণ।
ভেবে-চিন্তে বুদ্ধি একটা ঠিক করে ওসমান। বোনকে বলে দেয়, রাইনী যদি আবার কখনো আসে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তুমি এই বলে বের হয়ে যেও যে, আমি এক বান্ধবীর নিকট যাচ্ছি, তুমি অন্য সময় এসো। এভাবে মেয়েটাকে উপেক্ষা করতে থাক,দেখবে আপনা থেকেই সে এখনে আসা ছেড়ে দেবে।
.
পাগলটার কথা এখন কাকবাসীর মুখে মুখে। খৃস্টানদের নিকট বড় ভালো লেগেছিল লোকটাকে। কিন্তু এখন আর তাকে দেখা যাচ্ছে না কোথাও। খুঁজছে সবাই। খুঁজছে সরকার। খৃস্টান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, মুসলমানদের মনে ভীতির সঞ্চার ও মুসলমানদের জযবা দমন করার কাজে পাগলটাকে ব্যবহার করবে। কিন্তু হঠাৎ করে লোকটা কোথায় চলে গেল কেউ জানে না। ঐ যে মসজিদ থেকে বের হল, সে রাতেই হাওয়া হয়ে গেছে সে। দশ-বারো দিন পর্যন্ত চলল তার অনুসন্ধান। কিন্তু পাওয়া গেল না।
এই দশ-বার দিনে ওসমান সারেম তার মিশনকে এগিয়ে নিয়ে গেছে অনেক দূর। বোন আন-নূর ও তার বান্ধবীদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়েছে সে। বড় পরিশ্রম করে তরবারী চালনা শিক্ষা দিয়েছে সে মেয়েগুলোকে। তাছাড়া গোপনে গোপনে সে সুলতান আইউবীর পয়গাম শুনিয়ে শুনিয়ে মুসলিম যুবকদের সংঘবদ্ধ করে তুলে। যুবকরা হাত করে নেয় তীর-ধনুক-বর্শা প্রস্তুতকারী কারীগরদের। এরা সকলেই খৃষ্টানদের বেতনভোগী কর্মচারী। নিজেদের জন্য কোন অস্ত্র তৈরী করতে পারেনা তারা। অস্ত্র রাখা মুসলমানদের জন্য অন্যায়।
কিন্তু এবার তারা নিজ নিজ ঘরে লুকিয়ে লুকিয়ে অস্ত্র তৈরী শুরু করে দেয়। এ এক মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। ধরা পড়লে শুধু মৃতুদণ্ড-ই যে ভোগ করতে হবে তা নয়, মৃত্যুর আগে খৃষ্টানদের নির্মম অত্যাচার সহ্য করতে হবে তাদের। এখানে কোন মুসলমান কোন লঘু অপরাধে কিংবা সন্দেহবশত: ধরা পড়লে তাকে জিজ্ঞাসা করা হত, মুসলমানদের ঘরে কি হচ্ছে এবং তোমাদের গোয়েন্দারা কোথায়। তার সঙ্গে সঙ্গে তুলোধুনা করা হত তাদের শরীরে।
কারীগরদের তৈরী করা অস্ত্রগুলো বিভিন্ন ঘরে লুকিয়ে রাখছে ওসমান সারেমের সহকর্মী যুবকেরা। দিনের বেলা মেয়েরা বোরকা পরে লুকিয়ে লুকিয়ে তীর ধনুক খঞ্জরগুলো নিয়ে যেত বিভিন্ন মুসলমানের ঘরে। কিন্তু অস্ত্র তৈরী এবং ঘরে ঘরে পৌঁছানোর কাজটা চলছে খুব ধীরগতিতে।
ওদিকে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট সংবাদ পৌঁছে গেছে যে, কার্ক ও তার আশপাশের মুসলমানদের ঘরে ঘরে আপনার পয়গাম পৌঁছে গেছে এবং সেখানকার মুসলিম যুবক-যুবতীরা আন্ডারগ্রাউন্ড তৎপরতা শুরু করে দিয়েছে। একজন বিচক্ষণ ও নির্ভীক গোয়েন্দা সংবাদটা পৌঁছিয়ে দিয়েছে সুলতানের কাছে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে সে জানায়, ওসমান সারেমের নিকট যে গোয়েন্দা পাগলের বেশ ধারণ করে আপনার পয়গাম পৌঁছিয়ে দিয়েছে, সে ষোলআনা সাফল্য অর্জন করেছে। এ সংবাদ শুনে সুলতান খুব খুশী হলেন এবং বললেন, যে জাতির যুবকেরা সজাগ হয়ে যায়, কোন শক্তি তাদের পরাজিত করতে পারে না।
এই সাফল্য আমার সাহস অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। আপনার অনুমতি পেলে অধিকৃত অঞ্চলের যুবকদের আমি এমনভাবে উত্তেজিত করে তুলতে পারি যে, তারা অগ্নিস্ফুলিঙ্গে পরিণত হয়ে সমগ্র কার্ক ও জেরুজালেমে আগুন ধরিয়ে দেবে। বলল গোয়েন্দা উপ-প্রধান জাহেদান।
আর সেই আগুনে তারা নিজেরাও পুড়ে মরবে- বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী- আমি যুবকদের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বানাতে চাই না। আমি তাদের বুকে ঈমানের আগুন জ্বালাতে চাই। যুবসমাজকে উত্তেজিত করে তোলা কঠিন কাজ নয়। বন্দুকের মুখ খুলে দিয়ে দেখ, কিভাবে তারা তোমার কথায় উঠাবসা করতে শুরু করে। অধিকাংশকে জ্বালাময়ী বক্তৃতা আর উত্তেজনাকর শ্লোগানে মাতিয়ে তোলা যায়। তারপর তুমি তাদের দিয়ে যা করাতে চাও করাতে পার। তুমি তাদের আপসেও লড়াতে পার। তার কারণ এই নয় যে, তারা বোকা ও গোঁয়ার। তার অর্থ এই নয় যে, তাদের নিজস্ব বুদ্ধি নেই। আসল কারণ হল, এই বয়সটাই এমন হয়ে থাকে যে, রক্তের উষ্ণতা তাদের কিছু একটা করতে বাধ্য করে। এ সময়ে মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক বিলাসিতার প্রতি আকৃষ্ট হয়। আবার সৎকর্মের প্রতিও ঝুঁকে পড়ে। তরুণ মেধাগুলোকে তুমি যেভাবে ব্যবহার করতে চাইবে, সেভাবেই ব্যবহৃত হবে। আমাদের দুশমন আমাদের এই নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিলাসিতা ও পাশবিকতার জীবাণুর অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য একটাই, যাতে আমরা আমাদের যুবসমাজকে জিহাদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে দুশমনের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে না পারি। তুমি বরং এই চেষ্টা চালিয়ে যাও, যাতে আমাদের যুবকরা উত্তেজিত না হয়। যাতে তারা ঠান্ডা মাথায় ভাবতে শিখে। আমাদের প্রিয়নবী (সঃ) বলেছেন, তোমরা নিজেদের পরিচয় লাভ কর এবং শত্রু-মিত্র চিহ্নিত কর। তুমি নিজেও এ মহান শিক্ষা অনুযায়ী আমল কর এবং যুবকদের এ কথাটি বুঝাও। যুবকদের চিন্তা-চেতনা পাল্টিয়ে দাও। তাদের মধ্যে ঈমান ও দেশপ্রেম জাগ্রত কর। এটি দেশের যুবসমাজের বড় মূল্যবান সম্পদ। তুমি ওদেরকে উত্তেজিত হয়ে পুড়ে জীবন দেয়া থেকে রক্ষা কর। যুবকদের মৃত্যুর হাতে ঠেলে দেয়া বুদ্ধির কাজ নয়। তাদের হাতে দুশমনদের শেষ করাও। এটা বুদ্ধিমানের কাজ। তবে দুশমন কারা, তা ওদের স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। কোন মুসলমান যদি আমাকে মন্দ-শৃক্ত বলে, তবে সে না ইসলামের দুশমন, গাদ্দার। সে আমার দুশমন। ইসলাম ও সালতানাতে ইসলামিয়ার সুরক্ষার জন্য প্রণীত আইনের আশ্রয়ে আমি তাকে শাস্তি দেব না। দেশের আইন দেশনেতার ব্যক্তিগত ব্যাপারে প্রয়োগ করা যাবে না। গাদ্দারীর সাজা তাকেই দেয়া হবে, যে দেশ ও জাতির মূলোৎপাটন ও ইসলামের শত্রুদের হাত শক্ত করে। দেশনেতা নিজেও যদি এ দোষে দুষ্ট হন, তাহলে তিনিও গাদ্দার এবং শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।
