কখনো গোয়েন্দা দেখেনি ওসমান সারেম। লোকটা যে কত অস্বাভাবিক বিচক্ষণ, তা জানেনা ওসমান। ওসমানকে কয়েকটি কথা জিজ্ঞেস করেই গোয়েন্দ বুঝে ফেলে যে, যুবকটাকে বিশ্বাস করা যায়। গোয়েন্দা তাকে বলল
তুমি তোমার মত আরো কয়েকটি যুবককে একত্রিত কর। মুসলমান মেয়েদেরও প্রস্তুত কর। প্রতিটি মুসলিম পরিবারে তোমাদেরকে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর পয়গাম পৌঁছিয়ে দিতে হবে যে, সালাহুদ্দীন আইউবী জীবিত আছেন। নিজ বাহিনীর সাথে তিনি এখান থেকে মাত্র আধা দিনের পথ দূরে অবস্থান করছেন। তাঁর গোটা ফৌজ কার্ক আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুতই নয় শুধু, খৃস্টান বাহিনীর দম নাকের আগায় এনে রেখেছেন তিনি। মিসরের পরিস্থিতি শান্ত-স্বাভাবিক। খৃস্টানদের ষড়যন্ত্রের গোড়া উপড়ে ফেলা হয়েছে সেখানে।
সালাহুদ্দীন আইউবী কার্ক আক্রমণ করবেন? জানতে চায় ওসমান সারেম। বলে, আমরা তাঁর পথপানে চেয়ে আছি। তোমাকে আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, তোমরা যদি বাইরে থেকে আক্রমণ কর, তাহলে ভেতর থেকে আমরাও খৃস্টানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ব। আল্লাহর ওয়াস্তে তোমরা জলদি এসে পড়।
ধৈর্যের সাথে কাজ কর যুবক। আগে সালাহুদ্দীন আইউবীর পয়গাম শোন। সব মুসলিম যুবকের কানে পয়গামটা পৌঁছিয়ে দাও। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী কার্কের মুসলিম যুবকদের বলতে বলেছেন
তোমরা দেশ ও ধর্মের মোহাফেজ। আমি যখন প্রথম যুদ্ধ করি, তখন আমি কিশোর। লড়াই করেছি শক্রর হাতে অবরুদ্ধ অবস্থায়। ফৌজের কমান্ডো ছিল আমার চাচার হাতে। তিনি আমায় বলেছিলেন, অবরোধে পড়েছ বুলে ভয় পেওনা। এ বয়সে যদি ভীত হয়ে পড়, তাহলে সারাটা জীবনই কাটবে ভয়ে ভয়ে। যদি ইসলামের আলমবরদার হতে চাও, তাহলে এই পতাকা আজই হাতে তুলে নাও এবং দুশমনের ব্যুহ ভেঙ্গে বেরিয়ে যাও। তারপর মোড় ঘুরিয়ে আবার ফিরে এসে দুশমনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়। তিন মাসের অবরোধে আমরা না খেয়ে কাটিয়েছি অনেক দিন। তথাপি আমরা অবরোধ ভেঙ্গে বেরিয়ে এসেছিলাম। এ সময়ে আমরা যা খেয়েছি, সব দুশমনের ছিনিয়ে আনা রসদ। অবরোধে আমাদের যেসব ঘোড়া ক্ষুৎপিপাসায় মারা গিয়েছিল, তার অভাব আমরা দুশমনের ঘোড়া দিয়ে পূরণ করেছি…।
সালাহুদ্দীন আইউবী বলেছেন, আমার কওমের মেয়েদের বলবে, দুশমন তোমাদের উপর ভালোবাসার অস্ত্র দিয়ে আঘাত, হামলা করেছে। তোমরা স্মরণ রাখবে, কোন অমুসলিম কখনো কোন মুসলমানের আপন হতে পারে না। খৃস্টানরা যুদ্ধের ময়দানে টিকতে পারেনি। তাদের সব পরিকল্পনা ধুলোয় মিশে গেছে। সেজন্য এখন তারা মুসলমানদের নতুন প্রজন্মের চিন্তা থেকে দেশপ্রেম ও ঈমানী চেতনা বিলুপ্ত করে দেয়ার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। তারা যে অস্ত্র ব্যবহার করেছে, তা বড় ভয়ংকর। বুদ্ধিবৃত্তিক বিলাসিতা, আলস্য ও কর্তব্যে অবহেলা- এ তিনটি দোষ তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করার জন্য একজোট হয়েছে ইহুদী ও খৃস্টানরা। ইহুদীরা তাদের মেয়েদের দিয়ে তোমাদের মধ্যে পশুবৃত্তি উস্কে দেয়ার চেষ্টা করছে এবং তোমাদেরকে নেশায় অভ্যস্ত করে তুলছে। আমি একথা বলব না যে, এই পাশবিকতা ও মাদকাসক্তি তোমাদের আখেরাত নষ্ট করবে আর মৃত্যুর পর তোমরা জাহান্নামে যাবে। আমি বরং তোমাদের বুঝাতে চাই যে, এই চারিত্রিক ত্রুটিগুলো তোমাদের জন্য এ দুনিয়াটাকে জাহান্নামে রূপান্তরিত করবে। যাকে তোমরা জান্নাতের স্বাদ মনে করছ, মূলতঃ তা জাহান্নামের আজাব। তোমরা সেই খৃস্টানদের গোলামে পরিণত হবে, যারা তোমাদের বোনদের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। তোমাদের পবিত্র কুরআনের পাতা অলি-গলিতে উড়বে এবং তোমাদের মসজিদগুলো পরিণত হবে ঘোড়ার আস্তাবলে…।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী আরো বলেছেন তোমরা যদি মর্যাদাসম্পন্ন জাতির ন্যায় বেঁচে থাকতে চাও, তাহলে নিজেদের আদর্শ-ঐতিহ্য ভুলো না। খৃস্টানরা একদিকে তোমাদের উপর অত্যাচার করছে, অন্যদিকে ঘোড়া-গাড়ীর লোভ দেখাচ্ছে। মনে রেখ, তোমাদের সম্পদ হল তোমাদের চরিত্র- তোমাদের ঈমান। খৃষ্টানরা যে আমাদের কাছে পরাজিত, তার প্রমাণ তারা তোমাদের তীর-তরবারীতে ভীত হয়ে এখন নিজ কন্যাদের বেশ্যা বানিয়ে তোমাদের পিছনে লেলিয়ে দিয়েছে। ওহে আমার জাতির যুবকগণ! তোমরা তোমাদের নীতি আদর্শ রক্ষা কর। নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কর। অত্যাচারী রাজারা মূলতঃ দুর্বল শাসক হয়ে থাকে। তারা তাদের প্রতিপক্ষের পদানত রাখার চেষ্টা করে কাউকে নীপিড়ন দিয়ে, কাউকে সম্পদের লোভ দেখিয়ে। তোমরা কারো নির্যাতনেও ভয় পেয় না, কারো লোভেও পড় না। তোমরা জাতির ভবিষ্যৎ আমরা জাতির অতীত। দুশমন তোমাদের মস্তিষ্ক থেকে তোমাদের গৌরবময় অতীতকে মুছে দিয়ে তাতে তাদের চিন্তা-চেতনা স্থাপন করার চেষ্টা করছে, যাতে ইসলামের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যায়। তাই তোমরা নিজেদের গুরুত্ব অনুধাবন কর। দুশমন শুধু এই কারণে তোমাদেরকে তাদের তাবেদার বানাতে চায় যে, তারা তোমাদের ভয় পায়। দৃষ্টি আজকের উপর নয়, আগামী দিনের উপর নিবদ্ধ রাখ। কারণ, দুশমনের নজর তোমাদের দ্বীন-ধর্মের ভবিষ্যতের উপর। তোমরা তো দেখেছ যে, দুশমন তোমাদের কি দশা করেছে। তোমরা যদি বুদ্ধিবৃত্তিক বিলাসিতায় নিপতিত হও, তাহলে গোটা মিল্লাতের ইসলামিয়ার সে পরিণতিই বরণ করতে হবে, যা ঘটছে তোমাদের বেলায়।
