পাগলটা শহরের অলি-গলি আর হাট-বাজার ঘুরে বেড়াচ্ছে আর বলছে, মুসলিম বাহিনী কার্কে আসবে না। তাদের সালাহুদ্দীন আইউবী মরে গেছে। কখনো বা এমন আবোল-তাবোল বকছে, যার কোন অর্থ হয় না। তাতে প্রমাণিত হয় লোকটা পাগল।
এলাকার শিশু-কিশোররা জড়ো হয়ে ছুটছে পাগলটার পিছনে। বড়রাও কেউ কিছু দূর তার পিছনে হেঁটে কেটে পড়ছে। এলাকার কিছু মানুষ পিছু নিয়েছে তার। ক্ষোভে ফেটে যাচ্ছে মুসলমানরা। শিশুদের ফেরানোর চেষ্টা করছে তারা। শুধু একজন মুসলমান মাত্র একজন পেছনে পেছনে যাচ্ছে পাগলটার। দুজনের মাঝে ব্যবধান দশ-বারো কদম। এক যুবক মুসলমান পথে দুজন খৃস্টান তাকে দেখে টিপ্পনি কাটে, তিরস্কার করে। একজন বলে, ওসমান ভাই! তুমিও খৃস্টান হয়ে যাও। ক্রুশের ছায়ায় এসে পড়। রোশকষায়িত নয়নে তাদের প্রতি তাকায় ওসমান। গোস্বা হজম করে চুপচাপ এগিয়ে সামনের দিকে পাগলটার পিছু নেয়। খৃস্টান যুবকদ্বয় জানেনা, ওসমানের কাছে খঞ্জর আছে, জানেনা পাগলটাকে হত্যা করার পরিকল্পনা নিয়ে হাঁটছে ওসমান।
.
যুবকের পুরো নাম ওসমান সারেম। বাবা-মা জীবিত। ছোট একটি বোন আছে। নাম আন-নূর সারেম। বয়স বাইশ-তেইশ বছর। ওসমান তার তিন বছরের বড়। বড় তেজস্বী যুবক। ইসলামের জন্য নিবেদিত মুসলমান। খৃস্টান সরকারের সন্দেহভাজনদের তালিকার একজন। কারণ, মুসলমান যুবকদের খৃস্টান সরকারের বিরুদ্ধে গোপন অভিযানের জন্য প্রস্তুত করেছিল সে। কিন্তু খৃস্টানরা এ যাবত হাতে নাতে ধরতে পারেনি তাকে।
পাগলটার আওয়াজ শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ওসমান সারেম। তখন ইয়া বড় এক ক্রুশ উঁচিয়ে মুসলমানদের ধ্বংস ঘোষণা করে ফিরছিল পাগলটা। গায়ে আগুন ধরে যায় ওসমানের। ওসমান দেখল না, লোকটা পাগল। ক্রুশ দেখে পাগলের কথা শুনে স্থির থাকতে পারল না যুবক। ঘরে ফিরে তুলে নেয় খঞ্জরটা। জামার তলে লুকিয়ে হাঁটা দেয় পাগলের পিছনে পিছনে। নিরাপদ কোন এক স্থানে খুন করতে হবে লোকটিকে। নিজে ধরা পড়া যাবে না। খৃস্টানদের বিরুদ্ধে আরো কিছু কাজ করার জন্য বেঁচে থাকা প্রয়োজন তার। পাগলটা থেকে দশ-বারো কদম দূর দিয়ে হাঁটছে আর তার ঘোষণা শুনছে। খৃস্টান যুবকদ্বয় তিরস্কার করায় দুচোখে তার রক্ত জমে যায়। হত্যার মনোবৃত্তি আরো দৃঢ় হয়ে যায় তার।
পাগলটার পেছনে ও দুপাশে জনতার যে ভীড়, তার অধিকাংশই কৌতূহলী শিশু কিশোর। যেন বিশাল এক শোভাযাত্রা। খুন করার পরিবেশ পাচ্ছে না ওসমান।
এভাবে কেটে যায় সারাটা দিন। ক্ষীন হয়ে আসে পাগলের কণ্ঠও। কমে যায় উৎসুক জনতার সংখ্যা। শিশু-কিশোররা কেটে পড়ে এক এক করে।
সূর্য ডুবতে এখনো সামান্য বাকি। সামনে একটি মসজিদ। মসজিদের দরজায় গিয়ে বসে পড়ে পাগলটা। হাতের ক্রুশটি ঊর্ধ্বে তুলে ধরে বলে, এটি এখন আর মসজিদ নয়-গীর্জা।
ওসমান সারেম নিকটে গিয়ে দাঁড়ায় পাগলটার। ওসমান ভালো করেই জানে যে, লোকটি আসলেই পাগল। তবুও তাকে হত্যা করলে শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। কারণ, হাতে তার ক্রুশ। কণ্ঠ তার উচ্চকিত মুসলমানদের বিরুদ্ধে। ওসমান সারেম পাগলটার কাছে ঘেঁষে ক্ষীণ কণ্ঠে বলে, এখান থেকে এক্ষুণি উঠে যাও, কুশটা নিয়ে পালিয়ে যাও এলাকা থেকে। নইলে খৃস্টানরা এখান থেকে তুলে নেবে তোমার লাশটা।
যুবকের প্রতি চোখ তুলে তাকায় পাগলটা। অপলক চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। আশ পাশে দাঁড়িয়ে আছে কতগুলো শিশু। পাগলটা ওসমানের কথায় কোন জবাব না দিয়ে ধমক দিয়ে চলে যেতে বলে শিশুদের। ভয়ে পালিয়ে যায় শিশুরা।
পাগল ঢুকে পড়ে মসজিদের ভিতরে। ওসমান সারেমের জন্য এটি মহা সুযোগ। সেও ঢুকে পড়ে মসজিদে। বন্ধ করে দেয় দরজাটা। আঘাত করতে উদ্যত হয় পাগলটার পিঠে। অমনি মোড় ঘুরিয়ে তাকায় পাগল। যুবকের খঞ্জরের আঘাত নিজের গায়ের দিকে আসতে দেখেই সামনে বাড়িয়ে ধরে হাতের কুশটা। আঘাতটা নিয়ে নেয় ক্রুশের গায়ে। বলে- থামো যুবক। ভিতরে চল। আমি মুসলমান।
আর আঘাত করল না ওসমান সারেম। পায়ের জুতা খুলে মসজিদের মিম্বরের কাছে চলে যায় পাগল। কুশটা আছে তার হাতেই। এগিয়ে যায় ওসমানও। দুজনে বসে সামনাসামনি। পাগল যুবকের নাম জিজ্ঞেস করে। যুবক নিজের নাম জানায়। পাগল বলে আমি মুসলমান। তোমাকে আমার বড় প্রয়োজন। তা তুমি কখন থেকে আমার পিছু নিয়েছ?
আজ সারাটি দিনই আমি তোমার পিছনে পিছনে ঘুরেছি। কিন্তু তোমাকে খুন করার মওকা পাইনি। জবাব দেয় ওসমান সারেম।
আমাকে তুমি কেন খুন করতে চাইছ? জিজ্ঞেস করে পাগল।
কারণ, আমি ইসলাম ও সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে কোন কথা সহ্য করতে পারি না। তুমি পাগল হও বা না হও আমি তোমাকে জীবিত রাখব না। ওসমান জবাব দেয়।
পাগলটা ওসমান সারেমকে আরো কয়েকটি কথা জিজ্ঞেস করে। শেষে বলে
আমার তোমার মত একটি যুবকের প্রয়োজন ছিল। ভালই হল যে, তুমি নিজেই আমার পিছনে এসে পড়েছ। আমার আশা ছিল যে, কষ্টে হলেও আমি মনের মত একজন মুসলমান পেয়ে যাব। আমি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রেরিত গোয়েন্দা। খৃস্টানদের বোকা ঠাওরানোর জন্য আমি সফর করে এসেছি। তোমার সাথে আমার অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। পিছন দিকে খেয়াল রেখ। কোন খৃস্টান এসে পড়লে আমি আগের মত বকওয়াস শুরু করে দেব। তুমি তন্ময় হয়ে আমার কথাগুলো শুনতে থাকবে, যেন তুমি আমার কথায় প্রভাবিত হচ্ছ। মাগরিবের নামাযের সময় হয়ে আসছে। মুসলমানদের মধ্যেও খৃস্টানদের চর আছে। মসজিদের নামাজীদের আগমন শুরু হওয়ার আগেই আমি আমার কথা শেষ করতে চাই।
