এই দুজনকে। আসা-যাওয়ার পথ ও কর্মপন্থা সম্পর্কে এরা অভিজ্ঞ। ওখানকার পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথেও পরিচিত। জবাব দেন জাহেদান।
কার্কের মুসলমানদের উপর ভালোবাসার যে অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছিল, তা ছিল খৃস্টানদের গোয়েন্দা প্রধান হরমুনের আবিস্কার। শোবকে পরাজয়বরণ করার পর তিনি খৃস্টান সম্রাটদের উপর চাপ দিয়ে আসছিলেন যে, কার্কের মুসলমানদেরকে ভালোবাসার টোপ দিয়ে ক্রুশের অনুগত বানানো হোক কিংবা অন্ততঃ সালাহুদ্দীন আইউবীর শত্রুতে পরিণত করা হোক। কিন্তু খৃস্টান শাসকগণ মুসলমালদের এতই ঘৃণা করত যে, তাদের প্রতি কৃত্রিম ভালোবাসা প্রদর্শন করতেও তারা রাজী নন। অত্যাচার-নির্যাতন দিয়েই মুসলমানদের জাতীয় চেতনা ধ্বংস করতে চাইতেন তারা।
জার্মান বংশোদ্ভূত হরমুন একজন অভিজ্ঞ গোয়েন্দা। মানুষের সাইকোলজী বুঝেন তিনি। খৃস্টান সম্রাটদের অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে বড় কষ্টে তিনি নিজের মতে নিয়ে আসতে সক্ষম হন এবং পরিকল্পনা পাস করিয়ে নেন যে, শহর ও শহরতলীতে যেসব মুসলমান বাস করছে, তাদেরকে সন্দেহভাজন ও গুপ্তচর হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। যার ব্যাপারে সামান্যতম প্রমাণও পাওয়া যাবে, তাকে গ্রেফতার করে গুম করে ফেলা হবে। কিন্তু সব মুসলমান নাগরিককে আতংকগ্রস্ত করা যাবে না। পলিসির একটি মৌলিক দিক এই ছিল যে, খৃস্টান মেয়েদের দ্বারা মুসলিম মেয়েদের মধ্যে বেহায়াপনা ঢুকিয়ে দিতে হবে এবং মুসলিম মেয়েদেরকে বিলাসী ও মদ্যপ বানাতে হবে। তাদের চরিত্র ও নৈতিকতা ধ্বংস করতে হবে।
পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হল। সূচনা হল গুজব ছড়ানোর মধ্য দিয়ে। মুসলমানদের মধ্যে গাদ্দারীর জীবাণু সৃষ্টি করার জন্য আগেই বিপুল অর্থ বরাদ্দ নিয়ে রেখেছিলেন হরমুন।
হরমুন কয়েকজন মুসলমানকে হাত করে নেন। আকর্ষণীয় কয়েকটি ঘোড়াগাড়ী দিয়ে শাহজাদার মর্যাদায় ভূষিত করেন তাদের। তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে চরবৃত্তি করবে এবং তাদের মধ্যে গুজব ছড়াবে।
মাঝে-মধ্যে নিমন্ত্রণ করে দরবারে এনে তাদের রাজকীয় মর্যাদা দেয়া হবে। তাদের স্ত্রীদেরও দাওয়াত করে এনে সাদর আপ্যায়ন করা হবে, যাতে ধীরে ধীরে তারা তাদের মূল পরিচয় ও ইসলামী চেতনা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে উদারপন্থী পরিচয় ধারণ করে।
হরমুন বললেন, আপনারা যদি মুসলমানদেরকে আপনাদের গোলাম বানাতে চান, তাহলে তাদের মাথায় ক্ষমতা ও রাজত্বের পোকা ঢুকিয়ে দিন। গাড়ী-বাড়ী দিয়ে তাদের মুঠোয় কিছু অর্থ ধরিয়ে দিন। দেখবেন, ক্ষমতার নেশায় তারা আপনাদের আঙ্গুলের ইশারায় নাচতে শুরু করবে। শূন্য করতে শুরু করবে গ্লাসের পর গ্লাস। নিজ কন্যাদের বিবস্ত্র করে তুলে দেবে আপনাদের হাতে। যদি আপনারা মুসলমানদের ভবিষ্যত অন্ধকার বানাতে চান, তাহলে আমার এই ফর্মুলাটা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। আমি আপনাদের আগেও বলেছি এবং এখনও বলছি, ইহুদীরা মুসলমানদের চরিত্র ধ্বংস করার জন্য তাদের মেয়েদের পেশ করেছে। আপনারা তো জানেন যে, মুসলমানদের সবচে আদি ও সর্বাপেক্ষা বড় শত্রু হল ইহুদী জাতি। ইসলামের মূলোৎপাটনের জন্য তারা নিজ কন্যার ইজ্জত এবং সঞ্চিত অর্থের শেষ মুদ্রাটিও উৎসর্গ করার জন্য প্রস্তুত থাকে।
***
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী যেদিন জাহেদানের উপর কার্কের পরিস্থিতি সামাল দেয়ার দায়িত্ব অর্পণ করেন, তার বিশদিন পরের ঘটনা। হঠাৎ এক পাগল আত্মপ্রকাশ করে কার্কে। হাতে তার হাত দুয়েক লম্বা একটি কাঠের ক্রুশ। ক্রুশটি উর্ধ্বে তুলে ধরে লোকটি চীৎকার করে বলছে
মুসলমানদের পতনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। শোবকে মুসলমানরা তাদেরই মেয়েদের সম্ভ্রমহানী করছে। মিসরে মুসলমানরা মদপান শুরু করেছে। যীশুখৃস্ট বলেছেন, এ জাতির আর পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার নেই। মুসলমানগণ! নূহ এর দ্বিতীয় তুফান থেকে যদি তোমরা রক্ষা পেতে চাও, তাহলে ক্রুশের ছায়াতলে এসে পড়। ক্রুশ যদি তোমাদের পছন্দ না হয়, তাহলে ইহুদী হয়ে যাও। এখন আর মসজিদের সেজদা করে তোমাদের লাভ নেই।
পোষাক ও গঠন-প্রকৃতিতে লোকটাকে ভালো মানুষ বলেই বোঝা যায়। কিন্তু কথা-বার্তা আর চালচলনে মনে হয় লোকটা পাগল। মুখে দাড়ি আছে। পরনে লম্বা চোগা। মাথায় পাগড়ী। তার উপরে রুমাল। লোকটার চেহারা ও কাপড়-চোপড় ধূলা-মলিন। অনেক দূর থেকে সফর করে এসেছে মনে হয়। কেউ থামতে বললে থমকে দাঁড়ায়। কিছু জিজ্ঞেস করলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, যেন কারো কথাই বুঝছে না সে। যে যা জিজ্ঞেস করছে, মুখে একই বুলি, একই ঘোষণা, মুসলমানদের পতনের সময় ঘনিয়ে এসেছে ………।
কেউ জানতে চেষ্টা করল না, লোকটা কে, কোথা থেকে এসেছে। খৃস্টানরা এজন্য আনন্দিত যে, তার হাতে ক্রুশ, মুখে যীশুখৃস্টের নাম। ইহুদীরা এজন্য উফুল্য যে, মুসলমানদের ইহুদী হওয়ার আহ্বান করছে। একটি কারণে উভয় ধর্মের মানুষই আনন্দিত যে, লোকটি মুসলমানদের ধ্বংসের সুসংবাদ প্রচার করছে। তার ঘোষণা শুনে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। খৃস্টবাহিনীর কয়েকজন সৈনিক পাগল বলে ভ্রূক্ষেপ করল না পুলিশের লোকেরা, মুসলমানদের কারও এত বড় বুকের পাটা নেই যে, তার মুখটা বন্ধ করে দেবে। তার মুখে নিজেদের পতনের ঘোষণা শুনে মুসলমানরা ভয় পেয়েছে, ক্ষুব্ধও হয়েছে। কিন্তু তারা অসহায়।
