গোয়েন্দাদের এ রিপোর্ট সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর জন্য নতুন কিছু ছিল না। কার্কের মুসলমানদের করুণ দশা সম্পর্কে তিনি পূর্ব থেকেই অবহিত। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে কোন গুজৰ কানে নিতে প্রস্তুত ছিল না সেখানকার মুসলমানরা। কিন্তু গুজব শুনতে শুনতে এখন কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। তাদের। যখন যে কথা তাদের কানে ঢুকছে,সবই আঘাত হানছে তাদের মনোবলে। কত আর শোনা যায়। এখন ধীরে ধীরে প্রভাবিত হতে শুরু করেছে তারা।
ভয়ে তারা মুখ খুলতে পারছে না। তাদের ঘরের দেয়ালেরও কান আছে। পদে পদে গুপ্তচর। শবযাত্রা-বরযাত্রায়ও গোয়েন্দা। মসজিদে-মসজিদেও গুপ্তচর। তাদের বড় দুর্ভাগ্য, তাদের মুসলমান ভাই খৃস্টানদের পক্ষে চরবৃত্তি করছে। নিজ ঘরে বসে কথা বলতে হয় তাদের কানে কানে। অমুক মুসলমান খৃস্টান সরকারের বিরোধী শুধু এতটুকু রিপোর্টই যথেষ্ট একজন মুসলমানের বেগার ক্যাম্পে ঠাই নেয়ার জন্য।
কিন্তু সালারে আজম! সেখানে নতুন এক চাল শুরু হয়েছে। খৃস্টানরা মুসলমানদের সাথে ভালো আচরণ করতে শুরু করেছে। এই তো অল্প কদিন আগের ঘটনা। খৃস্টান সরকারের এক কর্মকতা একটি মসজিদের দৈন্যদশা দেখে সাথে সাথে মসজিদটা মেরামত করে দেয়ার ঘোষণা দেন এবং অল্প কদিনের মধ্যে নিজে উপস্থিত থেকে মসজিদটি মেরামত করেও দেন। তারা বেগার ক্যাম্পের মুসলমানদের মুক্তি দেয়নি ঠিক, কিন্তু তাদের কষ্ট অনেকটা লাঘব করে দিয়েছে এবং শ্রমের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছ। কিন্তু তাদের বুঝানো হচ্ছে, তোমরা ক্রুশের বিরুদ্ধে মারাত্মক অন্যায় করেছ, তথাপি আমরা তোমাদের উপর রহম করছি। কার্কের খৃস্টানদের এই ভালোবাসার অস্ত্র বড়ই ভয়ংকর। কৃত্রিম এই ভালোবাসা দিয়ে তারা মুসলিম যুবকদেরকে নেশা ও জুয়াবাজিতে অভ্যস্ত করে তুলছে। আমরা যদি আক্রমণে বিলম্ব করি, তাহলে সেখানকার মুসলমানরা ততদিনে কুরআনের পরিবর্তে গলায় ক্রুশ ধারণ করবে। মুসলমান থাকেও যদি থাকবে নামমাত্র। তখন আমরা কার্ক অবরোধ করলে তারা আমাদের কোন সহায়তা করবে না। পাশাপাশি মুসলমানদের বিরুদ্ধে খৃস্টানদের চরবৃত্তিও আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। ধরপাকড় অব্যাহত রয়েছে। তবে মুসলমানদের ঈমানী চেতনা এখনো বহাল আছে। এখনো তারা ঈমানের উপর দৃঢ় থাকতে সংকল্পবদ্ধ। এখনো তারা খৃস্টানদের ভালোবাসাকে বরণ করে নেয়নি। কিন্তু আমার বিশ্বাস, এভাবে চলতে থাকলে তারা বেশীদিন টিকে থাকতে পারবে না। বলল এক গোয়েন্দা।
.
পরিস্থিতির বিবরণ শুনে বিচলিত হয়ে পড়েন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। মুসলমান মুসলমানের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি করছে এ রিপোর্টটি বেশী পীড়াদায়ক তার কাছে। অধিকৃত অঞ্চলে মুসলমানদের সাথে খৃস্টানদের ভালো আচরণ এবং তার পাশাপাশি মুসলিম যুবকদের চরিত্র ধ্বংসের অভিযোগ তাঁর পেরেশানীর আরেকটি কারণ। সবচে বেশী ভয়াবহ হল সেইসব গুজব, যা ছড়ানো হচ্ছে সেখানকার মুসলমানদের মধ্যে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী তাঁর গোয়েন্দা বিভাগের নায়েব জাহেদানকে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি এদের বক্তব্য শুনেছ?
বর্ণে বর্ণে শুনেই তবে এদের আপনার কাছে নিয়ে এসেছি। জবাব দেন জাহেদান।
আলী বিন সুফিয়ানকে কায়রো থেকে ডেকে আনবে? …নাকি তুমিই তার স্থান পূরণ করতে পারবে? বিষয়টি কিন্তু বড় স্পর্শকাতর। দুশমনের নগরীতে মুসলমানদেরকে গুজব এবং দুশমনের বিষাক্ত ভালোবাসা থেকে রক্ষা করতে হবে। বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।
আলী বিন সুফিয়ানকে কায়রো থেকে ডেকে আনার প্রয়োজন নেই। হাসান ইবনে আব্দুল্লাহকেও তার সাথে থাকতে দিন। মিসরের পরিস্থিতি ভালো নয়। দেশ নাশকতাকারী ও গাদ্দারে ভরে গেছে। কার্কের বিষয়টা আমিই সামলে নেব। বললেন জাহেদান।
তুমি কী চিন্তা করেছ? জিজ্ঞেস করলেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। মূলতঃ পরীক্ষা নিচ্ছিলেন তিনি জাহেদানের। সুলতান জানতেন, জাহেদান নিষ্ঠাবান ও পরিশ্রমী গুপ্তচর এবং আলী বিন সুফিয়ানের হাতেগড়া লোক। তার প্রতি পূর্ণ আস্থা আছে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর। তারপরও তিনি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন মনে করছেন যে, জাহেদান তার ওস্তাদের অভাব পূরণ করতে পারবে কি-না। জাহেদানের জবাবের অপেক্ষা না করেই সুলতান বললেন, জাহেদান! আমি কখনো যুদ্ধের ময়দানে পরাজয়বরণ করিনি। এ ময়দানেও আমি পরাজিত হতে চাই না। আমি কার্কের মুসলমানদের চারিত্রিক ও আদর্শিক পতন থেকে রক্ষা করতে চাই।
আপনি জানেন, কার্কে আমাদের গুপ্তচর আছে। এ লক্ষ্য অর্জনে আমি তাদের কাজে লাগাব। তারা সেখানকার মুসলমানদেরকে আপনার সম্পর্কে, আমাদের সেনা বাহিনী ও মিসর সম্পর্কে সঠিক খবরাখবর শোনাতে থাকবে এবং তাদের কাছে আপনার পয়গাম পৌঁছাতে থাকবে। বললেন জাহেদান।
ওখানকার মুসলিম মহিলাদের মধ্যে জাতীয় ও ঈমানী চেতনার কমতি নেই। আমরা মুসলিম যুবতীদের বলে দেব, যেন তারা ঘরে ঘরে মুসলিম মহিলাদের মন মানসিকতা ধোলাই করতে থাকে। আমি তো নিজের চোখে দেখেছি, সেখানকার মেয়েরা অস্ত্র হাতে লড়াই পর্যন্ত করতে প্রস্তুত। বলল এক গোয়েন্দা।
মহিলারা যদি নিজ নিজ ঘর ও শিশু-সন্তানদের চরিত্র গঠনের ময়দান নিয়ন্ত্রণে রাখে, তাহলে তাতেই ইসলামের প্রসার ও ইসলামী সাম্রাজ্যের বিস্তারে অনেক সাহায্য পাওয়া যাবে। তাদের বলে দাও, যেন তারা মুসলিম পরিবারগুলোতে এবং মুসলিম শিশু-কিশোরদের মধ্যে অনৈসলামী কার্যকলাপ ও ইসলাম-বিরোধী চিন্তা-চেতনা ঢুকতে না দেয়। আমি চেষ্টা করছি, যাতে শীঘ্র কার্ক আক্রমণ করতে পারি এবং শাবকের ন্যায় সেখানকার মুসলমানদেরও নির্যাতনের যাতাকল থেকে উদ্ধার করতে পারি। বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। তিনি জাহেদানকে জিজ্ঞেস করলেন, এ মিশন নিয়ে তুমি কাকে কার্ক পাঠাবে?
