মুচকি হাসলেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। বললেন- তারা যে লোহা পরিধান করে রেখেছে, তা তাদের নয়- উপকার দেবে আমাদের। দেখেননি, ওরা মার্চ করে হয়তো রাতে অথবা ভোরে? কারণ, তারা রোদ সহ্য করতে পারে না। সূর্যের তাপ তাদের বর্মগুলোকে জ্বলন্ত অংগারের ন্যায় উত্তপ্ত করে তোলে। তখন বর্মপরিহিত সৈনিকেরা তাদের লোহার ঐ পোশাকগুলো খুলে ছুঁড়ে ফেলতে চায়। তাছাড়া লোহার ওজন তাদের চলাচলের গতিও ব্যাহত করে তুলে। আমি তাদেরকে দুপুর বেলা লড়াই করতে বাধ্য করব। তাদের মাথার শিরস্ত্রাণগুলো ঘাম ঝরিয়ে ঝরিয়ে চোখে ফেলবে। তারা অন্ধ হয়ে যাবে। আর সংখ্যার ঘাটতি আমাদের পূরণ করতে হবে আবেগ ও কৌশল দিয়ে।
এ সময়ে এসে উপস্থিত হন আলী বিন সুফিয়ানের এক নায়েব জাহেদান। সাথে তার দুজন লোক। চমকে উঠলেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। তাদের বসতে দিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, খবর কি? জামার ভেতর হাত ঢোকালেন তারা। বের করে আনলেন কাঠের তৈরি দুটো ক্রুশ। এগুলো ঝুলানো ছিল তাদের গলায়। এরা খৃস্টান নয়- মুসলমান। নিজেদের খৃস্টান জাহির করার জন্য তারা গলায় ক্রুশ ঝুলিয়ে রাখে। দুজনই ক্রুশ দুটো খুলে নীচে ফেলে দেয়। রিপোর্ট পেশ করে একজন।
***
এরা দুজন গুপ্তচর। ফিরে এসেছে কার্ক থেকে। কার্ক ফিলিস্তীনের দুর্গবেষ্টিত একটি শহর। দখল খৃস্টানদের। শোবক নামক একটি দুর্গও তাদের দখলে ছিল। সেটির পতন ঘটেছে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর হাতে। কার্ক দুর্গকে কোনক্রমেই হাতছাড়া করতে চাইছে না তারা। তাই তারা শোবক পতনের পর কার্কের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক শক্ত করে ফেলেছে। এখন আর তারা দুর্গের ভেতরে থেকে যুদ্ধ করতে চাইছে না।
শোবক পতনের পর মুসলমানদের ভয়ে যখন খৃস্টান ও ইহুদী নাগরিকরা পালিয়ে কার্ক চলে যেতে শুরু করেছিল, তখন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী তার সেনাবাহিনী ও প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন, পলায়নপর অমুসলিমদের যেন ফিরিয়ে আনে এবং তাদের সাথে ভাল আচরণ করে। কিন্তু সুলতান একটি গোপন নির্দেশ এ-ও দিয়ে রেখেছিলেন যে, যারা চলে যেতে চায়, তাদেরকে যেতে দাও। রহস্য এই ছিল যে, তাহলে অমুসলিম নাগরিকদের সাথে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর গুপ্তচররাও কার্ক ঢুকে যেতে পারে। দুশমনের এই নগরীতে এবং তার আশ-পাশে-যার উপর অল্প কদিন পরই আক্রমণ হতে চলেছে–গুপ্তচর ঢুকিয়ে রাখার এটি এক মোক্ষম সুযোগ। ইহুদী ও খৃস্টান শরণার্থীদের বেশে মুসলিম গুপ্তচররা সে সুযোগে ঢুকে পড়েছিল কার্কে। সেখানকার মুসলিম বাসিন্দাদের সাথে নিয়ে একটি গোপন আড্ডা তৈরী করে নিয়েছিল তারা। সেখান থেকে তথ্য প্রেরণ করছিল সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট। সুলতান নিজ কানে শুনতেন তাদের রিপোের্ট।
আজও আসল দুজন গুপ্তচর। তৎক্ষণাৎ তাদের তাঁবুতে ডেকে নিয়ে গেলেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। সরিয়ে দিলেন অন্য সকলকে। খৃস্টান বাহিনীর গতি বিধি ও বিন্যাস সম্পর্কে নানা তথ্য প্রদান করে তারা। সে মোতাবেক ছক তৈরি করতে শুরু করেন সুলতান। এ সময়ে চেহারায় তার কোন পরিবর্তের ছাপ পরিলক্ষিত হয়নি। কিন্তু গুপ্তচররা যখন কার্কের মুসলিম নাগরিকদের নির্যাতনের করুণ চিত্র তুলে ধরতে শুরু করল, তখন বিবর্ণ হয়ে গেল সুলতানের চেহারা। আবেগাপ্লুত হয়ে এক পর্যায়ে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তাঁবুর মধ্যে পায়চারী করতে শুরু করলেন। গুপ্তচররা তাকে জানায়, শোবকে পরাজয় বরণ করে খৃস্টনরা কার্কের মুসলমানদের বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নিয়ে গেছে। সেখানকার হাট-বাজারগুলোতে মুসলমান। ব্যবসায়ীরা পথে বসতে শুরু করেছে। অমুসলিম ক্রেতারা তো তাদের থেকে সওদা ক্রয় করেই না, উপরন্তু মুসলমারদেরও ভয় দেখিয়ে তাদের দোকান থেকে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। সেখানে ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজ রুটিনে পরিণত হয়েছে। ইহুদী-খৃস্টানরা মসজিদগুলোর চত্বরে উট-ঘোড়া ও গরু ছাগল বেঁধে রাখছে। আযান-নামাযের উপর কোন নিষেধাজ্ঞা নেই বটে, তবে আযান শুরু হলেই অমুসলিমরা হৈ-চৈ, গান-বাদ্য শুরু করে দিয়ে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে।
গোয়েন্দা আরো জানায়
মুসলমানদের জাতীয় চেতনা নস্যাৎ করার জন্য সেখানে জোরেশোরে ছড়ানো হচ্ছে নানা রকম গুজব। প্রচার করা হচ্ছে সালাহুদ্দীন আইউবী গুরুতর জখম হয়ে দামেশক চলে গেছেন। এতক্ষণে হয়ত তিনি মারা গেছেন। আরো বলা হচ্ছে, নেতৃত্বের দুর্বলতার ফলে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সৈন্যরা মরুভূমিতে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে এবং তারা পালিয়ে মিসর চলে যাচ্ছে। গুজব ছড়ানো হচ্ছে, মুসলমানদের এখন আর কার্ক আক্রমণ করার শক্তি নেই এবং অতি সতুর শোবক দুর্গ খৃস্টানদের হাতে চলে আসছে। প্রচার করা হচ্ছে, সুদানীরা মিসর আক্রমণ করেছে এবং মিসরের সৈন্যরা স্বপক্ষ ত্যাগ করে সুদানীদের সাথে একাত্ম হয়ে গেছে। আরো কত কি গুজব ছড়িয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে কার্কের মুসলমারদের।
গুপ্তচররা জানায়, এখন প্রতিদিন ভোরে খৃস্টান পাদ্রীরা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায় এবং মুসলমানদের ঘরের দরজায় গিয়ে গিয়ে ঘন্টা বাজায়, গান গায় ও মুসলমানদের জন্য প্রার্থনা করে। পাদ্রীরা এর বেশী কিছু করে না। ইহুদী ও খৃস্টান মেয়েরা মুসলমানদের মধ্যে তাদের ধর্ম প্রচারের দায়িত্ব আঞ্জাম দেয়। প্রেম-ভালোবাসার ফাঁদ পেতে মুসলিম যুবকদের চিন্তা-চেতনা ধ্বংস করছে সুন্দরী তরুণীরা। বান্ধবী বানিয়ে ঘনিষ্ঠতা অর্জন করে স্বাধীনতার চিত্তাচর্ষক প্রলোভন দেখাচ্ছে তারা মুসলিম মেয়েদের। তাদের ধারণা দিচ্ছে যে, মুসলিম বাহিনী যখনই যে এলাকা জয় করছে, তারা সেখানকার অন্যদের সাথে মুসলিম মেয়েদেরও সম্ভ্রম নষ্ট করছে।
