সামরিক উপদেষ্টাগণ বললেন, সুদান আক্রমণের সিদ্ধান্ত সঠিক ও সময়োচিত পদক্ষেপ। কিন্তু মহামান্য এতে সুলতানের মতামত নেয়া প্রয়োজন। জবাবে তকিউদ্দীন তার উপদেষ্টাদের পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করে বললেন- আপনারা কি মোহতারাম আইউবীকে একথা বুঝাতে চান যে, আপনারা তাকে ছাড়া কিছুই করতে পারেন না? আপনারা কি জানেন না যে, মিসর থেকে সুদূর এক এলাকায় কেমন এক ঝড়ের তিনি মোকাবেলা করছেন? আমাদের তার পরামর্শ ও সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকার অর্থ হবে সুদানীদেরকে মিসর আক্রমণের সুযোগ করে দেয়া।
আপনি এক্ষুণি আক্রমণ করার আদেশ দিন। বাহিনী এ মুহূর্তে যে অবস্থায় আছে, রসদ ছাড়াই সে অবস্থায় রওনা হয়ে যাবে। কিন্তু আমি এত বড়, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি অভিযানের জন্য গভীর ভাবনা-চিন্তা প্রয়োজন মনে করি। রওনা হওয়ার সকল আয়োজন আমরা অতি অল্প সময়ে সম্পন্ন করে ফেলতে পারি। কিন্তু আমরা চাই যে, আপনি মহামান্য আইউবীকেও বিষয়টি অবহিত করে রাখুন, যাতে তিনি ও মোহতারাম জঙ্গী এদিকে দৃষ্টি রাখেন।
কিন্তু তকিউদ্দীন মানলেন না। তিনি বললেন- মিসরে আপনারা এক একজন গাদ্দার, এক একটি সন্ত্রাসী গ্রেফতার করছেন আর মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছেন। আমি চাই এই গাদ্দারী আর নাশকতার উৎস বন্ধ করতে। এ কাজের জন্য আমার কারো নির্দেশ বা পরামর্শের প্রয়োজন নেই।
মিসরে খৃস্টান ও সুদানীদের গুপ্তচররা তৎপর। এখানকার সামরিক সব তৎপরতার প্রতি নজর রাখছে তারা। ইচ্ছে করলে তারা তকিউদ্দীনের সুদান আক্রমণের পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দিতে পারে। কিন্তু তকিউদ্দীন সে বিষয়টি ভেবে দেখলেন না। তার একটি দুর্বলতা এও ছিল যে, তার দুশমনের গুপ্তচরদের একদল হল মুসলমান, যাদের এক একজন প্রশাসন ও সামরিক বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তা। তার বিপরীতে তকিউদ্দীনের গুপ্তচররা সুদানের রাজনৈতিক ও নীতি নির্ধারকদের পর্যন্ত যেতে পারে না। তাছাড়া সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ১৯৬৯ সালে মিসরের যে সুদানী বাহিনীটিকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন, তার কয়েকজন কমান্ডার-কর্মকর্তা এখন সুদানে অবস্থান করছেন। তারা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সমর-কৌশল সম্পর্কে অবহিত। সেই কৌশল অনুযায়ী তাদের বাহিনীকে গড়ে নিয়েছে তারা। খৃস্টানরা তাদের উন্নতমানের অস্ত্র এবং প্রয়োজনেরও অধিক সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে রেখেছে। মিসরের নাড়ী-নক্ষত্র তাদের জানা।
তকিউদ্দীন আরো যে বিষয়টি ভেবে দেখলেন না, তা হল, তিনি সুদানের যে এলাকায় পা রাখতে যাচ্ছেন, সেটি বিশাল এক মরু অঞ্চল। পানির অভাব সেখানে অত্যন্ত প্রকট। আর যে জায়গায় গিয়ে তার আক্রমণ করতে হবে, মিসর থেকে তার দূরত্ব এত বেশী যে, সে পর্যন্ত রসদ সরবরাহ অব্যাহত রাখা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সর্বোপরি মিসরের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নাশকতামূলক কর্মকান্ডের প্রতি নজরদারী করার জন্যও সৈন্যের প্রয়োজন। কিন্তু তকিউদ্দীন এতই আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছেন যে, এসব কিছু উপেক্ষা করেই তিনি আক্রমণের প্রস্তুতি শুরু করে দেন এবং সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে অবহিত না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন।
তকিউদ্দীনের এই স্বাধীনচেতা মানসিকতায় সেই জযবাই কাজ করছিল, যা ছিল সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর মধ্যে। তিনি জানতেন যে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী কেমন প্রচন্ড ঝড়ের মোকাবেলা করছেন এবং খৃস্টানরা চূড়ান্ত লড়াই করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
এ মুহূর্তে কার্ক থেকে আট-নয় মাইল দূরে একটি পার্বত্য এলাকায় হেডকোয়ার্টারে অবস্থান করছেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। এটি তার অস্থায়ী ছাউনি। কৌশলগত কারণে এক সময় এক স্থানে অবস্থান নিচ্ছেন তিনি। তখন তিনি যে এলাকায় আক্রমণ পরিচালনা করার কিংবা গেরিলা হামলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তখন তার সন্নিকটে কোথায় ছাউনি ফেলছেন। আক্রমণকারী বাহিনীর কমান্ডারকে জানিয়ে রাখছেন, ফেরার সময় তিনি কোথায় থাকবেন।
শত্রুবাহিনীর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে ফিরছে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর কমান্ডো বাহিনী। জানবাজ কমান্ডোদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলগুলো এক মহাবিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে মরুভূমিতে ছড়িয়ে থাকা খৃস্টান বাহিনীর জন্য। ব্যাপক ক্ষতি সাধন হচ্ছে খৃস্টানদের।
কিন্তু কমান্ডোদের শাহাদাতবরণের ঘটনাও বেড়ে গেছে ব্যাপকহারে। আক্রমণকারী দলে কমান্ডো থাকে যদি দশজন, তত ফিরে আসে তিন-চারজন। খৃস্টানরা এমন ব্যবস্থা করে রেখেছে, যা কমান্ডোদের সাফল্যের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। ফলে জীবনের সীমাহীন ঝুঁকি নিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে তাদের। তাই কৌশল পরিবর্তনের কথা ভাবতে শুরু করেছেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।
খৃস্টানরা বোধ হয় আমাকে মুখোমুখী লড়াইয়ে আসতে বাধ্য করছে। কিন্তু আমি তাদেরকে সফল হতে দেব না। তাছাড়া আপাততঃ আমার এতো লোকও আমি মরতে দেব না। বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।
আমি আপনাকে গেরিলা বাহিনীর লোকসংখ্যা বৃদ্ধি করার পমামর্শ দেব। এ পরামর্শও দেব যে, আমাদের শুধু এ কারণে দুশমনের শক্তিকে উপেক্ষা করা ঠিক হবে না যে, আমাদের সৈন্যদের আবেগ অনেক বেশী। কিন্তু আবেগ একজন সৈনিককে প্রাণপণ যুদ্ধে জড়িয়ে খুন করাতে পারে, বিজয়ের জামিন হতে পারে না। খৃস্টানদের মোকাবেলায় আমাদের সৈন্যসংখ্যা অনেক কম। আমাদের এ কথাও ভুললে চলবে না যে, খৃস্টানদের অধিকাংশ সৈনিক বর্মপরিহত। বললেন এক নায়েব।
