তারপর দশ-বারটি মেয়েকেও নিয়ে আসা হয় জনতার সম্মুখে। এরা অত্যন্ত রূপসী যুবতী। এদের সাথে আছে বেশকজন সুদর্শন পুরুষ।
জনতার ভীড়ের সামনে একটি উঁচু স্থানে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয় এ দল দুটিকে। মুখোশ খুলে জনতার সামনে আসল রূপ প্রদর্শন করার নির্দেশ দেয়া হয় তাদের। সাথে সাথে বাঘের কৃত্রিম চেহারা খুলে ফেলে তারা। স্বাভাবিক মানবাকৃতির বেরিয়ে আসে তার ভেতর থেকে।
জনতাকে নির্দেশ দেয়া হয়, তোমরা কাছে এসে দেখ এদের চেন কিনা। নির্ভয়ে তাদের নিকটে যায় জনতা। চোখ বুলিয়ে দেখে সবাইকে। দেখে তারা হতভম্ব। কোথাকার এরা আকাশের প্রাণী! এরা দেখছি সকলেই আমাদের চেনা-জানা পরিচিত। সকলেই তাদের এলাকার মানুষ। এ খৃস্টান চক্রটির উদ্দেশ্য, মুসলমানদের মধ্যে এই বিশ্বাস সৃষ্টি করা যে, সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়া অন্যায় কাজ। যুদ্ধ করা মস্ত বড় পাপ। এ উদ্দেশে চক্রটি সম্পূর্ণ সফল। এ এলাকার লোকদের মনে সুদানীদের প্রতি সমর্থন সৃষ্টিতেও সফল হয়েছে এ চক্রটি। ধর্ম পরিবর্তন না করেই তাদের ধর্মহীণ করে তুলেছে তারা।
জনতাকে বলা হল, এবার তোমরা প্রাসাদে ঢুকে অবলীলায় ঘুরে-ফিরে দেখ এবং খৃস্টান কুচক্রীদের ষড়যন্ত্র-প্রতারণার প্রমাণ স্বচক্ষে দেখে আস। মানুষ দলে দলে ভেতরে ঢুকে পড়ে। স্থানে স্থানে দাঁড়িয়ে আছে সেনারা। এখানে জনতাকে কিভাবে প্রতারিত করা হয়েছিল, সেনারা তার বিবরণ দেয়।
দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণ করে জনতা বাইরে বেরিয়ে এলে তকিউদ্দীন তাদের উদ্দেশে ভাষণ দান করেন। ভাষণে তিনি জানান, প্রাসাদে প্রবেশ করার সময় আপনাদের যে খেজুর ও পানি দেয়া হত, তার সাথে আপনাদের নেশা মিশিয়ে খাওয়ানো হত। ভেতরে যে জান্নাত-জাহান্নাম দেখানো হত, তা নেশার ক্রিয়ায় আপনাদের দৃষ্টিগোচর হত। এই কুচক্রীদের বলুন, ভেতরে গিয়ে তোমরা দেখাও হযরত মূসা (আঃ) কোথায় এবং মৃত খলিফা আল আজেদই বা কোথায়। এসব ছিল প্রতারণা। এ সেই নেশা, যা খাইয়ে হাশীশীদের গুরু হাসান ইবনে সাব্বাহ মানুষদের জান্নাত প্রদর্শন করত। সে তো একসময়ে কয়েকজন মানুষকে নেশা খাওয়াত মাত্র। আর এখানে ইসলামের এই দুশমনরা বিশাল একটি অঞ্চলের বাসিন্দাদের মাতাল করে তুলেছে।
জনতার সামনে ঘটনার আসল চিত্র তুলে ধরে তকিউদ্দীন বললেন, প্রথমে আপনাদেরকে একজন দরবেশের কাহিনী শোনানো হয়েছিল, যে পথিকদের উষ্ট্র ও স্বর্ণমুদ্রা দান করত। তা ছিল নিছক ভিত্তিহীন গুজব। যারা আপনাদেরকে এসব কাহিনী শোনাত, তারা ছিল ইসলামের দুশমনদের দালাল, খৃস্টানদের মদদপুষ্ট।
তকিউদ্দীনের ভাষণের পর উত্তেজিত হয়ে উঠে জনতা। ক্ষিপ্ত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে কুচক্রীদের উপর। ততক্ষণে রাতের নেশা কেটে গেছে তাদের। বিক্ষুব্ধ জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে সেনারা। কিন্তু গ্রেফতারকৃত সকল কুচক্রী ও মেয়েদের প্রাণে মেরেই তবে ক্ষান্ত হয় জনতা।
এলাকায় সেনাবাহিনী ছড়িয়ে দেন তকিউদ্দীন। দুশমনের দালালদের খুঁজে খুঁজে গ্রেফতার করে তারা। কায়রোর হক্কানী আলেমদের ইমাম নিযুক্ত করা হয় মসজিদগুলোতে। ধর্মীয় ও সামরিক তালিম-তরবিয়ত শুরু করে দেয়া হয় ফেরাউনী আমলের পরিত্যক্ত প্রাসাদগুলোতে।
.
কায়রো ফিরে গিয়ে দুটি কাজ আঞ্জাম দেন তকিউদ্দীন। প্রথমত, ডাক্তার শারজাকে বিবাহবন্ধনে আবন্ধ করলেন, যা ছিল শারজার মনের ঐকান্তিক কামনা। দ্বিতীয়ত সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডোকে সুদান আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন। প্রাসাদ অভিযানে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র সুদান মিসরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে এমনভাবে তাদের প্রভাব-বলয়ে নিয়ে নিয়েছে যে, প্রচণ্ড সামরিক অভিযান ছাড়া তা প্রতিহত করা সম্ভব নয়। তিনি আরো তথ্য পেয়েছিলেন যে, সুদানীরা খৃস্টানদের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে এবং তারা যথারীতি মিসর আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাই তার আগেই সুদান আক্রমণ করা অত্যাবশ্যক বলে সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তাতে সুদানের কোন এলাকা দখলে আসুক বা না আসুক এতটুকু উপকার অবশ্যই হবে যে, দুশমনের আয়োজন লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে এবং তাদের পরিকল্পনা দীর্ঘ সময়ের জন্য পিছিয়ে যাবে।
২.৫ রাইনি আলেকজান্ডার-এর চূড়ান্ত লড়াই
রাইনি আলেকজান্ডার–এর চূড়ান্ত লড়াই
খৃস্টানদের একটি ষড়যন্ত্র যথাসময়ে নস্যাৎ করে দিলেন মিসরের ভারপ্রাপ্ত গবর্নর তকিউদ্দীন। ষড়যন্ত্রের আখড়াটি ভেঙ্গে চুরমার করে দিলেন তিনি। তবু তিনি চিন্তামুক্ত হতে পারেননি। কারণ, তিনি জানেন যে, ইসলাম-বিধ্বংসী হলাহল মিশে গেছে। জাতির শিরায় শিরায়। খৃস্টানদের এই নাশকতামূলক কর্মকান্ডে সমর্থন যোগাচ্ছে সুদানীরা। আর সুদানীরা পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে খৃস্টানদের।
ফেতনার এই আড্ডাটিও ধ্বংস করার পরিকল্পনা নেন তকিউদ্দীন। সুদান আক্রমণের জোরদার প্রস্তুতি শুরু করে দেন তিনি। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী গোয়েন্দা পাঠিয়ে রেখেছিলেন সুদানেও। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে রিপোর্ট প্রেরণ করছে তারা। সুদানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচ্ছেন তকিউদ্দীন। কিন্তু সেসব তথ্যাবলীকে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী যতটুকু কাজে লাগাতে পারতেন, ততটুকু পারছেন না ভাই তকিউদ্দীন। দুভাইয়ের চিন্তা-চেতনা, আবেগ জযবা সমান বটে; কিন্তু দুজনের বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতায় তফাত অনেক। দুজনের সিদ্ধান্তই কঠোর-আপোসহীন। কিন্তু সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী পা ফেলেন মেপে মেপে-সাবধানে। আর তকিউদ্দীন হলেন অস্থির স্বভাবের মানুষ।
