সম্মুখে এগিয়ে আসে তকিউদ্দীনের দুশ অশ্বারোহী। তারা প্রাসাদ এলাকাটি ঘিরে ফেলে। পদাতিক বাহিনীও আছে তাদের সাথে। ভেতর থেকে বহির্গমনকারীদের একদিকে একত্রিত করতে শুরু করে তারা। মশালধারীদের পেছনে পেছনে ভিতরে প্রবেশ করার পর কমান্ডোদের কাছে মনে হল, যেন তারা কারো উদরে চলে এসেছে। সরুপথ অতিক্রম করে করে তারা এমন এক স্থানে গিয়ে উপনীত হয়, সেখানকার দৃশ্য দেখে কমান্ডোরা থমকে দাঁড়ায়।
.
একটি খোলামেলা কক্ষ। ছাদটি বেশ উঁচু। ভেতরে অনেক নারী আর পুরুষ। তাদের কারো কারো চেহারা বাঘের ন্যায় ভয়ংকর। অনেকের চেহারা এতই বীভৎস ও ভয়ংকর যে, দেখলে ভয়ে দেহের লোম দাঁড়িয়ে যায়। দেখতে তাদের জিন-ভূতের ন্যায় মনে হয়। তাদের মাঝে চকমকে পোশাক পরিহিত কিছু সুন্দরী যুবতী হাসছে খেলছে। একদিকে দেয়ালের সাথে কয়েকটি রূপসী মেয়ে কয়েকজন সুদর্শন পুরুষের সাথে ঠাট করে হেঁটে যাচ্ছে। অপরদিকে ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত দীর্ঘ একটি পর্দা ঝুলে আছে। পর্দাটা ডানে-বাঁয়ে নড়াচড়া করছে এবং একবার খুলে যাচ্ছে আবার বন্ধ হচ্ছে। আরেক দিকে চোখ ঝলসানো আলো জ্বলছে আর নিভছে।
কমান্ডোদের যদি নিশ্চিতভাবে জানানো না হত যে, প্রাসাদে যাকেই দেখবে, যেমন আকৃতিই চোখে পড়বে, সকলেই মানুষ এবং সেখানে ভূত-প্রেত বলতে কিছু নেই; তাহলে ভয়ে তারা সেখান থেকে নির্ঘাত পালিয়ে যেত। সেখানকার সুন্দরী মেয়ে আর সুদর্শন পুরুষগুলোও ভয়ংকর বলে মনে হচ্ছিল তাদের কাছে। কমান্ডোদের দেখে অদ্ভুত এই প্রাণীগুলো ভীতি সৃষ্টির জন্য ভয়ংকর শব্দ করতে শুরু করে দিয়েছিল। বাঘের চেহারার বীভৎস লোকগুলোর শব্দ ছিল বেশী ভীতিকর। এ সময়ে সম্ভবত ভয়ে দুতিনজন লোক তাদের মুখোশ খুলে ফেলে। তাদের চেহারা ছিল বাঘের ন্যায়। ব্যাঘের মুখোশ খুলে ফেলার পর ভেতর থেকে আসল মানবাকৃতি বেরিয়ে আসে তাদের।
কমান্ডোরা ঘিরে ধরে ফেলে তাদের সকলকে। মুখোশ খুলে ফেলে সব কজনের। নিয়ে যাওয়া হল বাইরে।
অনুসন্ধান চালানো হল প্রাসাদের অন্যত্র। পাকড়াও করা হল এক ব্যক্তিকে। লোকটি একটি সরু সুড়ঙ্গের মুখে মুখ রেখে বলছে, তোমরা গুনাহ থেকে তওবা কর। হযরত ঈসা (আঃ) এসে গেছেন বলে…। এ সুড়ঙ্গ পথটি এঁকেবেঁকে চলে গেছে সেই আলোকময় কক্ষে যেখানে দর্শনার্থীদের এসব রহস্যময় ভয়ংকর ও সুদর্শন দৃশ্যাবলী প্রদর্শন করে লোকদের অভিভূত করা হয়। লোকটিকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে কমান্ডো বাহিনীর এক কমান্ডার সুড়ঙ্গে মুখ রেখে বলে, লোক সকল! আজ রাতে তোমরা ঘরে ফিরো না। কাল সকালে তোমাদের সামনে সেই রহস্য উন্মোচিত হবে, তোমরা যার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছ।
কমান্ডোদের সাথে সংঘাতে আসেনি প্রাসাদের কেউ। কমান্ডোদের খঞ্জর ও তরবারীর সামনে গ্রেফতারির জন্য নিজেদের সমর্পণ করে একে একে সকলে। গ্রেফতারকৃতদের নির্দেশনা মোতাবেক কমান্ডোরা সেসব জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে বিজলীর ন্যায় উজ্জ্বল আলোর ব্যবস্থা ছিল। ছিমছাম নিরাপদ একটি স্থানে কতগুলো বাতি জ্বলছে। বাতিগুলোর পেছনে কতগুলো কাঠের তক্তা। তক্তাগুলো শীশার মত পাত করা। এই শীশার চমকই মানুষের চোখে গিয়ে পড়ত। কক্ষটিকে অন্ধকার করার জন্য বাতিগুলো নিয়ে যাওয়া হত পেছনে। একদিকে ঝুলানো অনেকগুলো পর্দা। পর্দাগুলোর স্থানে স্থানে শীশার টুকরো আটকানো। এগুলোতে আলো পড়লেই ঝলমল করে উঠতো তারকার ন্যায়। তাছাড়া পর্দাগুলোর রঙও এমন যে, কারো বলার সাধ্য ছিল না যে এগুলো কাপড়। দেখলে মনে হয় ফাটা দেয়াল। বিবেকসম্পন্ন লোকদের কাছে এসব বিস্ময়কর কিছু নয়। এসব হল আলোর জাদু, যা সম্মোহিত করে ফেলত মানুষদের। কিন্তু যে-ই ভেতরে প্রবেশ করত, তার হুশ-জ্ঞান তার নিজের আয়ত্বে থাকত না। ভেতরে প্রবেশ করার সময় লোকদের যে খেজুর পানি খাওয়ানো হত, তাতে নেশাকর মিশ্রণ থাকত। খাওয়ার পর সাথে সাথে তার ক্রিয়া শুরু হয়ে যেত। ফলে দর্শনার্থীদের মন-মস্তিষ্কে যে ধারণা এবং কানে যে শব্দই দেয়া হত, তাদের কাছে তা শতভাগ সঠিক বলে মনে হত। সে নেশার প্রতিক্রিয়ায়ই মানুষ বাইরে বের হয়ে পুনরায় প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করার জন্য উদগ্রীব হয়ে যেত। তারা জানত না যে, এটি তাদের বিশ্বাসের ক্রিয়া নয়; এটি সেই নেশার ক্রিয়া, যা তাদের খেজুর ও পানির সাথে মিশিয়ে খাওয়ানো হত।
খেজুরের স্তূপ আর পানির মশকগুলোও কজা করে নেয় কমান্ডোরা। ধর-পাকড় অব্যাহত থাকে ভেতরে। বাইরে সমগ্র প্রাসাদ এলাকাটি অবরোধ করে আছে দুশ সৈন্য। সর্বত্র মশালের আলো। ফৌজের বৃহৎ অংশটি এবং দুটি সীমান্ত ইউনিট টহল দিচ্ছে সুদানের সীমান্ত এলাকায়।
.
রাত কেটে গেছে। সুদানের দিক থেকে কোন হামলা আসেনি। সংঘাত হয়নি প্রাসাদেও। সর্বত্র ভীত-সন্ত্রস্ত এলাকাবাসীর ভীড়। রাতে এদিক-ওদিক ঘুমিয়েছিল অনেকে। তাদের অবরোধ করে রেখেছে অশ্বারোহী বাহিনী।
***
কিছুক্ষণ পর একস্থানে একত্রিত করে বসিয়ে দেয়া হয় জনতাকে। সংখ্যায় তারা তিন থেকে চার হাজার। একদিক থেকে এক পাল লোককে হাঁকিয়ে নিয়ে আসে সেনারা। এরা সকলে ব্যাঘ্রের মুখোশপরা মানুষ। কুৎসিত ও ভয়ানক এদের আকৃতি। এরা সেইসব লোক, প্রাসাদের ভেতরে জনতাকে যাদের প্রদর্শন করা হত আর বলা হত এরা পাপিষ্ঠ। কৃত অপরাধের সাজা ভোগ করছে এরা। এদের অপরাধ ছিল, এরা যুদ্ধ-বিগ্রহে অভ্যস্ত ছিল। অর্থাৎ এরা মুজাহিদ।
