এক বৃহস্পতিবারের সন্ধ্যাবেলা। শতশত দর্শনার্থী গুহাসদৃশ দরজা অতিক্রম করে প্রবেশ করছে প্রাসাদের ভিতরে। ভেতরের বৃহৎ কক্ষটিতে গুঞ্জরিত হচ্ছে রহস্যময় কণ্ঠস্বর। নেক-বদ নির্বিশেষে সব মানুষই বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের ন্যায় ঢুকে যাচ্ছে ভেতরে। হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায় রহস্যময় সেই দরবেশের কণ্ঠস্বর, যার ব্যপারে জনশ্রুতি ছিল যে, বদকার মানুষ তার সাক্ষাৎ পায় না। তার স্থলে ভেসে এল আরেকটি কণ্ঠস্বর- লোক সকল! আজ রাতে তোমরা কেউ ঘরে যেও না। কাল সকালে তোমাদের সম্মুখে সেই রহস্য ফাঁস হয়ে যাবে, যার জন্য তোমরা উদগ্রীব হয়ে আছ। এক্ষুণি তোমরা এখান থেকে বের হয়ে যাও। হযরত ঈসা (আঃ) আগমন করছেন। এ প্রাসাদ থেকে বের হয়ে দূরে কোথাও গিয়ে তোমরা শুয়ে পড়।
ইতিপূর্বে বড় কক্ষের দেয়ালে যেসব উজ্জ্বল তারকা ভেসে উঠত, আজ তা মন্দীভূত। দৃশ্যে যেসব রূপসী তরুণী আর সুদর্শন পুরুষ হেসে-খেলে ভেসে বেড়াত, এবার দেখা গেল সিপাহীর মত একদল মানুষ তাদের ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। চিৎকারের শব্দও ভেসে আসছে মাঝে-মধ্যে। বন্ধ হয়ে গেছে মেঘের গর্জন, বিদ্যুতের চমক। এলাকাবাসীর চোখে যে স্থানটি ছিল অতিশয় পবিত্র, সেটি এখন ভয়ংকর এক স্বপ্নপুরী। ভয়ার্ত মানুষগুলো অল্পক্ষণের মধ্যে হুড়মুড় করে বেরিয়ে যায়। শূন্য হয়ে যায় প্রাসাদ।
এ বিপ্লব সাধন করেছেন তকিউদ্দীন ও আলী বিন সুফিয়ান। তকিউদ্দীনের প্রেরিত সৈন্যরা সন্ধ্যার পর গিয়েছিল পার্বত্য এলাকার সন্নিকটে। তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে আসছে শারজা। শারজা অশ্বারোহী। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সৈন্যদের পার্বত্য এলাকায় নিয়ে আসে মেয়েটি। প্রতি সপ্তাহে এইবারে এখানে মেলা বসে এবং দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসে। বাহিনীর বড় অংশটিকে- যাতে আছে দুশ অশ্বারোহী, দুশ উষ্ট্রারোহী আর পাঁচশ পদাতিক দাঁড় করিয়ে রাখা হয় খানিক দূরে। সুদানের সীমান্তের উপর নজর রাখা তাদের দায়িত্ব। অসামরিক লোকদের উপর আক্রমণ করতে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে তাদের। প্রাসাদের নাশকতামূলক তৎপরতা যেহেতু পরিচালিত হচ্ছিল খৃস্টান ও সুদানীদের পৃষ্ঠপোষকতায়, তাই সেখানে সামরিক অভিযান পরিচালিত হলে সুদানীদের পক্ষ থেকে হামলা আসার আশংকা ছিল প্রবল।
তকিউদ্দীনের সাথে দামেশক থেকে এসেছিল বাছা বাছা দুশ দুসাহসী অশ্বারোহী। ধাবমান ঘোড়ার পিঠ থেকে লক্ষ্যভেদী তীর নিক্ষেপ করা তাদের একটি বিশেষ গুণ। পদাতিক বাহিনীতে আছে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর নিজ হাতে গড়া বেশকিছু দুর্ধর্ষ কমান্ডো। তাদের এমন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল যে, অতীব দুর্গম টিলা পর্বত ও বিশাল বিশাল গাছে অবলীলায় উঠানামা করতে পারে তারা। কয়েক গজ বিস্তৃত জ্বলন্ত আগুনের মধ্যদিয়ে আক্রমণ করা তাদের জন্য সাধারণ ব্যাপার।
দর্শনার্থীরা যখন দলে দলে প্রাসাদে প্রবেশ করছিল, ঠিক তখন প্রাসাদ অভিমুখে রওনা করা হয় এই জানবাজ কমান্ডোদের। সে পর্যন্ত নিয়ে যায় তাদের শারজা। সাথে তাদের আলী বিন সুফিয়ান। সাথে আছে তাদের দ্রুতগামী দূত, যাতে বার্তা পৌঁছাতে সময় না লাগে। প্রাসাদের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে দুজন লোক। ভেতরে গমনকারীদের তিনটি করে খেজুর আর পানি খাওয়াচ্ছে তারা। দরজা অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশ করলেই ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। বাইরে জ্বলছে ক্ষীণ আলোর একটি প্রদীপ।
দর্শনার্থীদের সাথে প্রাসাদের ফটকের নিকট পৌঁছে যায় ছয়জন লোক। সবার মাথা চাদর দিয়ে ঢাকা। ভেতরে গমনকারীদের খেজুর খাওয়াচ্ছে যে চারজন, ভিড় এড়িয়ে তাদের পেছনে গিয়ে দাঁড়ায় তারা। তাদেরকে সম্মুখ দিয়ে যেতে বলা হয়; কিন্তু কারো কথায় কর্ণপাত নেই তাদের। উল্টো দুজনের পিঠে খঞ্জরের আগা ঠেকিয়ে কানে কানে বলে, বাঁচতে হলে এখান থেকে সরে যাও। এ মুহূর্তে তোমরা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ঘেরাওয়ে রয়েছ। তারা ছয়জন কমান্ডো সদস্য।
টু-শব্দটি না করে সরে যায় তোক দুজন। উপস্থিত জনতাকে না দেখিয়ে নিজ নিজ চোগার পকেটে খঞ্জরগুলো লুকিয়ে ফেলে কমান্ডোরা। বাইরে ছদ্মবেশে দাঁড়িয়ে আছে আরো দশ-বারোজন কমান্ডো। ছয় কমান্ডোর হুমকির মুখে চার ব্যক্তি যেইমাত্র বাইরে বেরিয়ে আসে, অমনি তাদের ঘিরে ফেলে ছদ্মবেশী দশ-বারোজনের কমান্ডো দলটি। কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে তাদের টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যায় দূরে। সেখানে রশি দিয়ে বেঁধে ফেলা হয় তাদের। খেজুরের কূপ ও পানির মশকের নিকট দণ্ডায়মান ছয় কমান্ডো ভেতরে গমনকারী জনতাকে বলতে শুরু করে, আপনারা আজ খেজুর পানি ছাড়াই ভেতরে ঢুকে পড়ুন। ভেতর থেকে নতুন পয়গাম এসেছে। কোন উচ্চবাচ্য না করে জনতা ভেতরে প্রবেশ করতে শুরু করে।
এবার আম-জনতার সাথে কমান্ডো সদস্যও ভেতরে ঢুকতে শুরু করে। ঢুকছে বাতি-প্রদীপ। অন্তত পঞ্চাশটি বাতি ও দুশ কমান্ডো ভেতরে ঢুকে যায়। আলোকিত কক্ষে না গিয়ে তারা চলে যায় অন্ধকার সরুপথ ও ছোট কক্ষে- বাইরের মানুষ যেখানে ইতিপূর্বে যায়নি কখনো। তাদের কারো কাছে খঞ্জর, কারো নিকট তরবারী, কারো হাতে ছোট ছোট তীর-ধনুক। যে পথে জনতা বাইরে বের হত, সে পথেও ঢুকে পড়ে কমান্ডোরা। নির্দেশনা মোতাবেক আঁকাবাঁকা সরু গলিপথে ঢুকে পড়ে তারা।
