তাদের এই পরিকল্পনার প্রেক্ষিতে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী শোবকের সেই দিকটিকে শূন্য করে ফেলেন, যেদিক থেকে খৃস্টানরা দুর্গের উপর আক্রমণ করার সম্ভাবনা আছে। পথ পরিস্কার দেখে খৃস্টানরা যাতে শোবক আক্রমণে এগিয়ে আসে, তার জন্য সুযোগ করে দেন সুলতান। সেদিক থেকে তিনি পর্যবেক্ষণ চৌকিগুলোও প্রত্যাহার করে নেন এবং দূর-দূরান্ত পর্যন্ত এলাকা খালি করে দেন।
খৃস্টান গুপ্তচররা সাথে সাথে কার্কে সংবাদ পৌঁছিয়ে দেয় যে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী খৃস্টানদের সাথে লড়াই করতে তার বাহিনীকে শোবক থেকে দূরে এক স্থানে সমবেত করেছে এবং শোবকের রাস্তা খালি করে দিয়েছে। এই সংবাদ পেয়ে খৃস্টানরা তাদের বাহিনীকে- যাদেরকে সুলতান আইউবীর উপর সম্মুখ থেকে আক্রমণ পরিচালনা করার জন্য রওনা করা হয়েছিল- নির্দেশ প্রদান করে, যেন তারা গতি পরিবর্তন করে শোবকের দিকে চলে যায়। নির্দেশমত বাহিনীটি শোবকের পথ ধরে অগ্রসর হতে শুরু করে। তাদের পেছনে পেছনে আসছে বিপুল রসদবাহী কাফেলা। শোবকের চার মাইল দূরে থাকতেই কাফেলা যাত্রাবিরতি দেয় এবং অস্থায়ী ছাউনী ফেলে সেখানেই অবস্থান গ্রহণ করে। রসদবাহী হাজার হাজার ঘোড়া-গাড়ী ও উট খচ্চর এখনো এসে পৌঁছায়নি। কোন শংকা নেই তাদের মনে। কারণ, দূর-দূরান্ত পর্যন্ত মুসলিম বাহিনীর নাম-চিহ্নও দেখছে না তারা।
.
আনন্দে উৎফুল্ল খৃস্টান সম্রাটগণ। শোবক দুর্গকে তারা তাদের পদানত দেখছে। কিন্তু রাতে পাঁচ-ছয় মাইল দূরের আকাশটা হঠাৎ লাল হয়ে গেছে দেখতে পায় তারা। একদিক থেকে ছুটে গিয়ে আকাশ লাল করে অপর একদিকে গিয়ে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে অসংখ্য অগ্নিশিখা। কি হল দেখে আসার জন্য অশ্বারোহী ছুটায় খৃস্টানরা। তাদের রসদবাহী কাফেলা শেষ হয়ে গেছে সব। ঘটনাস্থলে পৌঁছে অশ্বারোহী দলটি দেখতে পায়, লাগামহীন ঘোড়া আর দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য উট-খচ্চরগুলো ইতস্ততঃ ছুটাছুটি করছে মরুভূমিতে।
এ ধ্বংসযজ্ঞ সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর একটি কমান্ডো বাহিনীর কৃতিত্ব। খৃষ্টানদের রসদের মধ্যে ঘোড়ার খাদ্য হিসেবে শুকনো খড় বোঝাই ছিল অসংখ্য ঘোড়াগাড়ী। রসদ-ক্যাম্পে চারদিকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল সেগুলো। খৃস্টানদের মুখে বিজয়ের আগাম হাসি। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের উপর যে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সতর্ক দৃষ্টি বিদ্যমান, সে খবর তাদের নেই। রাতে যখন রসদ ক্যাম্পের সবাই নিশ্চিন্ত ঘুমিয়ে পড়ে, তখন এই মুসলিম কমান্ডো বাহিনীটি শুকনো ঘাসের উপর আগুনের সলিতা বাঁধা তীর ছুঁড়ে। সাথে সাথে ঘাসে দাউ দাউ করে আগুন ধরে যায়। মুহর্তের মধ্যে আগুনের বেষ্টনীতে পড়ে যায় গোটা ক্যাম্প। অবরুদ্ধ মানুষগুলো প্রাণরক্ষা করার উদ্দেশ্যে এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করতে শুরু করলে তাদের উদ্দেশ্যে তীর ছুঁড়ে কমান্ডে সেনারা। যেসব পশু রশি ছিঁড়ে পালাতে সক্ষম হয়, সেগুলো প্রাণে বেঁচে যায়। আর যারা রশি ছিঁড়তে পারেনি, সেগুলো জীবন্ত পুড়ে ছাই হয়ে যায়। জাহান্নামে পরিণত হয় বিশাল ক্যাম্পটি। সম্ভব পরিমাণ উট-ঘোড়া ধরে নিয়ে পালিয়ে যায় কমান্ডোরা।
ভোরবেলা রসদ-ক্যাস্প পরিদর্শন করে খৃস্টান কমান্ডোরা। কিছুই নেই, জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে গেছে সব। ধ্বংস হয়ে গেছে তাদের এক মাসের রসদ। তারা বুঝে ফেলে, শোবকের পথ পরিস্কার থাকা ছিল সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর একটি কৌশল। কার্ক থেকে শোবক পর্যন্ত পথটা তাদের জন্য মোটেও নিরাপদ নয়, তাও বুঝে ফেলে তারা। তাই তারা শোবক অবরোধের পরিকল্পনা মুলতবী করে দেয়। রসদ ছাড়া দুর্গ অবরোধ ছিল অসম্ভব। আর যখন তারা সংবাদ পেল যে, গত রাতে তাদের সেই বাহিনীর রসদও ধ্বংস হয়ে গেছে যারা আইউবীর বাহিনীর উপর সম্মুখ থেকে আক্রমণ করতে যাচ্ছিল, তখন তারা পুরো পরিকল্পনাই পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন অনুভব করে। কোথাও সুলতান বাহিনীর কোন সৈন্য চোখে পড়ছিল না তাদের। তাদের গুপ্তচররাও জানাতে পারেনি যে, সুলতানের সৈন্য সমাবেশ কোথায়। মূলত ছিলও না কোথাও।
.
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী সংবাদ পান, উভয় যুদ্ধক্ষেত্রেই খৃস্টানরা তাদের অগ্রযাত্রা স্থগিত করে দিয়েছে। তিনি তার কমান্ডারকে ডেকে বললেন, খৃস্টানরা যুদ্ধ মুলতবী করে দিয়েছে, কিন্তু আমাদের যুদ্ধ বন্ধ হবে না। তারা যুদ্ধ মনে করে দুবাহিনীর মুখোমুখি সংঘাতকে। আর আমাদের যুদ্ধ হল কমান্ডো আর গেরিলা আক্রমণ। এখন গেরিলা বাহিনীকে তৎপর রাখ। খৃস্টানরা উভয়দিক থেকেই পেছনে সরে যাচ্ছে। তাদেরকে তোমরা শান্তিতে কেটে পড়তে দিও না। পেছন থেকে, পার্শ্ব থেকে কমান্ডো হামলা চালাও। খৃস্টানরা আমাদেরকে মুখোমুখি নিয়ে লড়াই করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি তাদেরকে আমার পছন্দসই এমন জায়গায় মুখোমুখি নিয়ে আসব, যেখানে বালুকণাটিও আমাদের সহযোগিতা করবে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর কোন ঠিকানা নেই। আমলা-রক্ষীবাহিনীর সাথে তিনিও যাযাবর। কোন এক স্থানে স্থির থাকছেন না বলে মনে হচ্ছে। সব জায়গায়ই আছেন তিনি।
***
মিসরে খৃস্টানদের অপর যুদ্ধক্ষেত্রের উপর আক্রমণ করতে যাচ্ছেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ভাই তকিউদ্দীন। এটি মিসরের দক্ষিণ-পশ্চিমের পার্বত্য এলাকার ফেরাউনী আমলের সেইসব ভয়ংকর প্রাসাদ, যেখানে হযরত ঈসা (আঃ) আকাশ থেকে অবতরণ করবেন বলে মানুষের বিশ্বাস। নতুন এক বিশ্বাসের অনুসারী হয়ে গিয়েছিল যে এলাকার সব মানুষ।
