আমি দেখতে পাচ্ছি যে, দুশমন আমাদের মূলোৎপাটন করছে এবং আমাদের জাতির একটি অংশকে কুফরের অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় আমরা যদি কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ না করি, তবে তার অর্থ হবে, আমরাও কুফরকে সমর্থন করছি। আমার ভাই সুলতান সালাহুদ্দীন বলেছিলেন, গাদ্দারী আমাদের রীতিতে পরিণত হতে চলেছে। আর আমি দেখতে পাচ্ছি যে, আমাদের মধ্যে আরও একটি রীতি এই চালু হতে যাচ্ছে যে, জাতির একটি গোষ্ঠী শাসন করবে আর অন্যরা শাসিত হবে। শাসক গোষ্ঠীটি জনগণের সম্পদকে মদের স্রোতে ভাসিয়ে দেবে আর জনগণ এক ঢোক পানিও পান করতে পারবে না। আমার ভাই ঠিকই বলেছেন যে, আমাদের জাতি ও ধর্মের ভবিষ্যতের প্রতি দৃষ্টি রাখতে হবে। আমাদের জনগণের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ ও সচ্চরিত্রতা সৃষ্টি করতে হবে। এর জন্যে আমাদের কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে সামনে অগ্রসর হতে হবে। এই সঠিক পদক্ষেপ জাতির গুটিকতক মানুষের জন্য ক্ষতিকর হলেও পরোয়া করা যাবে না। জাতির গুটিকতক মানুষের জন্য আমরা গোটা জাতির মর্যাদাকে বিসর্জন দিতে পারি না। জাতির একটি অংশকে আমরা কেবল এই জন্য দুশমনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের হাতে সোপর্দ করতে পারি না যে, সেখানকার মানুষের চেতনায় আঘাত আসবে। আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, সেখানকার মানুষগুলো সরল-সহজ ও অশিক্ষিত। তাদের সমাজপতিরা দুশমনের ক্রীড়নকে পরিণত হয়ে তাদেরকে বিভ্রান্ত করছে।
সভাসদদের কারুর এই কল্পনাও ছিল না যে, তকিউদ্দীনের দৃষ্টিভঙ্গি এত কঠোর। তার সিদ্ধান্ত এত কঠিন হবে। তার উপস্থাপিত যুক্তি-প্রমাণের বিরুদ্ধে কেউ টু-শব্দটি করার সাহস পেলেন না। তিনি বললেন, মিসরে এখন যে বাহিনী আছে, তারা যুদ্ধফেরত সৈনিক। এর আগেও তারা লড়াই করেছে। এ বাহিনীর পাঁচশ অশ্বারোহী, দুইশ উষ্ট্রারোহী এবং পাঁচশ পদাতিক সৈন্য আজ সন্ধ্যায় সেই অঞ্চল অভিমুখে রওনা করিয়ে দিন। এই বাহিনী সন্দেহজনক প্রাসাদ থেকে এতটুকু ব্যবধানে অবস্থান করবে যে, প্রয়োজনে যেন সাথে সাথে তারা প্রাসাদ অবরোধ করে ফেলতে পারে। আমার সাথে দামেশক থেকে যে দুশ সাওয়ার এসেছে, তারা এলাকায় প্রবেশ করে প্রাসাদের উপর আক্রমণ চালাবে। একটি কমান্ডো দল প্রাসাদের অভ্যন্তরে ঢুকে যাবে। দুশ অশ্বারোহী প্রাসাদ অবরোধ করে রাখবে। যদি বাইরে থেকে আক্রমণ আসে কিংবা যদি সংঘাত হয়, তাহলে বাহিনীর বড় অংশটি তার মোকাবেলা করবে এবং অবরোধ সংকীর্ণ করতে থাকবে। এই অভিযানে বাহিনীকে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়ে রাখবে, যেন তারা কোন নিরস্ত্রের উপর আঘাত না করে।
তকিউদ্দীন এ সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরপরই সেনাকর্মকর্তাগণ বাহিনীর রওনা হওয়া, আক্রমণ ও অবরোধ প্রভৃতির পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনার প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
***
মিসরের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে অবহিত নন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। কার্ক ও শোবকের মধ্যবর্তী এলাকার মাইলের পর মাইল বিস্তৃত মরু অঞ্চলে খৃস্টানদের নয়া যুদ্ধ পরিকল্পনা মোতাবেক নিজের বাহিনীকে প্রস্তুত ও বিন্যস্ত করছেন তিনি। গুপ্তচররা তাকে রিপোর্ট দিয়েছিল যে, দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে খৃস্টানরা দুর্গের বাইরে এসে আক্রমণ চালাবে। তাদের এ বাহিনীর সৈন্যরা থাকবে অধিকাংশ বর্মপরিহিত। তারা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনীকে মুখোমুখী লড়াইয়ে বাধ্য, করার চেষ্টা করবে। একদল হামলা চালাবে পেছন দিক থেকে।
নিজের বাহিনীকে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে দেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। তিনি সর্বপ্রথম যে কাজটি করলেন, তাহল, যে কটি স্থানে পানি ও গাছ-গাছালি ছিল, তার সব কটি এলাকা তিনি দখলে নিয়ে নেন। জায়গাগুলোর নিয়ন্ত্রণ বহাল রাখার জন্য তিনি বড় বড় ধনুকধারী তীরন্দাজদের সেসব স্থানে পাঠিয়ে দেন। স্থাপন করলেন অগ্নিগোলা নিক্ষেপকারী মিনজানিক। এসব আয়োজনের উদ্দেশ্য, যাতে শত্রু কাছে আসতে না পারে। আশপাশের উঁচু জায়গাগুলোও দখল করে নেন তিনি। সব কটি বাহিনীকে তিনি নির্দেশ দেন, দুশমন যদি সম্মুখ দিক হতে হামলা করে, তাহলে যেন তারা আরো ছড়িয়ে পড়ে, যাতে দুশমনও বিক্ষিপ্ত হতে বাধ্য হয়। তিনি তার সৈন্যদের এমনভাবে বিন্যস্ত করলেন যে, দুশমন বুঝতেই পারেনি, মুসলিম বাহিনীর পার্শ্ব কোন দিক্ আর পেছন কোন্ দিক।
বাহিনীর বড় একটা অংশ রিজার্ভ রেখে দেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। একটা অংশকে তিনি এমনভাবে তৎপর রাখেন যে, প্রয়োজন হলেই যেন তারা সাহায্যের জন্য যথাস্থানে পৌঁছুতে পারে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সবচে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট হল কমান্ডো বাহিনী। তদপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা বিভাগ, যারা খৃস্টানদের যে কোন তৎপরতার সংবাদ পৌঁছিয়ে দেবে সুলতানের কাছে।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী শোবক দুর্গ জয় করে নিয়েছেন আগেই। খৃস্টানদের পরিকল্পনার একটি ছিল এই যে, পরিস্থিতি অনুকুলে এসে গেলে অবরোধ করে তারা শোবক পুনর্দখল করবে। তাদের আশা ছিল, তাদের এই বিপুল সৈন্য সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর স্বল্পসংখ্যক সৈন্যকে মরুভূমির তপ্ত বালুতেই নিঃশেষ করে ফেলতে কিংবা এতটুকু দুর্বল করে দিতে সক্ষম হবে যে, তারা বাইরে থেকে শোবককে সাহায্য দিতে পারবে না।
