বৈঠকে অধিকাংশ কর্মকর্তা অভিন্ন মত পোষণ করলেন যে, যেহেতু এত বিশাল একটি এলাকার এতগুলো মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে, সেহেতু আপাততঃ তাদের বিরুদ্ধে কোন সামরিক অভিযান পরিচালনা করা ঠিক হবে না। প্রাসাদের অভ্যন্তরের যে পরিস্থিতি জানা গেছে, তাতে প্রতীয়মান হয় যে, সেখান থেকে যে একটি নতুন বিশ্বাস আত্মপ্রকাশ করেছে, জনগণ তা বরণ করে নিয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ তাদের এই উপাসনালয় ও বিশ্বাসের উপর আমাদের এই সামরিক অভিযান সহ্য করবে না। তার পরিবর্তে বরং সেখানে কিছু মুবাল্লিগ প্রেরণ করা হোক। দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে লোকদের সঠিক পথে আনার চেষ্টা করলে ভালো ফল হবে আশা করা যায়। বৈঠকে একটি পরামর্শ এই দেয়া হয় যে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে এই পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে তাঁর মতামত নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হোক।
তার মানে আপনারা মানুষকে ভয় পাচ্ছেন! আপনাদের মনে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভয় নেই, যাদের সত্য ধর্মের অবমাননা করা হচ্ছে। আমার প্রথম কথা হচ্ছে, মিসরের বর্তমান পরিস্থিতির সংবাদ ঘুণাক্ষরে আমীরে মেসেরের কানে দেয়া যাবে না। আপনারা কি জানেন না যে, তিনি কেমন শক্তিশালী দুশমনের মোকাবেলায় মুখোমুখী দাঁড়িয়ে আছেন? আপনারা কি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে একথা বুঝাতে চাচ্ছেন যে, দুচার হাজার দেশদ্রোহী পাপিষ্ঠকে আমরা ভয় পাচ্ছি আমি সরাসরি এবং কঠিন অভিযান পরিচালনা করতে চাই। জলদগম্ভীর কণ্ঠে বললেন তকিউদ্দীন।
গোস্তাখী মাফ করবেন মুহতারাম আমীর! খৃস্টানরা আমাদের বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপ করছে যে, ইসলাম তরবারির জোরে বিস্তার লাভ করেছে। আমরা কাজে কর্মে এ অপবাদের প্রতিবাদ করতে চাই। আমরা তাদের কাছে স্নেহ-ভালোবাসার বার্তা নিয়ে যেতে চাই। বললেন এক নায়েব সালার।
তা-ই যদি হয়, তাহলে কোমরে তরবারী ঝুলিয়ে রেখেছ কেন? এতো টাকা ব্যয় করে সেনাবাহিনী পুষছই বা কেন? তার চে বরং এটা উত্তম নয় কি যে, তোমরা সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে দিয়ে অস্ত্রগুলো সব নীল নদে ফেলে দিয়ে দাওয়াত তাবলীগের মিশন নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে গাশত কর, দরবেশের ন্যায় গ্রামে-গ্রামে, পাড়ায়-পাড়ায় ঘুরে বেড়াও। তিরস্কারের সুরে বললেন তকিউদ্দীন। বলতে বলতে আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেন তিনি। তিনি বললেন
রাসূলে খোদার পয়গামের বিরুদ্ধে যদি ক্রুশের তরবারী উত্তোলিত হয়, তাহলে ইসলামের তরবারীও কোষবদ্ধ থাকবে না। আর ইসলামের তরবারী যখন কোষমুক্ত হবে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সাঃ) দুশমনদের মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করবে। ইসলামের সত্য-সঠিক বাণীকে যারা অস্বীকার করবে, তাদের জিহ্বা কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। খৃস্টানরা যদি এই অপবাদ আরোপ করে থাকে যে, ইসলাম তরবারীর জোরে বিস্তার লাভ করেছে, তাহলে আমি তাদের নিকট এর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে প্রস্তুত নই। আপনারা কি জানেন, সালতানাতে ইসলামিয়া কেন দিন দিন অধঃপাতে যাচ্ছে? বলতে পারেন, স্বয়ং মুসলমান কেন ইসলামের দুশমনে পরিণত হচ্ছে? তার একমাত্র কারণ, খৃস্টানরা মদ, নারী, অর্থ আর ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে ইসলামের তরবারীতে জং ধরিয়ে রেখেছে। তারা আমাদের উপর যুদ্ধপ্রিয়তা ও জুলুমের অভিযোগ আরোপ করে আমাদের সামরিক শক্তিকে নিঃশেষ করে দিতে চায়। আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মুরোদ তাদের নেই। তাদের স্থলবাহিনী নৌবহর সব ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে তারা নাশকতামূলক অভিযান পরিচালনা করছে। আল্লাহর সত্য দ্বীনে কুঠারাঘাত করছে। আর আপনারা কিনা ওদের উপর অস্ত্রধারণ করতে বারণ করছেন।
মনোযোগ দিয়ে শুনুন বন্ধুগণ! খৃস্টান ও আমাদের অন্যান্য দুশমনরা ভালোবাসার প্রলোভন দেখিয়ে আমাদের হাত থেকে তরবারী ছিনিয়ে নিতে চায়। তারা চায় আমাদের পিঠে আঘাত হানতে।কেউ তোমার এক গালে চড় মারলে অপর গালটাও এগিয়ে দাও তাদের এই নীতি প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। কার্কের মুসলমানদের সাথে তারা কি নির্মম আচরণ করেছে, তাতে আপনাদের অজানা নয়। শোবক দুর্গ জয় করার পর আপনারা কি সেখানকার বেগার ক্যাম্পের করুণ দৃশ্য দেখেননি? সেখানকার মুসলিম নারীদের সম্ভ্রম নিয়ে তারা যে ছিনিমিনি খেলা খেলেছিল, তা কি আপনারা শুনেননি? অধিকৃত ফিলিস্তীনের মুসলমানরা চরম ভয়-উৎকণ্ঠা, অপমান ও নির্যাতনের মধ্যে জীবন-যাপন করছে। খৃস্টানরা লুণ্ঠন করছে মুসলমানদের কাফেলা, অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে মুসলিম নারীদের। আর আপনারা কিনা বলছেন, ইসলামের নামে অস্ত্রধারণ করা অন্যায়। এমন পরিস্থিতিতে ইসলামের নামে অস্ত্রধারণ করা যদি অন্যায়ই হয়ে থাকে, তাহলে আমি দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করছি, এই অপরাধে আমি বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত নই। খৃস্টানদের তরবারী নিরস্ত্র মুসলমানদের উপর আঘাত হানছে। তাদের একমাত্র অপরাধ তারা মুসলমান। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সাঃ) কথা বলে। তারা ক্রুশ ও প্রতিমার পূজারী নয়। আপনাদের তরবারী হাত থেকে খসে পড়বে তখন, যখন আপনাদের সম্মুখের লোকটি হবে নিরস্ত্র এবং তার কাছে ইসলামের পয়গাম পৌঁছেনি। এই যে কে যেন বললেন মানুষের চেতনার উপর আঘাত করা ঠিক নয়। আমি এই মতের সমর্থন করি না। আমি দেখেছি যে, আরব রাজ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুসলিম শাসক ও অযোগ্য নেতৃবর্গ সাধারণ লোকদের সন্তুষ্ট করার জন্য তোষামোদমূলক কথা বলে থাকে। জনগণকে তাদের খেয়াল-খুশি মত চলার সুযোগ দিয়ে নিজেরা ভোগ বিলাসে ডুবে থাকে। তারা নিজেদের চারপাশে এমন কিছু চাটুকার জুড়িয়ে নিয়েছে, যারা তাদের সব কথায় জ্বী হুজুর এর নীতি পালন করে এবং প্রজাদের মধ্যে ঘুরে ফিরে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে, আমাদের শাসকবর্গ যা কিছু বলছেন ও করছেন, সবই ঠিক। এর ফল কি হল? আল্লাহর বান্দাগণ দুশ্চরিত্র বিলাসী লোকদের গোলামে পরিণত হতে চলেছে। জাতি শাসক ও শাসিতে বিভক্ত হতে চলেছে।
