ওখানে গিয়েছিল মাত্র দুজন। পথের কথা জিজ্ঞেস করার নাম করে একজন আলাপে ভুলিয়ে দেয় প্রহরীকে। এই সুযোগে পেছন থেকে প্রহরীর ঘাড় ঝাঁপটে ধরে ফেলে অপরজন। এবার দুজনে মিলে তুলে নিয়ে যায় তাকে ভেতরে। তাদের দেখে উঠে বসে জখমী। বিছানা থেকে সরে দাঁড়ায় সে। প্রহরীকে বিছানায় শুইয়ে দেয় সন্ত্রাসীরা। খঞ্জর দ্বারা গভীর দুটি আঘাত হানে তার হৃদপিন্ডে। মারা যায় প্রহরী। মাথা থেকে পা পর্যন্ত কম্বল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় প্রহরীর রক্তাক্ত লাশটা। জখমী কয়েদীকে নিয়ে বেরিয়ে যায় দুজন।
শারজা ডাক্তারের ঘরে আছে, তাও জানা ছিল অপহরণকারীদের। তাদের আশংকা ছিল, শারজা বিষয়টা মেনে নেবে না এবং তাদের এই অপহরণ অভিযানকেও ব্যর্থ করে দেবে। অথচ তাকেও এখান থেকে সরিয়ে ফেলা একান্ত প্রয়োজন। কারণ, অনেক তথ্য তারও জানা। তাই একস্থানে ওঁৎ পেতে বসে যায় দুজন। গভীর রাতে ঘর থেকে বের হয়ে ডাক্তার ও শারজা যেই মাত্র অন্ধকার সরু গলিতে প্রবেশ করে, অম্নি পেছন থেকে দুব্যক্তির বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায় তারা। সফল হয়ে যায় অপহরণ অভিযান।
***
ডাক্তার ও শারজার কথায় পুরোপুরি বিশ্বাস করলেন না আলী বিন সুফিয়ান। তিনি ভাবলেন, এটিও ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে। তাই তিনি দুজনকে পৃথক করে ফেললেন। আলাদা আলাদা জিজ্ঞাসাবাদ করেন তাদের। ডাক্তার অতিশয় জ্ঞানী লোক। তিনি আলী বিন সুফিয়ানকে আশ্বস্ত করতে সক্ষম হন যে, তার বক্তব্য অক্ষরে অক্ষরে সত্য। তিনি বললেন, আকার-আকৃতিতে মেয়েটিকে আমার এক মৃত বোনের মত দেখা যায়। তাই আবেগাপ্লুত হয়ে আমি তাকে আমার ঘরে নিয়ে যাই। কয়েকবারই সে আমার ঘরে যায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে আমি তার সাথে কথাবার্তা বলি। জখমীর ঘরেও আমি তার সাথে বসে থাকতাম। মেয়েটির প্রতি আমি কখনো কুদৃষ্টিতে তাকাইনি।
ডাক্তার জানায়, আমার এই অমলিন সদাচারে মেয়েটি এতই প্রভাবিত হয়ে পড়ে যে, ইসলাম ও মুসলমান সম্পর্কে সে তার মনের কতিপয় সন্দেহ আমার সামনে উপস্থাপন করে। আমি এক এক করে তার সব সন্দেহ দূর করার চেষ্টা করি। এতে সে আরো প্রভাবিত হয়ে যায়। আমার প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ বেড়ে যায়। মেয়েটি মুসলমান। কিন্তু আমি বুঝলাম, সে দারুণ বিভ্রান্ত। আমি তার সব ভ্রান্তি দূর করে দেই। চিন্তা-চেতনায় ছিল মেয়েটি পশ্চাৎপদ। কুসংস্কারাচ্ছন্ন পল্লী অঞ্চলের মানুষ। তার কথা-বার্তায় আমি বুঝতে পেরেছি যে, তার এলাকায় ইসলাম পরিপন্থী ধ্যান-ধারণা এবং সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী-বিরোধী প্রচারণা জোরে-শোরে বিস্তার লাভ করছে।
শারজার নিকট থেকে কোন জবানবন্দী নেননি আলী বিন সুফিয়ান। তিনি মেয়েটিকে প্রশ্ন করতে থাকেন আর মেয়েটি তার উত্তর প্রদান করে। তার জবাবী বক্তব্যই তার জবানবন্দীর রূপ লাভ করে। ফেরাউনী আমলের পরিত্যক্ত প্রাসাদসমূহ সম্পর্কে সেও সেই বিবরণ প্রদান করে, যা আমরা উপরে বিবৃত করে এসেছি। সেও প্রাসাদের রহস্যময় অদৃশ্য দরবেশের ভক্ত।
শারজা জানায়, তার ভাই সেনাবাহিনীতে চাকরি করত। নিজে ঘরে একা থাকত। গাঁয়ের কতিপয় লোক এই বলে তাকে প্রাসাদে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেয় যে, ওখানকার দরবেশ সুন্দরী কুমারীদের বেশ পছন্দ করেন।
আলী বিন সুফিয়ান কৌশলে তার থেকে এ তথ্যও বের করে আনেন যে, তার গ্রামের তিনটি কুমারী মেয়ে ঐ প্রাসাদে গিয়েছিল। কিন্তু পরে আর ফিরে আসেনি। একবার তার ভাই বাড়ী আসে। শারজা তার নিকট প্রাসাদে যাওয়ার অনুমতি চায়। কিন্তু ভাই তাকে বারণ করে দিয়েছিল। শারজা অবস্থাটা স্পষ্টরূপে ভাষায় ফুটিয়ে তুলতে না পারলেও আলী বিন সুফিয়ান এতটুকু বুঝে ফেললেন, মিসরের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে কি সব হচ্ছে।
ডাক্তার সম্পর্কে শারজা বলে, অপহরণকারীরা যদি তাকে গ্রামে নিয়েও যেত, এমনকি যদি বন্দীশালায় আবদ্ধ করে ফেলত, তবু আমি তাকে মুক্ত করেই ছাড়তাম। কিন্তু যখন আমার ভাই মরে গেল, আমি গ্রামে যাওয়ার ইচ্ছা ত্যাগ করলাম এবং সংকল্প নিলাম, যে কোন মূল্যে হোক ডাক্তারকে আমি এখান থেকেই মুক্ত করব। চার অপহরণকারীকে সে তার আপন মনে করত। কিন্তু ডাক্তার তাকে জানাল যে, এরা আল্লাহর মস্তবড় দুশমন। শারজা আরো জানতে পেরেছে যে, এরা তার ভাইয়ের সাথে ভালো আচরণ করেনি। তার কাছে যেসব তথ্য ছিল, তা যেন ফাঁস হয়ে না যায়, সে জন্যেই এদের এতো ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান। উদ্দেশ্য সফল হওয়ার পর ইচ্ছে করেই এরা তার ভাইকে মেরে ফেলেছে।
আলী বিন সুফিয়ান শারজাকে জিজ্ঞেস করলেন, এখন তুমি কি করতে চাও? নিজের ব্যপারে তুমি কি চিন্তা করছ? শারজা জবাব দেয়, আমি আমার সারাটা জীবন ডাক্তারের চরণে কাটিয়ে দিতে চাই। তিনি যদি আমাকে আগুনে ঝাঁপ দিতে বলেন, আমি তাও করতে প্রস্তুত আছি। শারজা সম্মতি প্রকাশ করে যে, আপনি যদি ফেরাউনী প্রাসাদে অভিযান প্রেরণ করেন, তাহলে আমি তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব এবং আমার গ্রামের যারা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বিপক্ষে, তাদের ধরিয়ে দেব।
আলী বিন সুফিয়ানের পরামর্শে সামরিক ও প্রশাসনিক শীর্ষ কর্মকর্তাদের জরুরী বৈঠক তলব করা হয় এবং তকিউদ্দীনকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়। সকলের ধারণা ছিল, তকিউদ্দীন মিসরে নতুন এসেছেন। এত বড় গুরুদায়িত্ব তার ঘাড়ে চাপে এই প্রথম। তাই তিনি আপাততঃ ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে যাবেন না।
