আমার মনে হয়, ডাক্তার আর মেয়েটি এই অভিযানকে সহজ করে দিয়েছিল। এই অপরাধেও আমাদের জাতির সেই দুর্বলতা কাজ করেছে, যার জন্য সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী অস্থির, পেরেশান। যার কারণে তিনি বলে থাকেন যে, নারী আর ক্ষমতার মোহ মিল্লাতে ইসলামিয়াকে ডুবিয়ে ছাড়বে। ডাক্তারকে আমি সচ্চরিত্রবান যুবক মনে করতাম। একটি তরুণী তাকেও অন্ধ করে দিল। যা হোক, জখমী কয়েদীর গ্রামের ঠিকানা আমি পেয়ে গেছি। একটি বাহিনী রওনাও করিয়ে দিয়েছি। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
আর জখমী কয়েদী দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকার যে প্রাসাদটির কথা বলেছিল, তার ব্যাপারে আপনি কি সিদ্ধান্ত নিতে চান? জিজ্ঞেস করলেন তকিউদ্দীন।
আমার মনে হচ্ছে, লোকটি মিথ্যে বলেছে। নিজের জীবন রক্ষা করার জন্য একটি ভূয়া গল্প বানিয়েছিল বোধ হয়। তথাপি আমি খোঁজ-খবর নিয়ে দেখব। জবাব দেন আলী বিন সুফিয়ান।
কক্ষে বসে এ বিষয়ে কথা বলছেন দুজন। হঠাৎ দারোয়ান ভেতরে প্রবেশ করে এমন একটি সংবাদ বলে, যা তাদের হতভম্ব করে দেয়। একজনের মুখের প্রতি তাকিয়ে থাকেন অন্যজন। বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন যেন তারা। সম্বিত ফিরে পেয়ে আলী বিন সুফিয়ান উঠে দাঁড়ান এবং অন্য কেউ হবে বোধ হয় বলে বাইরে বেরিয়ে যান। তার পেছনে বেরিয়ে পড়েন তকিউদ্দীন। কিন্তু লোকটা অন্য কেউ নয় তাদেরই ডাক্তার দাঁড়িয়ে আছেন তাদের সামনে। সঙ্গে তার জখমী কয়েদীর বোন শারজা। ঘোড়াগুলো হাঁপাচ্ছে তাদের। ডাক্তার ও শারজার সমস্ত শরীর ধূলিমাখা। ওষ্ঠদ্বয় কাঠের মত শুষ্ক।
আলী বিন সুফিয়ান খানিকটা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, কয়েদীকে কোথায় রেখে এসেছ? ডাক্তার হাতের ইশারায় বললেন, আমাদের একটুখানি বিশ্রাম নিতে দিন। আলী বিন সুফিয়ান দুজনকে ভেতরে নিয়ে যান। তাদের জন্য খাবার ও পানির ব্যবস্থা করার আদেশ দেন।
ডাক্তার তার ও শারজার অপহরণের কাহিনীর সবিস্তার বিবরণ দেন। এও জানান যে, জখমী কয়েদী মারা গেছে। তিনি বলেন, আমি জানতাম না যে, জখমী কয়েদীও অপহরণ হয়েছে। পরদিন যখন একটি লোক ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে জখম খুলে গেল এবং বিপুল রক্তক্ষরণের দরুন লোকটা মারা গেল, তখনই আমি বিষয়টি জানতে পাই। তারপর ডাক্তার তার মুক্ত হয়ে ফিরে আসার কাহিনী শোনান।
কথা বলে শারজা। আলী বিন সুফিয়ান এবার বুঝতে পারেন মেয়েটি মরু অঞ্চলের মানুষ এবং অতি সাহসী ও গোঁয়ার প্রকৃতির। সে জানায়, আমি আমার ভাইয়ের আশ্রয়ে এবং তারই মুখ পানে তাকিয়ে বেঁচে ছিলাম। ভাইয়ের জন্য আমি জীবন দিতেও প্রস্তুত থাকতাম সবসময়। আপনারদের ডাক্তার যেরূপ নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে আমার ভাইয়ের চিকিৎসা করেছিলেন, তাতে আমি তার অনুরক্ত হয়ে যাই। আমার কাছে ডাক্তার ফেরেশতার মত মনে হতে লাগল।
শারজা জানায়- আমার সাথে যে চারজন লোক এসেছিল, তারা আমাদের আত্মীয় ছিল না। তারা ছিল সেই চক্রের সদস্য, যারা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ও তাঁর পদস্ত কর্মকর্তাদের হত্যাচেষ্টায় তৎপর। আপনার লোকেরা যখন আমাকে আনার জন্য আমাদের গ্রামে যায়, তখন তারা চারজন গ্রামে অবস্থান করছিল। তারা জানতে পেরেছিল যে, আমার ভাই জখমী অবস্থায় আপনাদের হাতে বন্দী হয়ে আছে। তাই তাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে আমার সাথে চলে আসে। তাদের আশংকা ছিল, জখমীর কাছে যে তথ্য আছে, তা ফাঁস হয়ে যাবে। জখমী কোথায় কোন্ অভিযানে আহত হয়েছে, তা তাদের জানা ছিল।
শারজার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তার পরিকল্পনাও এটাই ছিল যে, সে ভাইকে অপহরণ করাবে। ভাইয়ের নিকট থাকার যে আবেদন সে করেছিল, তার উদ্দেশ্য ছিল দুটি। প্রথমতঃ ভাইয়ের সেবা-শুশ্রূষা করা, দ্বিতীয়তঃ সুযোগ পেলে ভাইকে অপহরণ করান।
জখমীর সাথে সাক্ষাৎ করে তারা। কায়রোতেই অবস্থান নিয়েছিল এক জায়গায়। শারজার ইঙ্গিতের অপেক্ষায় ছিল তারা। কিন্তু ডাক্তার মেয়েটিকে এমনভাবে প্রভাবিত করে ফেলেন যে, চিন্তাই পাল্টে যায় তার। ডাক্তার শারজাকে নিশ্চয়তা প্রদান করেন যে, তার ভাইয়ের সাজা হবে না। তাছাড়া তিনি মেয়েটিকে এমন এমন কথা শোনান, যা এর আগে কখনো সে শোনেনি। তিনি মেয়েটির হৃদয়ে ইসলামের মর্যাদা জাগ্রত করে দেন এবং উন্নত চরিত্রের প্রমাণ দিয়ে তাকে ভক্ত বানিয়ে ফেলেন। মেয়েটি সারাক্ষণ ডাক্তারের কাছে বসে বসে তার মধুর-মূল্যবান কথা শুনতে ব্যাকুল হয়ে উঠে।
একদিন ডাক্তারের ঘরে যাওয়ার পথে চারজনের একজনের সাথে দেখা হয়ে যায় শারজার। লোকটি শারজাকে বলে, তোমার ভাইয়ের অপহরণে আর বিলম্ব করা ঠিক নয়। জবাবে শারজা সাফ জানিয়ে দেয়, আমি আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফেলেছি। ভাই আমার এখানেই থাকবে। লোকটি বলল, তোমার ভাইয়ের যদি মতিভ্রম হয়েই থাকে, তাহলে ওকে আমরা বেঁচে থাকতে দেব না।
চার কুচক্রী জখমীকে এমন সাহসিকতার সাথে অপহরণ করে নিয়ে যাবে, তা ছিল শারজার কল্পনার অতীত। তাই সে ডাক্তারকেও অবহিত করা প্রয়োজন মনে করেনি যে, তার ভাই অপহৃত হওয়ার আশংকা আছে। সে রাতেই শারজা ও ডাক্তার পড়ে যায় চার কুচক্রীর কবলে। অপহরণ করে যখন তাদেরকে ঘোড়ার পিঠে তুলতে নিয়ে যাওয়া হল, তখন শারজা দেখতে পেয়েছিল যে, তার ভাই বসে আছে। ভাই মুক্ত হয়েছে দেখে তখন কিছুটা আনন্দিতও হয়েছিল সে। পলায়নে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল নিজেও। কিন্তু ডাক্তারকে ওদের বন্দী হিসেবে দেখে মেনে নিতে পারেনি শারজা। তাই সে ডাক্তারকে ছেড়ে দিতে অনুরোধও করেছিল। কিন্তু সে অনুরোধ রক্ষা করেনি সন্ত্রাসীরা। হাত-পা বেঁধে ঘোড়ার পিঠে তুলে নেয় তারা ডাক্তারকে। পথে জখমীকে কিভাবে অপহরণ করল সে কাহিনী শোনায় তারা শারজাকে।
