আমি এমন লোকদের চিকিৎসা করব না, যারা আমার সরকারের বিরোধী। তোমরা খৃস্টান, সুদানী ও ফাতেমীদের আপন এবং তাদেরই ইঙ্গিতে তোমরা সালতানাতে ইসলামিয়ার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছ। আমি তোমাদের কোন কাজে আসব না। ডাক্তার বললেন।
তাহলে আমরা তোমাকে হত্যা করে ফেলব। বলল আরোহী।
তা-ই বরং ভালো। জবাব দেন ডাক্তার।
তাহলে আমরা তোমার সঙ্গে এমন আচরণ করব, যা তোমার জন্য প্রীতিকর হবে না। তবে আমি আশা করছি, তোমার সাথে আমাদের খারাপ আচরণের প্রয়োজন পড়বে না। তুমি সালাহুদ্দীন আইউবীর শাসন দেখেছ। আমাদের রাজত্বও দেখবে। তখন তুমি বলবে, আমি এখানেই থাকতে চাই। এ তো জান্নাত। কিন্তু যদি তুমি আমাদের জান্নাতকে প্রত্যাখ্যান কর, তাহলে আমাদের জাহান্নাম কি জিনিস, তা তুমি দেখতে পাবে। বলল আরোহী।
চলতে থাকে ঘোড়া। ডাক্তারের চোখে পট্টি বাঁধা। পট্টির অন্ধকার ভেদ করে নিজের ভবিষ্যত দেখার চেষ্টা করছেন তিনি। মনে মনে পালাবার পন্থাও খুঁজতে থাকেন। বারবার শারজার কথা মনে পড়ে তার। কিন্তু এই ভেবে তিনি নিরাশ হয়ে পড়ছেন যে, এ মেয়েটিও এদেরই লোক। তার সহযোগিতা পাওয়ার আশা করা বৃথা।
***
সফরটা তাদের এতো দীর্ঘ ছিল না। কিন্তু সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সীমান্ত প্রহরীদের হাতে ধরা খাওয়ার ভয়ে চুপিচুপি দূরবর্তী আঁকা-বাঁকা পথ ধরে অতিক্রম করতে হয়েছে এ সন্ত্রাসী চক্রটির। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হওয়ার পরও পথচলা অব্যাহত থাকে কাফেলার।
মধ্যরাতের খানিক আগে কাফেলা থেমে যায়। ঘোড়া থেকে নামিয়ে হাত-পা খুলে দেয়া হয় ডাক্তারের। চোখের পট্টিও সরিয়ে ফেলা হয় তার। তবু অন্ধকারের কারণে কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না তিনি। তাকে কিছু খাবার খেতে দেয়া হয় এবং পানি পান করানো হয়।
আহার শেষে আবার তার হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়। শুয়ে পড়তে বলা হয় তাকে। ডাক্তার শুয়ে পড়েন। মুহূর্তের মধ্যে রাজ্যের ঘুম নেমে আসে ডাক্তারের ক্লান্ত-অবসন্ন চোখে।
শুয়ে পড়ে কাফেলার অন্যান্য লোকেরাও। জিন খুলে ঘোড়াগুলো বেধে রাখে সামান্য দূরে। ডাক্তারের পালাবার কোন আশংকা নেই। হাত-পা তার শক্ত করে বাঁধা।
কিছুক্ষণ পর কারো ডাকে ডাক্তারের চোখ খুলে যায়। ভাবলেন, আবার রওনা হওয়ার জন্য ডাকা হচ্ছে। পরক্ষণে মনে হল, কেউ তার পায়ের বাঁধন খুলছে। চুপচাপ পড়ে থাকেন তিনি। মৃত্যুর জন্য তিনি পূর্ব থেকেই প্রস্তুত। তার আশংকা ছিল, খুন করে হয়ত তাকে কোথাও ফেলে দেয়া হবে। কিন্তু পায়ের বাধন খুলে যাওয়ার পর যখন হাতের বাঁধনও খুলে যেতে শুরু করল, তখন তিনি কার যেন ফিসফিস কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন। কে যেন তার কানে কানে বলছে, আমি দুটি ঘোড়ায় জিন বেঁধে রেখে এসেছি। চুপচাপ আমার পেছনে পেছনে আস। আমিও তোমার সাথে যাব। ওরা ঘুমুচ্ছে। এ কণ্ঠস্বর শারজার।
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় ডাক্তার। শারজার পেছনে পেছনে হাঁটতে শুরু করেন তিনি। জায়গাটা বালুকাময় হওয়ার কারণে পায়ের শব্দ হচ্ছে না। সম্মুখে দুটি ঘোড়া দণ্ডায়মান। ডাক্তারকে ইশারা দিয়ে একটিতে চড়ে বসে শারজা। অপরটিতে উঠে বসেন ডাক্তার। শারজা বলে, তুমি যদি দক্ষ ঘোড়সাওয়ার না-ও হয়ে থাক, তবু ভয় নেই, পড়বে না! ঘোড়া ছুটাও, লাগাম ঢিলে করে দাও। ঘোড়াটিকে ডানে-বাঁয়ে ঘুরাতে তো পারবে!
প্রত্যুত্তরে কিছু না বলেই ডাক্তার ঘোড়া ছুটায়। সমান তালে ছুটে চলে শারজার ঘোড়াও। ধাবমান ঘোড়ার পিঠে থেকেই শারজা বলে, তুমি আমার পেছনে পেছনে থাক। আমি পথ চিনি। অন্ধকারে আমার থেকে আলাদা হবে না কিন্তু।
দ্রুত ধাবমান ঘোড়া দুটোই সজাগ করে তোলে অপহরণকারীদের। কিন্তু ধাওয়া করা অত সহজ নয়। তাদের প্রথমে দেখতে হবে, যে ঘোড়ার ক্ষুরধ্বনি শোনা গেল, সেগুলো কার। তাদের মনে শারজার পালাবার কোন আশংকাই ছিল না। ঘোড়া ছুটিয়ে কে গেল তার সন্ধান নিতে নিতে কেটে গেল কিছুক্ষণ। জানা গেল, শারজা এবং ডাক্তার পালিয়ে গেছে। এরপর তাদের ঘোড়ায় জিন বাঁধতে হবে। এসবে যে সময় ব্যয় হল, ততক্ষণে পলায়নকারীরা অতিক্রম করে গেছে দু-আড়াই মাইল পথ।
বারবার পেছন দিকে তাকাচ্ছে ডাক্তার ও শারজা। কেউ তাদের ধাওয়া করছে কিনা, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে তারা। না, তারা নিশ্চিত, কেউ তাদের পিছু নেইনি। তবু ঘোড়ার গতি হ্রাস করে না তারা। ছুটে চলে তীরবেগে। এতক্ষণে তারা বহু পথ অতিক্রম করে আসে। ডাক্তার শারজাকে বলেন, আশপাশে কোথাও না কোথাও সীমান্ত চৌকি থাকার কথা। কিন্তু তা কোথায় নির্দিষ্টভাবে আমার জানা নেই। বলতে পারে না শারজাও। শারজা ডাক্তারকে নিশ্চয়তা দিয়ে বলে, আমরা সঠিক পথেই কায়রো অভিমুখে এগিয়ে চলছি। পথও আর বেশী নেই।
***
পরদিন দ্বি-প্রহর। মিসরের ভারপ্রাপ্ত গবর্নর তকিউদ্দীনের সামনে বসে আছেন আলী বিন সুফিয়ান। তকিউদ্দীন বলছিলেন, আমি এ জন্য বিস্মিত নই যে, আপনার ন্যায় একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি এই ভুল করেছেন যে, একটি সন্দেহভাজন মেয়েকে জখমী বন্দীর নিকট থাকার অনুমতি দিয়েছেন এবং চারজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকেও জখমীর সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ প্রদান করেছেন। আমার বিস্ময় এ কারণে যে, এই চক্রটি অত্যন্ত দুঃসাহসী ও সুসংগঠিত। জখমীকে তুলে নিয়ে যাওয়া, প্রহরীকে হত্যা করে জখমীর বিছানায় ফেলে যাওয়া অতিশয় দুঃসাহসী অভিযানই বটে। সীমাহীন দুর্ধর্ষ ও সুসংগঠিত চক্র ছাড়া এমন সাহস কেউ দেখাতে পারে না।
