আলী বিন সুফিয়ানের আপাতত করণীয়, মিসরে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর স্থলাভিষিক্ত তকিউদ্দীনকে সংবাদ দেয়া যে, জখমী হাশীশীকে তার সতীর্থরা অপহরণ করে নিয়ে গেছে। এখন আলী বিন সুফিয়ানের ধারণা, জখমী তাকে যে তথ্য দিয়েছিল, তা সঠিক নয়। নিজের জীবন রক্ষা এবং পালাবার একটি সুযোগ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যেই সে এ কৌশল অবলম্বন করেছিল। লোকটি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী এবং আলী বিন সুফিয়ান দুজনকেই বোকা ঠাওরিয়ে ছড়িল। আলী বিন সুফিয়ান তকিউদ্দীনকে সংবাদ জানানোর জন্য চলে গেলেন।
***
বেলা দ্বি-প্রহর। যে জখমী কয়েদীর দাঁড়াবার শক্তি পর্যন্ত ছিল না, এখন সে পৌঁছে গেছে মিসর থেকে বহু দূরে জনশূন্য বিরান এক এলাকায়। ডাক্তারও আছেন তার সঙ্গে। ডাক্তারের হাত-পা বাঁধা। নির্জীবের মত পড়ে আছেন একটি ঘোড়ার পিঠে। পা দুটি তার ঘোড়ার একদিকে, মাথা ও বাহুদ্বয় অপরদিকে। সারাটা রাত ঘোড়ার পিঠে এভাবেই কেটেছে তার। ভোরের আলো ফোঁটার আগেই ঘোড়া থেমে যায়। পট্টি বেঁধে দেয়া হয় ডাক্তারের দুচোখে। পট্টিটা কে বাঁধল দেখতে পেলেন না তিনি। চোখে পট্টি বাঁধার পর পায়ের বন্ধন খুলে দিয়ে তাকে ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে দেয়া হল। হাত দুটি এখনো বাঁধা। তার পেছনে চড়ে বসে একজন। ঘোড়া চলতে শুরু করে। ডাক্তার অনুভব করছেন যে, তার পেছনে পেছনে আরো কয়েকটি ঘোড়া চলছে এবং আরোহীরা ফিসফিস্ করে কথা বলছে।
ঘোড়া এগিয়ে চলছে আর সূর্য নীচ থেকে উপরে উঠছে। এক পর্যায়ে ডাক্তার আন্দাজ করলেন, তার ঘোড় চড়াই অতিক্রম করছে। একটু পর পর মোড় নিচ্ছে ডানে-বাঁয়ে। আবার নীচে নামছে। এতে তিনি অনুমান করলেন যে, এটি কোন পার্বত্য এলাকা।
এভাবে দীর্ঘক্ষণ পথ অতিক্রম করেন ডাক্তার। সূর্য তখন মাথার উপর উঠে এসেছে। হঠাৎ পেছন দিক থেকে উচ্চকিত এক কণ্ঠস্বর ভেসে আসে তার কানে। তাতে তিনি বুঝতে পারেন যে, কোন আরোহী ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে পড়ে গেছে। তার ঘোড়াটি থেমে গিয়ে মোড় ঘুরিয়ে দাঁড়িয়েছে পেছন দিকে। তারপর আবার কণ্ঠস্বর- তুলে নাও, ছায়ায় নিয়ে চল, লোকটা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। উহ! রক্ত ঝরছে তো! ডাক্তারের চোখ ও হাত-পায়ের বাধন খুলে দাও। তিনি রক্তক্ষরণ বন্ধ করে দেবেন। অন্যথায় ভাইটি আমার মরে যাবে।
ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যাওয়া লোকটি জখমী হাশীশী। সারাটা রাতের ঘোড়সাওয়ারীর ফলে পেটের জখম খুলে গেছে তার। উরুর ক্ষত থেকেও পুনরায় রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। রাতভর রক্ত ঝরেছে। অবশেষে এখানে এসে এত বেশী রক্ত ঝরল যে, লোকটা চৈতন্য হারিয়ে ফেলল এবং ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেল। তাকে তুলে একটি টিলার ছায়ায় নিয়ে যাওয়া হল, মুখে পানি দেয়া হল। কিন্তু পানি কণ্ঠনালী অতিক্রম করছে না তার। রক্তে ভিজে গেছে তার গায়ের কাপড়-চোপড়।
ঘোড়ার পিঠ থেকে নামানো হয় ডাক্তারকে। চোখ দুটি খুলে যায় তার। এদিক ওদিক না তাকিয়ে সোজা সামনের দিকে হাঁটতে নির্দেশ দেয়া হয় তাকে। পেছনে পিঠ ঘেঁষে খঞ্জর ধরে আছে কেউ, টের পান ডাক্তার। নির্দেশনা অনুযায়ী সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করেন তিনি।
একটি টিলার পাদদেশে পড়ে আছে জখমী। পাশে উপবিষ্ট শারজা। ডাক্তারকে দেখেই শারজা বলে উঠে, আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি আমার ভাইকে রক্ষা করুন।
জখমীর শিরায় হাত রাখেন ডাক্তার। এদিক-ওদিক তাকাবার অনুমতি নেই তার। হাত রেখে বসে পড়েন তিনি। পিঠে খঞ্জরের খোঁচা অনুভব করেন। জখমীর শিরা দেখে তিনি সটান উঠে দাঁড়ান। ঘাড় ঘুরিয়ে দৃষ্টি ফেলেন পেছন দিকে। সম্মুখে কালো মুখোশপরা চারজন লোক দাঁড়িয়ে। শুধু চোখগুলো দেখা যায় তাদের। একজনের হাতে খঞ্জর। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে ডাক্তার বললেন, তোমাদের উপর আল্লাহর গজব পড়ুক। বাঁচাবার পরিবর্তে লোকটাকে তোমরা খুন করে ফেলেছ! আমরা একে চারপাই থেকে নড়তে দেয়নি। আর তোমরা কিনা একে এতদূর থেকে নিয়ে এসেছ ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে। ওর জখম খুলে গেছে এবং দেহের সব রক্ত ঝরে গেছে। লোকটা বেঁচে নেই।
ভাইয়ের লাশের উপর লুটিয়ে পড়ে শারজা। হাউমাউ করে বিলাপ জুড়ে দেয় মেয়েটি। ডাক্তারের চোখের উপর আবার পট্টি বেঁধে দেয় মুখোশধারীরা। নিয়ে যায় সেখান থেকে খানিক দূরে। ঘোড়ার পিঠে তুলে নেয়া হয় লাশটি। চলতে শুরু করে কাফেলা।
শারজার বুক-চেরা কান্নার করুণ শব্দ শুনতে পান ডাক্তার। মুহূর্তের জন্যও থামছে না মেয়েটি। ডাক্তার তার ঘোড়ার আরোহীকে বললেন, লোকটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যেত। কিন্তু তোমরা তাকে মেরে ফেললে। তাকে কোন সাজাও ভোগ করতে হতো না।
আরোহী বলল, আমরা তাকে তার প্রাণরক্ষা করার জন্য নিয়ে আসিনি। আমরা মূলত সেইসব গোপন তথ্য অপহরণ করেছি, যা তার সঙ্গে ছিল। তার মৃত্যুতে আমাদের কোন দুঃখ নেই। তার বুকে আমাদের যেসব তথ্য লুকায়িত ছিল, তোমার সরকার যে তা বের করতে পারেনি, তা-ই আমাদের পরম পাওয়া।
তা আমাকে তোমরা কোন্ অপরাধে শাস্তি দিচ্ছ? জিজ্ঞেস করেন ডাক্তার।
আমরা তোমাকে দেবতার হালে রাখব। একটু গরম বাতাসও তোমার গায়ে লাগতে দেব না। তোমাকে আমরা নিয়ে এসেছি তিনটি কারণে। এক, পথে জখমীর কোন সমস্যা দেখা দিলে তুমি চিকিৎসা করবে। কিন্তু আমরা ভেবেই দেখেনি যে, তোমার কাছে না আছে ওষুধ, না আছে ব্যান্ডেজ করার সরঞ্জাম। দুই. শারজাকেও আমাদের আনবার প্রয়োজন ছিল। ঘটনাক্রমে তুমি ছিলে তার সাথে। এমতাবস্থায় তোমাকে ছেড়ে আসা ছিল আমাদের জন্য বিপজ্জনক। তাই তোমাকেও তুলে আনতে হল। তৃতীয় কারণ, আমাদের একজন ডাক্তারের প্রয়োজন। তোমাকে আমরা সবসময় আমাদের সাথে রাখব।
