***
পরদিন ভোরবেলা। পাহারাদার পরিবর্তনের সময়। নতুন প্রহরী এসে দেখে রাতের প্রহরী নেই। ঘরের ভেতরে উঁকি মেরে দেখে জখমী শুয়ে আছে কম্বল মুড়ি দিয়ে। মুখটাও তার আবৃত। প্রহরী বাইরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তার জানা মতে জখমীকে দেখার জন্য এক্ষুণি ডাক্তার এসে পড়বেন। আসবেন আলী বিন সুফিয়ানও। সে এও জানত যে, জখমীর বোন জখমীর সঙ্গে থাকে এবং সে ছাড়া অন্য কারো ভেতরে যাওয়ার অনুমতি নেই। কিন্তু বোনটিকেও দেখা যাচ্ছে না এদিক-ওদিক কোথাও।
সূর্য উদয় হল। আলী বিন সুফিয়ান আসলেন। ডাক্তার এসেছে কিনা জিজ্ঞেস করলেন। প্রহরী, ডাক্তার আসেননি। আমি এসে পূর্বের প্রহরীকেও পাইনি। ভেতরে জখমীর বোনও নেই। শুনে আলী বিন সুফিয়ান মনে করলেন, জখমীর ব্যাথা বোধ হয় বেড়ে গেছে,তাই তার বোন ডাক্তার ডাকতে গেছে।
এই জখমী সালতানাতে ইসলামিয়ার জন্য মিসরের সমান মূল্যবান ব্যক্তি। অপেক্ষা শুধু তার সুস্থ হওয়ার। আলী বিন সুফিয়ানের আশা, তার মাধ্যমে ভয়ংকর এক ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচিত হবে।
দ্রুত ঘরে প্রবেশ করেন আলী বিন সুফিয়ান। জখমীর আপাদমস্তক কম্বল দিয়ে ঢাকা। তাজা রক্তের ঘ্রাণ নাকে আসে আলী বিন সুফিয়ানের। জখমীর মুখের কম্বল সরান তিনি। হঠাৎ আঁৎকে ওঠে সরে যান পেছন দিকে। যেন ওটা মানুষ নয়, অজগর। সেখানে দাঁড়িয়েই বাইরে দণ্ডায়মান প্রহরীকে ডাক দেন তিনি। ছুটে আসে প্রহরী। আলী বিন সুফিয়ান তাকে কম্বলাবৃত লোকটিকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এ লোকটি রাতের প্রহরী না তো? শায়িত লোকটির চেহারা দেখেই আতংকিত হয়ে উঠে প্রহরী। ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলে, হ্যাঁ, তা-ই তো! ইনি এই বিছানায় শুয়ে আছেন কেন হুজুর? জখমী কোথায়?
শুয়ে আছে নয়- বল মরে আছে। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
উপর থেকে কম্বলটা তুলে সরিয়ে ফেললেন আলী বিন সুফিয়ান। রক্তে রঞ্জিত বিছানা। জখমী হাশীশীর নয়- রাতের প্রহরীর লাশ। আলী বিন সুফিয়ান দেখলেন, লাশের হৃদপিন্ডের কাছে খঞ্জরের দুটি জখম। জখমী হাশীশী উধাও। আলী বিন সুফিয়ান কক্ষে, বারান্দায়, বাইরে নিরীক্ষা করে দেখলেন। কোথাও এক ফোঁটা রক্তও চোখে পড়ল না। এতে পরিস্কার বোঝা গেল, প্রহরীকে জীবিত তুলে এনে বিছানায় শুইয়ে রেখে খঞ্জরের আঘাতে খুন করা হয়েছে। এতটুকু ছটফটও করতে দেয়া হয়নি। অন্যথায় এদিক-ওদিক রক্ত ছড়িয়ে থাকত। প্রাণ যাওয়ার পর লাশের উপর কম্বল মুড়িয়ে রাখা হয়েছে। তারপর ঘাতকরা জখমী ও তার বোনকে তুলে নিয়ে গেছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, জখমীর বোন তার পলায়নে সাহায্য করেছে। সম্ভবত রূপের জালে আটকিয়ে মেয়েটি প্রহরীকে ভেতরে নিয়ে এসেছিল আর ঘাতকদল তাকে হত্যা করেছে।
আলী বিন সুফিয়ান নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হলেন যে, চার সঙ্গীকে জখমীর সাথে সাক্ষাৎ করার অনুমতি দেয়া তার ঠিক হয়নি। তারা নিজেদেরকে জখমীর চাচাতো ভাই বলে পরিচয় দিয়েছিল। ভেতরে প্রবেশ করে তারা এখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করে গেছে। জখমীর বোনকেও এখানে থাকার অনুমতি না দেয়াই উচিত ছিল। তা ছাড়া মেয়েটি আসলেই জখমীর বোন কিনা, তাও তিনি যাচাই করে নিশ্চিত হননি।
আলী বিন সুফিয়ানের ন্যায় একজন অভিজ্ঞ গোয়েন্দা প্রধানকে ধোকা দেয়া সহজ ছিল না। কিন্তু এই জখমী ও তার সঙ্গীদের কাছে হেরে গেলেন তিনি। অনুতপ্ত হন নিজের ভুলের জন্য। প্রহরীকে কয়েকটি কথা জিজ্ঞেস করলে সে জানায়, এর আগের রাতে ডিউটি ছিল আমার। আমি মেয়েটিকে ডাক্তারের সঙ্গে তার ঘরে যেতে এবং গভীর রাতে ফিরে আসতে দেখেছি। এতে আলী বিন সুফিয়ানের সন্দেহ হল যে, তার মানে মেয়েটি ডাক্তারকেও রূপের জালে আটকে ফেলেছিল। আলী বিন সুফিয়ান প্রহরীকে বললেন, তুমি দৌড়ে গিয়ে ডাক্তারকে নিয়ে আস।
প্রহরী চলে যাওয়ার পর আলী বিন সুফিয়ান তথ্য অনুসন্ধানে নেমে পড়েন। বাইরে গিয়ে মাটি পরীক্ষা করেন। তিনি মানুষের পায়ের চিহ্ন দেখতে পান। কিন্তু পদচিহ্ন তাকে কোন সাহায্য করতে পারল না। জখমী শহরে পালিয়ে থাকতে পারে না। পথ আছে মাত্র একটি। তা হল, জখমীর বোনকে যে গ্রাম থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল, সেখানে গিয়ে হানা দেয়া। কিন্তু সে তো অনেক দূরের পথ।
প্রহরী ফিরে এসে জানাল, ডাক্তার ঘরে নেই। আলী বিন সুফিয়ান নিজে তার ঘরে গেলেন। চাকর বলল, ডাক্তার গভীর রাতে একটি মেয়ের সাথে ঘর থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন, আর ফিরেননি। মেয়েটি সম্পর্কে জানায়, এর আগেও সে ডাক্তারের সঙ্গে এ ঘরে এসেছিল এবং অনেক রাত পর্যন্ত দুজন বসে বসে কথা বলেছিল। শুনে আলী বিন সুফিয়ান নিশ্চিত হন যে, ডাক্তারও তাহলে জখমীর পলায়ন ঘটনায় জড়িত এবং এর মূলে রয়েছে মেয়েটির রূপের যাদু।
আলী বিন সুফিয়ান তার গুপ্তচরদের ডেকে পাঠান। তারা এলে তিনি তাদের জখমীর ঘটনা অবহিত করেন। তথ্য অনুসন্ধানের জন্য তারা চারদিক ছড়িয়ে পড়ে। একস্থানে তারা অনেকগুলো ঘোড়র পায়ের চিহ্ন দেখতে পায়। স্থানীয় তিন-চার ব্যক্তি বলল, রাতে তারা অনেকগুলো ঘোড়া দৌড়ানোর শব্দ শুনতে পেয়েছিল। ঘোড়র পায়ের চিহ্ন অনুসরণ করে শহরের বাইরে চলে যায় গুপ্তচররা। কিন্তু আর অগ্রসর হওয়া নিরর্থক। রাতে পালিয়ে যাওয়া ঘোড়াগুলোর পায়ের চিহ্ন দেখে পাকড়াও করা কোনমতেই সম্ভব নয়। আসামী পালিয়ে কোন্দিকে গেছে, তা-ই শুধু নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছে তারা।
