শারজা যখন ডাক্তারের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, তখন গভীর রাত। মেয়েটির মনে এখন আর কোন সন্দেহ নেই। পরদিন ডাক্তার জখমীকে দেখতে আসেন। শারজার সাথে কোন কথা বলেন না তিনি। রোগী দেখে যখন কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে উদ্যত হলেন, অমনি শারজা তার সামনে এসে পথ রোধ করে দাঁড়ায়। শারজার ধারণা, ডাক্তার তার সাথে রাগ করেছেন। ডাক্তার বলেন, আমি তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট নই। শারজা খানিকক্ষণ ডাক্তারের মুখপানে ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে পথ ছেড়ে দেয়। ডাক্তার চলে যান।
রাতে জখমীকে ঘুম পাড়িয়ে শারজা আবার হাঁটা দেয় ডাক্তারের বাড়িতে। ডাক্তারের সঙ্গে কাটায় দীর্ঘ সময়। নিজের মনে কিছু জট পড়ে আছে তার। সেগুলো খুলতে চাইছে সে। শারজা ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা বলুন তো, খলীফা কি আল্লাহর প্রেরিত ব্যক্তি নন?
না, খলীফা সাধারণ মানুষ হয়ে থাকেন। আল্লাহর প্রেরিত লোক তো ছিলেন নবী রাসূলগণ। মুহাম্মদ (সাঃ) পর্যন্ত এসে সে ধারা বন্ধ হয়ে গেছে। জবাব দেন ডাক্তার।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী কি আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ? জিজ্ঞেস করে মেয়েটি।
না, তিনিও মানুষ। তবে সাধারণ মানুষ অপেক্ষা তার মর্যাদা বড়। কারণ, তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মহান পয়গামকে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে পৌঁছিয়ে দিতে চাইছেন। ডাক্তার জবাব দেন।
শারজা এরূপ আরো অনেকগুলো প্রশ্ন করে আর ডক্তির জবাব দেন। সবশেষে শারজা বলে, আমার ভাইটি মস্তবড় পাপী। আপনি এই যে কথাগুলো আমায় বললেন, তা যদি আমার ভাইকে জানাতেন, তাহলে হয়তো ভাইটি আমার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে পারত। কিন্তু তার জীবন তো আর রক্ষা পাবে না।
পাবে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী যখন বলে দিয়েছেন যে, একে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা কর, তো এর অর্থ হল, তাকে শাস্তি দেয়া হবে না। তোমার ভাইয়ের উচিত, পাপাচার থেকে তাওবা করে নেয়া। আমার পূর্ণ বিশ্বাস যে, তোমার ভাই ক্ষমা পেয়ে যাবে। বললেন ডাক্তার।
কেঁদে ফেলে শারজা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, আমি সারাটা জীবন সালাহুদ্দীন আইউবীর খেদমতে কাটিয়ে দেব আর আমার ভাই আপনাদের গোলাম হয়ে থাকবে। বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে শারজা। আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডাক্তারের হাত ধরে বলে, আপনি মূল্য যা চাইবেন, আমি আদায় করব। আপনি আমায় আপনার দাসী বানিয়ে নিন, আপত্তি নেই। বিনিময়ে আমার ভাইকে সুস্থ করে তুলুন এবং তাকে শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।
কাজের বিনিময় আমরা আল্লাহর নিকট থেকে গ্রহণ করে থাকি- শারজার মাথায় হাত রেখে ডাক্তার বললেন- তুমি নিশ্চিত থাক, ভাইয়ের অপরাধের সাজা বোনকে দেয়া হবে না এবং ভাইয়ের চিকিৎসার মূল্যও বোন থেকে আদায় করা হবে না। সকলের রক্ষণাবেক্ষণকারী আল্লাহ। তিনিই আমার উপর তোমর ইজ্জত সংরক্ষণ এবং ভাইয়ের সুস্থতার দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। দুআ কর, যেন আমি এই আমানতে খেয়ানত না করি। নারীর আহাজারি আল্লাহর আরশকে কাঁপিয়ে তুলতে পারে। তুমি দুআ কর এবং সেই আল্লাহর মহত্বের প্রতি লক্ষ্য রাখ, যার বিরুদ্ধে তোমাদেরকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।
মেয়েটির হৃদয়জগতে জেঁকে বসেন ডাক্তার। ডাক্তারের যাদুমাখা কথা আর মায়াময় পবিত্র আচরণ চুম্বকের ন্যায় আকৃষ্ট করে তোলে মেয়েটিকে। ডাক্তারের ব্যাপারে মেয়েটির ধারণা ছিল এক রকম আর প্রমাণিত হয়েছে তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এমন নির্জন রাতে অতিশয় রূপসী একটি যুবতী যে তার দয়ার উপর নির্ভরশীল, সে অনুভূতিই যেন তার নেই। এভাবে কেটে গেল রাতের অর্ধেকটা। ডাক্তার তাকে বললেন, ওঠ, তোমাকে ওখানে রেখে আসি, তোমার ভাইকেও এক নজর দেখে আসি।
.
ঘর থেকে বের হয় দুজন। দরজায় তালা লাগিয়ে হাঁটা দেয় তারা। অন্ধকার রাত। দুটি ঘরের মধ্যখানে একটি সরু গলিপথ অতিক্রম করতে হবে তাদের। এই গলিপথ অতিক্রম করে সামান্য একটু সামনে এগুলেই জখমী হাশীশীর থাকার ঘর। ঘরের দরজায় সান্ত্রী দণ্ডায়মান।
ডাক্তার ও শারজা গলির মধ্যে ঢুকতে যাবেন, ঠিক এমন সময়ে পেছন থেকে কারা যেন হঠাৎ ঝাঁপটে ধরে দুজনকে। মোটা কাপড় দিয়ে বেঁধে ফেলা হয় দুজনের মুখ। টু-শব্দটি পর্যন্ত করতে পারছে না তারা। ডাক্তার দৈহিক শক্তিতে দুর্বল নন। কিন্তু আগে টের পাননি বলে কোন প্রতিরোধ করতে পারলেন না তিনি। আক্রমণকারীরা পাঁচজন বলে মনে হল তাদের কাছে। ডাক্তার ও শারজাকে তুলে নিয়ে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যায় তারা।
কিছুদূরে দাঁড়িয়ে ছিল কয়েকটি ঘোড়া। ডাক্তারের হাত-পা রশি দ্বারা বেঁধে তুলে নেয়া হয় ঘোড়ার পিঠে। একজন চড়ে বসে তার ঘোড়ায়। একজনের কণ্ঠস্বর শুনতে পান ডাক্তার। লোকটি শারজাকে উদ্দেশ করে বলছে, শব্দ কর না শারজা! তোমার কাজ হয়ে গেছে। ঘোড়ার পিঠে চড়ে বস। এই নাও তোমার ঘোড়া।
শারজার মুখের কাপড় সরিয়ে নেয়া হল। ডাক্তার তার কণ্ঠস্বর শুনতে পান, ওকে ছেড়ে দাও, ওর কোন দোষ নেই। লোকটি বড় ভালো মানুষ।
আমাদের ওকে প্রয়োজন আছে। বলল একজন।
শারজা! চুপচাপ ঘোড়ার পিঠে চড়ে বস। আদেশের সুরে বলল আরেকজন।
উহ্! তুমি? শারজার কণ্ঠস্বর।
সওয়ার হয়ে যাও। সময় নষ্ট কর না। আদেশ দেয় আরেকজন।
শারজা ঘোড়ায় চড়ে বসে। ছুটে চলে কাফেলা। অল্পক্ষণের মধ্যে কায়রো থেকে বেরিয়ে যায় তারা।
