দুচোখ গড়িয়ে অশ্রু নেমে আসে শারজার। ডাক্তারের প্রতি ভক্তিতে-আবেগে আপুত হয়ে পড়ে সে। ডাক্তারের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার একটি হাত মুঠি করে ধরে মাথানত করে চুম খায় শারজা। শারজার পরিচয় জানতে চান ডাক্তার। শারজা বলে, আমি আপনার রোগীর বোন। বলেই সে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে, আপনার অন্তরে কি এতই দয়া যে, আপনি আমার ভাইকে কষ্টের মধ্যে দেখতে চান না। নাকি এ উদ্দেশ্যে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চান যে, সে আপনাকে সব গোপন তথ্য ফাঁস করে দেবে?
এর কাছে কোন তথ্য আছে কি নেই তা নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যথা নেই। আমার কর্তব্য একে বাঁচিয়ে রাখা এবং সম্পূর্ণরূপে সুস্থ করে তোলা। আমার দৃষ্টিতে মুমিন-মুজরিমে কোন পার্থক্য নেই। বললেন ডাক্তার।
আপনি বোধ হয় জানেন না যে, এর অপরাধ কি? জানলে আপনি এর কাটা ঘায়ে পট্টি বাঁধার পরিবর্তে নুন ভরে দিতেন। বলল শারজা।
জানি। তবু আমি একে বাঁচিয়ে রাখার পূর্ণ চেষ্টা করে যাব। জবাব দেন ডাক্তার।
ডাক্তারের প্রতি প্রভাবিত হয়ে পড়ে শারজা। নিজের একান্ত ব্যক্তিগত বৃত্তান্ত শোনাতে শুরু করে সে ডাক্তারকে। শারজা জানায়, শৈশবে তার বাবা-মা দুজনই মারা যান। সে সময়ে তার এই ভাইয়ের বয়স ছিল দশ-এগার বছর। ভাই তাকে লালন-পালন করে। ভাই না থাকলে এতদিন কেউ না কেউ তাকে অপহরণ করে নিয়ে যেত। ভাই তার জীবনটাকে ওয়াকফ করে দিয়েছিল বোনের জন্য।
ডাক্তার মনোযোগ সহকারে শারজার কথা শুনতে থাকেন। এক পর্যায়ে মেয়েটিকে তিনি বাইরে আঙ্গিনায় নিয়ে যান, পাছে জখমীর ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে। শারজার কথায় ডাক্তার এতই নিমগ্ন হয়ে পড়েন, যেন রাতটা তিনি এখানেই কাটিয়ে দেবেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর যখন তিনি চলে যেতে উদ্যত হলেন, তখন শারজা তার হাত ধরে বলল, আপনি চলে গেলে আমি ভয় পাব। ডাক্তার বললেন, আমি না তোমায় সাথে করে নিয়ে যেতে পারি, না তোমার সাথে এখানে থাকতে পারি। তবু শারজার খাতিরে তিনি আরো কিছু সময় এখানে অতিবাহিত করে রাত দ্বি-প্রহরের পর ঘরে ফেরেন।
পরদিন ভোরবেলা। সূর্য এখনো উদয় হয়নি। ডাক্তার জখমীকে দেখার জন্য এসে পড়েন। রাতের ন্যায় যত্নের সাথে তিনি রোগীকে নিরীক্ষা করে দেখেন। জখমীকে দুধ পান করান এবং এমন খাবার খাওয়ান, যা শারজা কখনো স্বপ্নেও দেখেনি।
এ সময়ে জখমীর কক্ষে আসেন আলী বিন সুফিয়ান। জখমীকে এক নজর দেখে চলে যান তিনি। কিন্তু ডাক্তার যাননি এখনো। শারজার সাথে কথা বলতে শুরু করেন তিনি। কাটান অনেকক্ষণ।
সেদিন ডাক্তার সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনবার জখমীকে দেখতে আসেন। অথচ তার আসার কথা মাত্র একবার দুপুরে। সন্ধ্যায় যখন ডাক্তার জখমীকে দেখে ফিরে যান, তখন জখমী তার বোনকে বলে, শারজা! মনোযোগ দিয়ে তুমি আমার একটি কথা শোন। আমার জীবন এই ডাক্তারের হাতে। আমি দেখতে পাচ্ছি যে, তোমাকে দেখার পর ডাক্তার চিকিৎসা আগের চেয়ে এখন অনেক ভালো করছেন। আমি মৃত্যুকে বরণ করে নিতে পারি, কিন্তু এত বেশী মূল্য আমি তাকে দেব না, যার আশা সে পোষণ করছে। সন্দেই নয়- আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, আমাকে জীবিত রাখার বিনিময়ে লোকটি তোমার ইজ্জতের নজরানা হাতিয়ে নিতে চায়।
আমি তো তাকে ফেরেশতা মনে করি। এ যাবত এমন কোন আভাস-ইঙ্গিতও পাইনি তার কাছে। তাছাড়া আমি তো আর ছোট্ট খুকী নই যে, চাইলেই সে আমাকে পটাতে পারবে।
রাতে ডাক্তার আসেন। ঘুমিয়ে পড়েছে জখমী। শারজা জাগ্রত। ডাক্তারের সঙ্গে বারান্দায় চলে যায় শারজা। দুজন কথা বলে দীর্ঘক্ষণ। ডাক্তার বললেন, ওষুধের ক্রিয়ায় তোমার ভাই যে ঘুম ঘুমুচ্ছে, ভোর নাগাদ তার সজাগ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এসো, আমার ঘরে চল। ডাক্তারের প্রস্তাব ফেলে দিতে পারে না শারজা। চলে যায় তার সাথে।
সুশ্রী যুবক ডাক্তার একা থাকেন ঘরে। শারজা অতিশয় বুদ্ধিমতি তরুণী। তার ধারণা, আজ রাতে লোকটা ধরা খেয়ে যাবে নিশ্চয়। কিন্তু তেমনটি হয়নি। সমব্যাথী বন্ধুর ন্যায় শারজার সাথে কথা বলে সময় কাটান ডাক্তার। তার এই স্নেহমাখা পবিত্র আচরণ মুগ্ধ করে তুলে শারজাকে। হঠাৎ শারজা জিজ্ঞেস করে বসে, আমি সুদূর এক মরু অঞ্চলের একটি গরীব মেয়ে। তদুপরি এমন এক আসামীর বোন, যে মিসরের সুলতানের ন্যায় মহান ব্যক্তিকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল। তথাপি তুমি আমার সাথে এমন সদয় আচরণ কেন করছ, যার আমি হকদার নই?
জবাবে শুধু মুচকি একটা হাসি দেন ডাক্তার। শারজা বলে, আমার তো এ ছাড়া আর কোন গুণ নেই যে, আমি একটি যুবতী মেয়ে। আর সম্ভবত কিছুটা রূপ সৌন্দৰ্য্যও আছে।
তোমার মধ্যে আরো এমন একটি গুণ আছে, যা তোমার জানা নেই। আমার একটি বোন ছিল দেখতে ঠিক তোমারই মত। তোমাদের যেমন আর কোন ভাই-বোন নেই, তেমনি আমরাও ভাই-বোন দুজনই ছিলাম। আব্বা-আম্মা মারা গেছেন। তোমার ভাইয়ের ন্যায় আমিও আমার বোনকে লালন-পালন করে বড় করেছিলাম। নিজের জীবনের সব হাসি-আনন্দ আমি তার জন্য ওয়াকফ করে দিয়েছিলাম। এক সময়ে তার অসুখ হল আর মারা গেল আমারই হাতে। রয়ে গেলাম আমি একা। তোমাকে দেখে আমার সেই বোনের কথা মনে পড়ে গেল। মনে হল, আমার বোনকে আমি ফিরে পেয়েছি। তুমি যদি নিজেকে যুবতী ও সুন্দরী মেয়ে ভেবে আমার উপর সন্দেহ করেই থাক, তাহলে ঠিক আছে, তোমার ব্যাপারে আমার আর কোন কৌতূহল রইল না। আমি তোমার ভাইকে নিয়েই ব্যস্ত থাকি। তাকে সুস্থ করে তোলা আমার কর্তব্য।
