আলী বিন সুফিয়ান এই মর্মে তাদের আবেদন মঞ্জুর করলেন যে, তিনি নিজে তাদের সাথে থাকবেন এবং জখমীকে এক নজর দেখার সুযোগ দিয়ে সাথে সাথে বের করে দেবেন।
তখনই তিনি তাদেরকে জখমীর কক্ষে নিয়ে গেলেন। ভাইকে দেখেই বোন তার গায়ের উপর লুটিয়ে পড়ে এবং হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। অন্যদের সম্পর্কে আলী বিন সুফিয়ান জখমীকে বললেন, এদের সাথে হাত মিলাও, এরা এক্ষুণি চলে যাবে। জখমী এক এক করে চারজনের সাথে হাত মিলায়। আলী বিন সুফিয়ান তাদের বের হয়ে যেতে আদেশ করলেন এবং বলে দিলেন, এরপর আর কখনো তোমরা এর সাথে দেখা করার চেষ্টা কর না।
তারা চলে যায়। বোন আলী বিন সুফিয়ানের পা জড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আবেদন জানায়, ভাইয়ের সেবার জন্য আপনি আমাকে এখানে থাকার অনুমতি দিন। আলী বিন সুফিয়ান একটি নারীর এরূপ করুণ আর্তি প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না। দেহ তল্লাশি নিয়ে তিনি মেয়েটিকে জখমীর নিকট থাকার অনুমতি দিয়ে বেরিয়ে যান।
কক্ষে এখন শুধু ভাই আর বোন। বোন জানতে চায়, তুমি কী করেছিলে? ভাই ঘটনার বিবরণ দেয়। বোন জিজ্ঞেস করে, তা এখন তোমার পরিণতি কী হবে? ভাই জবাব দেয়, আমি আমীরে মেসেরের উপর প্রাণ-সংহারী হামলা করেছি। এ অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। সুলতান যদি করুণা করেন, তবে বড়জোর মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পেতে পারি। কিন্তু আজীবন তাদের বন্দীশালার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ধুকে ধুকে জীবন কাটাতে হবে অবশ্যই।
তার অর্থ কি এই যে, আমি জীবনে আর কখনো তোমায় দেখতে পাব না? জিজ্ঞেস করে বোন।
না শারজা! তুমি জীবনে আর কখনো আমায় দেখতে পাবে না। আর আমিও না পারব মরতে, না পারব বেঁচে থাকতে। তারা আমাকে যেখানে বন্দী করে রাখবে, তা বড়ই ভয়ংকর জায়গা। বলল জখমী।
শিশুর ন্যায় হাউমাউ করে কেঁধে উঠে বোন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে- আমি তখনও তোমায় বারণ করেছিলাম যে, ওদের চক্করে পড় না। তুমি বলেছিলে, সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করা বৈধ। তুমি লোভে পড়ে গিয়েছিলে। আমার ভবিষ্যত কি হবে, তুমি তারও চিন্তা করলে না। তুমি না থাকলে আমার উপায় কি হত বল তো।
এলোমেলো হয়ে গেছে জখমী ভাইয়ের মস্তিষ্ক। কখনো সে অনুতপ্ত হয়ে বলছে, হায়! কেন আমি ওদের খপ্পরে পড়লাম। কখনো বলছে, সালাহুদ্দীন আইউবী মানুষ নন, আল্লাহর প্রেরিত ফেরেশতা। আমরা চারটি তাগড়া যুবক মিলেও তার দেহে খঞ্জরের একটি আচড়ও বসাতে পারলাম না। একতিল বিষ তার মুখে পুরতে পারলাম না। তিনি একা আমাদের তিনজনকে প্রাণে মেরে ফেললেন আর আমাকেও যমের মুখে তুলে দিলেন।
এই যে মানুষ বলছে, সালাহুদ্দীন আইউবীর ঈমান এত শক্ত যে, কোন পাপিষ্ঠ তাকে হত্যা করতে পারে না, তাতো মিথ্যা নয়। তোমরা চারজনই তো মুসলমান ছিলে। এতটুকু চিন্তাও তোমরা করলে না যে, তিনিও মুসলমান। বলল শারজা।
তিনি আল্লাহর খলীফার সিংহাসনের অবমাননা করেছেন। উল্টো দিকে ঘুরে যায় জখমীর মস্তিষ্ক। উত্তেজিত কণ্ঠে বলে, তুমি জান না যে, আল-আজেদ আল্লাহর প্রেরিত খলীফা ছিলেন।
হয়তো বা ছিলেন অথবা ছিলেন না। আমি শুধু এতটুকু জানি যে, তুমি আমার ভাই আর আমার থেকে তুমি আজীবনের জন্য হারিয়ে যাচ্ছ। তোমার মুক্তির কোন পথ বের করা যায় না কি? বলল শারজা।
হয়ে যাবে হয়তো। আমি এ শর্তেই তাদেরকে আমার সব তথ্য ফাঁস করে দিয়েছি যে, তারা আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। কিন্তু আমার অপরাধ এতই মারাত্মক যে, ক্ষমা বোধ হয় পাব না। জবাব দেয় জখমী।
এ সময়ে জখমীর ঘুমিয়ে পড়ার কথা। এত কথা বলা ঠিক হচ্ছে না তার। পেটের জখম খুলে যাওয়ার আশংকা প্রবল। কিন্তু একনাগাড়ে বলেই যাচ্ছে সে। কাঁদছে তার বোন। হঠাৎ তার পেটের জখমে ব্যথা শুরু হয়ে যায়। অস্থির হয়ে উঠে সে। বোনকে বলে, শারজা! তুমি বাইরে যাও। কাউকে পেলে বল, ডাক্তার নিয়ে আসতে। আমি মরে যাচ্ছি।
এক দৌড়ে বেরিয়ে পড়ে শারজা। প্রহরী দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। প্রহরীকে ভাইয়ের অবস্থা জানায়। প্রহরী শারজাকে ডাক্তারের ঘরটি দেখিয়ে দেয়। ডাক্তারের প্রতি নির্দেশ ছিল, দিন হোক রাত হোক জখমীকে বাঁচিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করতে হবে। শাহী ডাক্তার তিনি।
প্রহরীর দেখিয়ে দেয়া পথ ধরে ছুটে যায় শারজা। পৌঁছে যায় ডাক্তারের ঘরে। ডাক্তারকে ভাইয়ের অবস্থা জানায়। সংবাদ পাওয়া মাত্র ছুটে আসেন ডাক্তার।
রক্তে লাল হয়ে গেছে জখমীর পেটের পট্টি। ডাক্তার সাথে সাথে পট্টিটা খুলে ফেলেন। রক্ত বন্ধ করার পাউডার মেখে দীর্ঘ সময় ব্যয় করে আবার পট্টি বেঁধে দেন। রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে যায়। ডাক্তার জখমীকে ওষুধ খাইয়ে দেন, যার ক্রিয়ায় ঘুমিয়ে পড়ে সে।
.
শাহী ডাক্তার বয়সে তরুণ। সুদর্শন চেহারা। আকর্ষণীয় দেহ। শারজার চোখ আটকে যায় তার প্রতি। আপন ভাইয়ের প্রতি তার সহানুভূতিতেও সে অতিশয় মুগ্ধ। এত রাতে সংবাদ পাওয়া মাত্র একজন কয়েদী জখমীর চিকিৎসার জন্য কেউ ছুটে আসতে পারে, তা কল্পনাও করতে পারছে না শারজা। কিন্তু ইনি আসলেন এবং পরম গুরুত্ব সহকারে জখমীর চিকিৎসা করলেন। তাই ডাক্তারের প্রতি অভিভূত শারজা। নিদ্রায় জখমীর দুচোখের পাতা বন্ধ হয়ে এলে ডাক্তার নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে দুহাত উর্ধে তুলে ধরে মোনাজাত করলেন- মানুষের জীবন-মৃত্যু দু-ই তোমার হাতে হে আমার আল্লাহ! এই হতভাগার প্রতি তুমি রহম কর। একে তুমি মৃত্যুর হাত থেকে– রক্ষা কর। একে সুস্থতা দান কর।
