প্রাসাদের অদৃশ্য দরবেশের মুরীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে দিন দিন। এলাকাবাসী অদ্রুিত ভক্তে পরিণত হচ্ছে তার। দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকার মানুষদের মধ্যে এ বিশ্বাস বদ্ধমূল হতে শুরু করেছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) খলীফা আল-আজেদকে ফেরত পাঠিয়েছেন এবং তিনি নিজেও আসছেন। তারা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার সংকল্প থেকে তওবা করে ফেলে। এখন তাদের বিশ্বাস, যুদ্ধ-বিগ্রহ পাপের কাজ। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী একজন পাপিষ্ঠ মানুষ। নিজের রাজত্বের বিস্তৃতির জন্য তিনি ধোকা দিয়ে লোকদের ফৌজে ভর্তি করান যে, তোমরা যুদ্ধে মারা গেলে শহীদ হবে এবং সোজা জান্নাতে চলে যাবে।
প্রাসাদের ভেতরের জগত এখন মানুষের উপাসনালয়। আশপাশের পার্বত্য এলাকায় এখন তাবু ফেলে বাসবাস করছে তারা। প্রাসাদের পুণ্যাত্মা দরবেশের সাক্ষাত লাভের জন্য তারা ব্যাকুল-বেকারার। একটি নতুন ফেরকার উদ্ভব হল মিসরের এ অঞ্চলটিতে।
***
যে জখমী হাশীশী সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর উপর সংহারী হামলা করেছিল, আলী বিন সুফিয়ান তাকে কায়রো নিয়ে যান। আলাদা একটি ঘরে থাকতে দেয়া হয় তাকে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর নির্দেশ মোতাবেক সর্বক্ষণের জন্য একজন ডাক্তার নিযুক্ত করে দেয়া হয় তার জন্য। তার ঘরের দরজায় একজন সান্ত্রী দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। কিন্তু এখনো পালাবার শক্তি ফিরে আসেনি তার।
সীমান্ত এলাকার ফেরাউনী প্রাসাদ সম্পর্কে তথ্য দিয়েছে জখমী। এখান থেকে পরিচালিত হয় খৃস্টানদের ইসলাম ও আইউবী বিরোধী ষড়যন্ত্র। জখমী সুস্থ হলে তার সহযোগিতায় গোয়েন্দা পাঠিয়ে প্রাসাদের ভেতরের খবরাখবর নেন আলী বিন সুফিয়ান। হতে পারে জখমী মিথ্যা তথ্য প্রদান করেছে। কায়রো ফিরে এসেই আলী বিন সুফিয়ান তার নায়েব হাসান ইবনে আবদুল্লাহ ও গিয়াস বিলবিসকে বলে দিয়েছিলেন যে, যে অঞ্চলের মানুষ আমাদের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে চলে গেছে বলে সংবাদ পাওয়া গেছে, সেখানে আপাতত কোন সংবাদদাতা বা গুপ্তচর যেন না পাঠায়। বড় ধরনের রহস্য উদঘাটনের আশা করছেন আলী বিন সুফিয়ান।
জখমীর মনে কেন যেন সন্দেহ জন্মে গেছে যে, সে বাঁচতে পারবে না। অনর্গল সে কাঁদছে আর নিজের গ্রামের নাম উল্লেখ করে করে বলছে, অমুক জায়গা থেকে আমার বোনটাকে এনে দিন, মৃত্যুর আগে আমি ওকে একটু দেখে যাই। বোনের প্রতি অস্বাভাবিক আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছে লোকটি। এ মুহূর্তে বোন ছাড়া আর কোন ভাবনাই নেই যেন তার হৃদয়ে। দুজন দূতকে আলী বিন সুফিয়ান জখমীর গ্রামের ঠিকানা বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, যাও এর বোনকে সাথে করে নিয়ে আস। এলাকাটি মিসরের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। সাথে সাথে রওনা হয়ে যায় দূত।
.
শোবক পৌঁছে গেছেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। প্রাণ-সংহারী হামলার কোন প্রতিক্রিয়া নেই তার চেহারায়। যেন পথে কিছুই ঘটেনি। তার দেহরক্ষী বাহিনী কমান্ডার ও অন্যান্য কর্মকর্তাগণ যেমন পেরেশান তেমনি লজ্জিত। তাদের আশংকা, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী যে কোন মুহূর্তে আমাদেরকে এ ব্যাপারে জবাবদিহি করবেন। কিন্তু না, এ সম্পর্কে তার কোন কথা নেই। ইঙ্গিতে-আভাসেও কিছু বলছেন না তিনি। শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় কমান্ডের সামরিক কর্মকর্তাদের বললেন, আপনারা নিজ চোখেই তো দেখলেন যে, আমার জীবনের কোন ভরসা নেই। আপনারা আমার সমরকৌশল রপ্ত করার চেষ্টা করুন। গভীর মনোযোগ সহকারে দেখুন, আমি কিভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করছি। আমার অবর্তমানে আপনাদের সামনে অগ্রসর হতে হবে। দুশমন আমাদের বিরুদ্ধে অপর যে গোপন যুদ্ধটি চালু করে ফেলেছে, সেদিকে গভীর নজর রাখুন। নাশকতাকারীদের ধরুন আর শিরচ্ছেদ করতে থাকুন। যারা নিজ দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন-ধর্মের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শনের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী নিজের দেহরক্ষী বাহিনীটির ব্যাপারে একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না। শোবক দুর্গে পৌঁছে প্রথম কথাটি বললেন, কোন গুপ্তচর ফিরে এসেছে কি? তাকে বলা হল, দুজন গুপ্তচর বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে এসেছে। সুলতান আইউবী দুজনকে ডেকে পাঠান এবং খৃস্টানদের পরিকল্পনার বিস্তারিত রিপোর্ট গ্রহণ করেন। গুপ্তচরদের নিকট থেকে তিনি খৃস্টানদের পরিকল্পনা সম্পর্কে পূর্ণ অবগতি লাভ করেন। তিনি সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গীর প্রেরিত বাহিনীর সালার, মিসর থেকে আগত সেনা অধিনায়ক এবং দুজনের দুনায়েবকে ডেকে পাঠিয়ে গভীর ভাবনায় হারিয়ে যান।
.
চারদিন পর জখমী হাশীশীর বোন এসে পৌঁছে। সাথে তার চারজন পুরুষ। এরা জখমীর চাচাতো ভাই বলে পরিচয় দেয়া হল। মেয়েটি তরুণী, অতিশয় রূপসী। ভাইয়ের জন্য বোনও ছিল উৎকণ্ঠিত। জখমী হাশীশী তার একমাত্র ভাই। বাবা বেঁচে নেই। মা মারা গেছেন।
তারা জখমীর সাথে সাক্ষাৎ করবে। কিন্তু এর জন্য আলী বিন সুফিয়ানের অনুমতির প্রয়োজন। আলী বিন সুফিয়ান শুধু বোনকে অনুমতি দিলেন। অনুনয়-বিনয় করে পুরুষ চারজন। বলে, আমরা অনেক দূর থেকে বহু কষ্ট করে এসেছি। জখমী ভাইটিকে শুধু এক নজর দেখে যেতে দিন। তার সাথে আমরা কোন কথা বলব না।
