কিছুদিন পর ঘোষণা হল, প্রতি বৃহস্পতিবার সারাদিন প্রাসাদের দ্বার সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং সন্ধ্যায় মেলা বসবে। সেইদিন থেকে প্রাসাদের যাওয়ার জন্য বৃহস্পতিবার দিনটি নির্ধারিত হয়ে গেল এবং সেই সাথে মহিলারা যাওয়ার অনুমতি পেয়ে গেল। এখন নিজের ইচ্ছায় আর কেউ প্রাসাদে যেতে পারছে না। বৃহস্পতিবার এলেই এলাকা সরগরম হয়ে উঠে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ উট, ঘোড়া ও খচ্চরে চড়ে এবং পায়ে হেঁটে প্রাসাদ অভিমুখে ছুটতে শুরু করে। ভেতরের স্পর্শকাতর জগতে বিপ্লব এসে যায়। তথায় মানুষের দৃষ্টিতে এখন পাপ-পুণ্য ও আলো-আঁধারের ধারণা এমনভাবে উপস্থাপিত হতে শুরু করে যে, মানুষের কাছে তাকে একটি শরীরী বস্তু হিসেবে দেখতে পাচ্ছে এবং বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ছে। কারো মনে উল্টো-সিধে কোন প্রশ্ন নেই, নেই কোন সংশয়-সন্দেহ।
.
পশ্চিম আকাশে সূর্য অস্ত যাওয়া মাত্র সেই অন্ধকার সুরঙ্গপথের মুখ খুলে যায়। সুরঙ্গের প্রবেশ দ্বারে দাঁড়িয়ে থাকে কয়েকজন লোক। তাদের পার্শ্বে থাকে পিকৃত খেজুরছড়া। এগুলো জনসাধারণের দেয়া নজরানা। খেজুরের স্কুপের পার্শ্বেই থাকে মশকভর্তি পানি আর গ্লাস। সন্ধ্যায় যখন দর্শনার্থীরা ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি লাভ করে, তখন আগে তাদের প্রত্যেককে তিনটি করে খেজুর আর এক গ্লাস পানি খাইয়ে দেয়া হয়। তারপর তারা একজন একজন করে ভেতরে প্রবেশ করতে শুরু করে। আঁকাবাকা অন্ধকার সুরঙ্গপথ অতিক্রম করে আলো-ঝলমল বিশাল হলরুমে প্রবেশ করেই তারা শুনতে পায় একটি বাণী
তোমরা কালেমা তায়্যেবা পাঠ কর। আল্লাহকে স্মরণ কর। হযরত মূসা (আঃ) আগমন করেছেন। ঈসা (আঃ) এসে পড়বেন। অন্তর থেকে পাপ-প্রবণতা ও শত্রুতা ঝেড়ে ফেল। লড়াই-ঝগড়া ত্যাগ কর। আর জান্নাতের প্রলোভন দেখিয়ে যাদেরকে যুদ্ধে নামান হয়েছিল, তাদের পরিণতি দেখ।—
এ ঘোষণা শেষ হওয়া মাত্র উপস্থিত লোকদের চোখে অতি প্রখর একটি আলো এসে পতিত হয়। তাদের সকলকে একদিকে মুখ করিয়ে দাঁড় করানো হয়। ধীরে ধীরে চোখের আলো তাদের ক্ষীণ হয়ে আসে। তারপর আলো কখনো প্রখর কখনো ক্ষীণ হতে থাকে এবং লোকদের সম্মুখের দেয়ালে তারকার চমক পরিলক্ষিত হতে শুরু করে। তারকাগুলো কাঁপতে থাকে এবং অতি ভয়ংকর আকৃতির কিছু মানুষের গমনাগমন চোখে পড়তে আরম্ভ করে। আবার ভেসে আসে একটি কণ্ঠস্বর
এরা তোমাদেরই ন্যায় যুবক ও সুশ্রী ছিল। কিন্তু এরা খোদার পয়গাম মান্য করেনি। এরা কোমরে তরবারী ঝুলিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে এদেরই ন্যায় সুদর্শন যুবকদের হত্যা করেছিল। এদের বলা হয়েছিল, তোমরা লড়াই কর। যুদ্ধ করতে করতে যদি মারা যাও, তাহলে শহীদ হবে এবং জান্নাতে চলে যাবে। এখন তোমরা এদের পরিণতি দেখ। খোদা এদের আকৃতিকে শয়তানের আকৃতিতে রূপান্তরিত করে পথে ছেড়ে দিয়েছেন।
এই কণ্ঠস্বরের সাথে শোনা যেত মেঘের গর্জন আর দেখা যেত বিজলির চমক। এমন কিছু আওয়াজও ভেসে আসত, যা হিংস্র কোন প্রাণীর শব্দ বলে মনে হতো। আলো এত প্রখর হয়ে উঠত যে, মানুষের চোখ ধাধিয়ে যেত। তারপর লম্বা লম্বা দাঁতবিশিষ্ট হিংস্র প্রাণীরা ডানে-বাঁয়ে ছুটাছুটি শুরু করে দিত। এরাও মূলত মানুষ। কিন্তু এদের আকৃতি ব্যাঘের ন্যায় ভয়ংকর। তারা বাহুর উপর দুটি করে উলঙ্গ মেয়ে তুলে রেখেছে। মেয়েগুলো অত্যন্ত সুন্দরী ও যুবতী। ছটফট করছে তারা। মেঘের গর্জন ধীরে ধীরে আরো প্রচণ্ড হয়ে উঠে। আবার ভেসে আসে কণ্ঠস্বর- নিজের রূপ লাবণ্যে এদের বড় গৌরব ছিল। কিন্তু খোদার রূপকে এরা কলংকিত করেছিল।
তারপর জনতার সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করে কিছু সুদর্শন পুরুষ ও নারী। হাসিমুখে উফুল্লচিত্তে তারা অতিক্রম করে। ঘোষণা হয়- এরা নেক ও পবিত্র মানুষ। এরা কখনো যুদ্ধে লিপ্ত হয়নি। যুদ্ধ-বিগ্রহকে কখনো সমর্থনও করেনি। এরা আপাদমস্তক প্রেম ও শান্তির প্রতিমূর্তি।
তারপর দর্শনার্থীদের নিয়ে যাওয়া হতো একটি পাতাল কক্ষে। সেখানে একদিকে পড়ে আছে অসংখ্য মানব কংকাল, অপরদিকে হেসে-খেলে ফুর্তি করে ছুটাছুটি করছে বেশকিছু রূপসী তরুণী। খানিক পরপর ভেসে আসছে একটি কণ্ঠস্বর- হযরত ঈসা (আঃ) এর আবির্ভাবের সময় ঘনিয়ে এসেছে। যুদ্ধ-বিগ্রহ ও খুন-খারাবী মন থেকে ঝেড়ে ফেল। অন্যথায় তোমাদের পরিণতি হবে ভয়াবহ।
পাতাল কক্ষের একটি দরজা দিয়ে লোকদের বাইরে বের করে দেয়া হয়। বের হওয়ার পর তাদের কাছে মনে হয় যেন তারা ঘুমিয়ে ছিল। ঘুমের মধ্যে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছে। যেমন ভয়ংকর তেমন প্রীতিকর স্বপ্ন। তারা পুনরায় ভেতরে প্রবেশ করার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠে। কিন্তু আপাতত আর তাদের প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। তারা ঘরে ফিরে যেতে চায় না। প্রাসাদের আশপাশে বসে বসেই রাত কাটিয়ে দেয়। ওখানকার লোকেরা তাদের ভেতরের রহস্যের বিবরণ দেয়। একটি রহস্য হল, প্রাসাদের ভেতরে যার কণ্ঠ শোনা যায়, তিনি খোদার পক্ষ থেকে বার্তা নিয়ে এসেছেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) পৃথিবীতে আগমন করছেন এবং খলীফা আল-আজেদও দুনিয়াতে ফিরে এসেছেন।
.
আল-আজেদ ফাতেমী খেলাফতের খলীফা ছিলেন। তার সিংহাসন ছিল মিসরে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে মিসরকে বাগদাদের খেলাফতে আব্বাসীয়ার অধীন করে দেন। তার অল্প কদিন পরেই আল-আজেদ মৃত্যুবরণ করেন। এটি দুআড়াই বছর আগের ঘটনা। ফাতেমীরা খৃস্টান ও হাশীশীদের সাথে যোগসাজশ করে একটি ষড়যন্ত্র আঁটে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং মিসরে ফাতেমী খেলাফতের পুনর্বহাল ছিল সেই ষড়যন্ত্রের প্রধান উদ্দেশ্য। সেই ষড়যন্ত্রকে সফল করার লক্ষ্যে মিসর আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল সুদানীদের।
