তারপর এলাকাবাসীদের মধ্যে এ জাতীয় কাহিনী একের পর এক ছড়াতে থাকে। ধীরে ধীরে মানুষের মন থেকে ভীতি ও শংকা কেটে যেতে শুরু করে। এক পর্যায়ে এলাকাবাসী কৌতূহলী হয়ে উঠে এবং পর্বতসমূহের আশপাশে ঘোরাফেরা করতে আরম্ভ করে দেয়। অনেককে তারা ভেতরে যাওয়া-আসা করতে দেখতে পায়। তারা জানায় যে, ভেতরে একজন বুজুর্গ লোক আছেন, তিনি গায়েবের অবস্থা ও আকাশের খবর বলে দিতে পারেন। এমনও বলাবলি শুরু হয় যে, তিনিই ইমাম মাহদী। কেউ বলে, তিনি হযরত মূসা (আঃ)। আবার কারো মতে ঈসা (আঃ)। তবে সকলেই এ ব্যাপারে একমত যে, লোকটি আল্লাহ-প্রেরিত একজন মহামানব অবশ্যই। তিনি পাপিষ্ঠদের সাক্ষাৎ দেন না। তার নিকট যেতে হলে নিয়ত পরিচ্ছন্ন থাকতে হয়। এমনও বলা হচ্ছে যে, তিনি মৃতকে জীবিত করতে পারেন।
এসব তেলেসমাতি ও রহস্যময় কাহিনী শোনার পর এবার মানুষ ভেতরে যাওয়া আসা শুরু করে। প্রথমবারের মত তারা নিকট থেকে ফেরাউনী প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ প্রত্যক্ষ করে, যেগুলোকে এতদিন তারা ভয় করত। তারা প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করে। অসংখ্য কক্ষ, আঁকাবাঁকা সরু পথ। একটি কক্ষ বিশাল-বিস্তৃত। ছাদটা অনেক উঁচু। আশপাশের পরিবেশ ভয়ানক। কিন্তু খোশবুতে মৌ মৌ করছে এলাকাটা। কক্ষের ভেতর থেকে কয়েকটি সিঁড়ি চলে গেছে নীচের দিকে।
এ প্রাসাদ সেই ফেরাউনদের, যারা নিজেদেরকে খোদা বলে দাবী করত। ঘনিষ্ঠজন ব্যতীত তাদেরকে কেউ চোখে দেখত না। তারা জনসধারণকে এই প্রাসাদে সমবেত করত এবং নিজেদের শুধু কণ্ঠস্বর শোনাত- দেখা দিত না কখনো। তাদের কণ্ঠস্বর কতগুলো সুরঙ্গ পথে ভেসে এসে এই প্রাসাদের কক্ষে কক্ষে ছড়িয়ে পড়ত। বক্তা অবস্থান করত সুরঙ্গের অপর প্রান্তে, যা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারতো না। এই অদৃশ্য কণ্ঠস্বরকে তারা খোদার আওয়াজ মনে করত। প্রাসাদের বড় বড় কক্ষগুলোতে আলোর জন্য এমন ব্যবস্থা থাকত যে, দীপ-বাতি দেখা যেত না, কিন্তু কক্ষগুলো থাকত আলোকোজ্জ্বল। স্বচ্ছ কাঁচের মত চকমকে এক প্রকার ধাতুর তৈরী চাদর ব্যবহার করা হত। তার ভেতরে লুকায়িত থাকত ছোট ছোট বাতি। সেই বাতির আলো প্রতিবিম্বিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ত কক্ষময়; কিন্তু সাধারণ মানুষ বিষয়টি বুঝত না।
এসব তো হল শত শত বছর আগের কথা। এখন সালাহুদ্দীন আইউবীর আমলেও এই প্রাসাদে পুনরায় সেই আওয়াজ গুঞ্জরিত হতে শুরু করে, যাকে এককালে মানুষ খোদার কণ্ঠস্বর বলে বিশ্বাস করত। স্বল্প সময়ের মধ্যে মানুষের হৃদয় থেকে এই পরিত্যক্ত প্রাসাদের ভয়-ভীতি দূরীভূত হয়ে যায়। প্রশস্ত অন্ধকার সুরঙ্গ পথ অতিক্রম করে তারা প্রাসাদের বড় কক্ষে পৌঁছে যায়। আলোয় ঝলমল করছে গোটা কক্ষ। কিন্তু কোন বাতি নেই। একটি কণ্ঠস্বর ভেসে বেড়াচ্ছে কক্ষময়। কে যেন বলছে
আমি তোমাদেরকে অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়ে আলোর পথে এনেছি। এটি তুর পাহাড়ের আলো। এই আলোকে তোমরা হৃদয়ে স্থান করে দাও। ফেরাউনের প্রেতাত্মারা মরে গেছে। এখন এখানে বিরাজ করছে মূসার নূর। ঈসা এসে এ নূরকে আরো আলোকময় করবেন। তোমরা আল্লাহকে স্মরণ কর, কালেমা পাঠ কর।
বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ে জনতা। বিস্ফারিত নয়নে একজন তাকায় অপরজনের দিকে। ইল্লাল্লাহর জিকিরে মুখরিত করে তোলে গোটা কক্ষ।
এই বক্তব্যে যদি নবী হযরত মূসা, হযরত ঈসা (আঃ) ও কালেমা তায়্যেবার উল্লেখ না থাকত, তাহলে সাধারণ মানুষ এতে প্রভাবিত হত না। তারা ছিল মুসলমান। ইসলামের নাম ব্যবহার করার কারণেই এই অদৃশ্য বাণী তাদের হৃদয়ে রেখাপাত করতে সক্ষম হয়েছিল। পরক্ষণে পুনরায় শব্দ ভেসে আসল আল্লাহ তার রাসূলকে রেসালাত দান করেছিলেন হেরা গুহার অন্ধকারে, তোমরা এই গুহার অন্ধকারে আল্লাহর নুর দেখতে পাবে।
জনতার মস্তক অবনমিত হয়ে আসে এবং এই বাণীও তাদের হৃদয়ে গেঁথে যায়। কিন্তু যে মহান সত্তার কণ্ঠস্বর, যিনি অসহায় পথিকদের উট-ঘোড়া, খাবার-পানি ও স্বর্ণমুদ্রা দান করেন, মৃতকে জীবন দান করেন, তাকে এক নজর দেখার জন্য মানুষ উদগ্রীব হয়ে উঠে। তাদের উৎকণ্ঠা দিন দিন বাড়তেই থাকে। যখনই তারা ঘরে ফিরত, তাদের স্ত্রীরা জানাত আজ অপরিচিত একজন লোক এসেছিল। লোকটা প্রাসাদের দরবেশের কারামত শুনিয়ে গেল এবং বলল, সে নাকি দরবেশের সাথে সাক্ষৎ করে এসেছে।
একদিন জনসাধারণ এলাকার সবচেয়ে বড় গ্রামটির মসজিদের ইমামের নিকট এসব ঘটনার তাৎপর্য জানতে চায় যে, হুজুর! বিষয়টা আসলে কী? জবাবে ইমাম বললেন, তিনি একজন মহান ব্যক্তি। নেক লোকদের ছাড়া কাউকে সাক্ষাৎ দেন না, কারো নিকট ধরা দেন না। আর নেক মানুষ তারা, যারা খুন-খারাবী করে না। আপোস ও শান্তির জীবনযাপন করে। কাউকে মারেও না, নিজেও মরতে যায় না। তোমরা যে দরবেশের কথা জানতে চাইছ, তিনি হযরত ঈসা (আঃ)-এর পয়গাম নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। তার পয়গামে যুদ্ধ নেই, আছে প্রেম আর ভালোবাসা। তার আনীত পয়গামের একটি উপদেশ হল, কাউকে জখমী কর না বরং জখমীর ক্ষতস্থানে পট্টি বেঁধে দাও। তোমরা যদি তার নীতির অনুসরণ করে চল, তাহলে তিনি তোমাদের অবস্থার পরিবর্তন করে দেবেন। তোমরা সুখময় জীবন লাভ করবে।
একজন সম্মানিত ইমাম যখন দরবেশ ও তার বক্তব্য সঠিক বলে রায় দিলেন, তখন আর জনমনে সন্দেহের অবকাশ রইল না। এবার তারা ঠাটপাট প্রাসাদে যাওয়া আসা করতে শুরু করল।
