এবার সেখানকার জনসাধারণ শুধু টিলার ভয়ংকর এলাকার ভেতরে প্রবেশ করাই শুরু করেনি বরং ফেরাউনদের পুরোনো এমন সব প্রাসাদের অভ্যন্তরেও ঢুকতে আরম্ভ করে দিয়েছে, এক সময়ে যেখানে যাওয়ার কথা কল্পনা করলেও তাদের গা শিউরে উঠত।
সম্প্রতি এই গমনাগমনের ধারা এভাবে শুরু হয় যে, এক গ্রামে একজন উষ্ট্রারোহীর আগমন ঘটে। নবাগত সেই লোকটি মিসরীয় মুসলমান। উটটি তার উন্নত জাতের এবং সুস্থ-সবল। এলাকাবাসীদের সমবেত করে লোকটি একটি কাহিনী শোনায়
আমি একজন গরীব মানুষ। দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে কোন উপায় না দেখে এক পর্যায়ে ডাকাতি করার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি। আমার কোন বাহন ছিল না। লাগাতার কয়েকদিন পায়ে হেঁটে বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে-ফিরেও ডাকাতি করার জন্য কোন শিকার পাইনি। অবশেষে ঐ পার্বত্য এলাকায় যেখানে কেউ যাওয়া-আসা করে না-প্রবেশ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। কয়েকদিন পর্যন্ত পেটে খাবার পড়েনি। আমি শক্তিহীন হয়ে পড়ি। উপায়ন্তর না দেখে আমি আকাশ পানে হাত তুলে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করি। তৎক্ষণাৎ আমি গুঞ্জনের ন্যায় একটি শব্দ শুনতে পাই। কে যেন বলছে, তোমার ভাগ্য ভালো যে তুমি এখনো পাপ করনি; পাপের সংকল্প করেছ মাত্র। তুমি যদি কাউকে লুট করে এখানে আসতে, তাহলে এতক্ষণে তোমার গায়ের গোশতগুলো খসে পড়ত এবং তোমার দেহটা কংকালে পরিণত হয়ে যেত। শয়তানের লেলিয়ে দেয়া হিংস্র প্রাণীরা তোমার খসে পড়া গোশত ভক্ষণ করত।
আওয়াজ শুনে আমি চৈতন্য হারিয়ে ফেলি। অনুভব করলাম, কে যেন আমাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। চোখ খুলে দেখলাম, আমি এক স্থানে বসে আছি। আমার সম্মুখে শুভ্র শশ্রুমন্ডিত এক বুজুর্গ। দুধের মত সাদা তার গায়ের রং। নুরানী চেহারা। আমি বুঝে ফেললাম, ঐ যে আওয়াজ শুনলাম, তা এই বুজুর্গেরই কণ্ঠস্বর। আমার বাকশক্তি হারিয়ে যায়। আমি কাঁপতে শুরু করি। বুজুর্গ লোকটি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ভয় পেও না। ঐ যে মানুষগুলো যারা এখানে আসতে ভয় করে-ওরা কপালপোড়া। শয়তানই ওদেরকে এখানে আসতে দেয় না। তুমি যাও, ওদেরকে বল, এখন আর এখানে ফেরাউনদের প্রভূত্ব চলে না। এটি হযরত মূসা (আঃ) এর সাম্রাজ্য। শেষ জমানায় হযরত ঈসা (আঃ) আকাশ থেকে এখানে অবতরণ করবেন। তখন ইসলামের আলোতে এসব অনাবাদী এলাকা আলোকিত হবে, যে আলোতে উদ্ভাসিত হবে সমগ্র পৃথিবী। তুমি যাও, লোকদেরকে আমার পয়গাম শুনিয়ে দাও, তাদেরকে এখানে নিয়ে আস।
আগন্তুক বলল, আমি উঠে দাঁড়াতে পারছিলাম না। অনাহারে শরীর শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। বুজুর্গ বললেন, তুমি উঠে দাঁড়াও। পঞ্চাশ কদম উত্তর দিকে যাও। খবরদার পিছনে ফিরে তাকাবে না। ভয় পাবে না। মানুষের কাছে আমার পয়গাম অবশ্যই পৌঁছিয়ে দিবে। অন্যথায় তোমার বিরাট ক্ষতি হবে বলে দিচ্ছি। পঞ্চাশ কদম অতিক্রম করার পর একটি উট বসে আছে দেখবে। তার সঙ্গে খাবার আছে, পানি আছে। সঙ্গে তার যা কিছু পাবে, সবই তোমার।
আগন্তক গ্রামবাসীদের জানায়
এবার আমি উঠে দাঁড়াতে সক্ষম হই। দেহে শক্তি ফিরে আসে। আমি ভয় পাচ্ছিলাম, এটি কোন ফেরাউনের কদরূহ কিনা। আমি পেছনের দিকে তাকালাম না। ঠিক পঞ্চাশ কদম সম্মুখে আসার পর একটি উট দেখতে পেলাম। সঙ্গে তার খাদ্য পানীয় বাঁধা। আমি সেই খাবারগুলো খেলাম ও পানি পান করলাম। এবার আমার– শরীরের এত শক্তি জাগে যে, এর আগে কখনো আমি এমন শক্তি পাইনি।
আগন্তুক জনসাধারণকে একটি থলে খুলে দেখায়, যাতে কতগুলো সোনার আশরাফী। এ থলেটি উটের সঙ্গে বাঁধা ছিল। লোকটি সেই উটের পিঠে চড়ে গ্রামে এসে উপস্থিত হয়।
আগন্তুক গ্রামবাসীদের শুভ্র শশ্রুমন্ডিত বুজুর্গের পয়গাম শুনিয়ে উট হাঁকিয়ে ফিরে যায়।
আগন্তুকের কাহিনী শুনে গ্রামবাসীদের মনে ভয়ংকর সেই পার্বত্য এলাকায় প্রবেশ করার তীব্র আকাংখা জাগ্রত হয়। কিন্তু এলাকার প্রবীণ লোকেরা বলে যে, এই অপরিচিত আগন্তুক মানুষ নয় বরং এ প্রেত-পুরীরই ভয়ানক কোন বাসিন্দা।
.
মানবস্বভাবের একটি দুর্বলতা এই যে, মানুষ গুপ্ত বিষয়কে জানার এবং গোপন রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করে, তাতে যত নিষেধাজ্ঞাই থাকুক না কেন। যেসব দেহে যৌবনের খুন প্রবাহমান, তারা বড় বড় ঝুঁকিও বরণ করে নিতে কুণ্ঠিত হয় না। গ্রামের যুবকরা সংকল্পবদ্ধ হয় যে, তারা ওখানে যাবেই। স্বর্ণমুদ্রার আকর্ষণ বড় কঠিন, যা থেকে মানুষ নিজেকে রক্ষা করতে পারে না।
চল্লিশ মাইল দীর্ঘ দশ মাইল প্রস্থ এই ভূখন্ডে যতগুলো গ্রাম আছে, সব কটি গ্রামের অধিবাসীরা শুনতে পেয়েছে, অজ্ঞাত পরিচয় এক আগন্তুক এমন এমন কাহিনী শুনিয়ে গেছে। শুনে কেউ বিশ্বাস করল, কেউ করল না। আবার কেউ বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝে দোল খেতে লাগল। কিন্তু সেদিকে যেতে ভয় পাচ্ছে সবাই। সাহস করে যারা গেল, তারাও রহস্যময় সেই পার্বত্য অঞ্চলকে দূরে থেকে দেখেই ফিরে এল। কিছুদিন পর আরো দুজন উষ্ট্রারোহী যুবক এসে সমগ্র এলাকা ঘুরে যায়। তারাও এলাকবাসীকে একই রকম কাহিনী শুনিয়ে যায়। এক বুজুর্গ ব্যক্তি তাদেরও বলে দেন যে, তোমরা পাড়ায় গিয়ে সবাইকে আমার পয়গাম পৌঁছিয়ে দাও, যেন তারা ফেরাউনী আমলের ধ্বংসাবশেষগুলোকে ভয় না করে।
