জখমী তার মনের সব গোপন কথা বলে যায় অনর্গল। ক্ষমতাচ্যুত ফাতেমী খেলাফত এবং হাশীশীদের মুখোশ উন্মোচন করে দেয় সে। ফাতেমীরা খৃস্টানদের থেকে কি কি সাহায্য গ্রহণ করেছে এবং করে যাচ্ছে, তার বিবরণ প্রদান করে।
দীর্ঘ সময় ব্যয় করে ডাক্তার তার জখমে পট্টি বাঁধার কাজ সম্পন্ন করেন। তবে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর মমতা-ই হল অসহায় জখমীর আসল চিকিৎসা।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী লাশগুলো বাইরে ফেলে দেয়ার নির্দেশ দেন। আলী বিন সুফিয়ান জখমী সম্পর্কে বলেন, একে নিয়ে তুমি কায়রো চলে যাও এবং এর স্বীকারোক্তি মোতাবেক অভিযান চালাও।
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছিল জখমী। তন্মধ্যে কিছু ছিল এতই ভয়ংকর যে, সেগুলোর অনুসন্ধান কেবল আলী বিন সুফিয়ানের পক্ষেই সম্ভব। জখমীকে উটের পিঠে শুইয়ে নিয়ে কায়রো অভিমুখে রওনা হন আলী বিন সুফিয়ান।
.
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে আক্রমণ পরিচালিত হয়েছিল বেশ কবার। তার সব কটি ঘটনার উল্লেখ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। মাত্র দুটি হামলার উল্লেখ পাওয়া যায়। যার একটি হল এই। অপরটির বিবরণ নিম্নরূপ
একবার এক ফেদায়ী ঘাতক সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর উপর এমনিভাবে শায়িত অবস্থায় খঞ্জর দ্বারা আক্রমণ করেছিল। খঞ্জর তাঁর শিরস্ত্রাণে আঘাত হানে এবং সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী সজাগ হয়ে যান। এই ঘাতক সুলতানের হাতেই মারা যায় এবং সুলতানের দেহরক্ষীদের মধ্যে তার বাহিনীর এমন কজন সদস্য ধরা পড়ে, যারা ছিল ফেদায়ীদের ভাড়া করা ঘাতক।
***
মিসরের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে সুদানের সীমান্তের সাথে সংযুক্ত-শত শত বছরের পুরনো কিছু প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ বিদ্যমান। তৎকালে মিসরের সীমান্ত ছিল ভিন্ন রকম। সুলতান সালাহুদ্দীন বলতেন যে, মিসরের কোন সীমান্ত নেই। সুদানীরা একটি কাল্পনিক সীমান্ত স্থির করে রেখেছিল মাত্র।
প্রাসাদগুলোর আশপাশের এলাকা অতি দুর্গম। মনে হচ্ছে ফেরাউনদের যুগে এসব এলাকা ছিল সবুজ-শ্যামল। ছিল পানির ঝরণা, ঝিল, সুগভীর দুটি নদী, বালুকারময় মরুপ্রান্তর ও বালিমাটির টিলা। কোন টিলা সুবিশাল প্রাসাদের স্তম্ভের ন্যায় চলে গেছে উপরে-অনেক দূরে। কোনটি দাঁড়িয়ে আছে দেয়ালের ন্যায়। যেখানেই সমতল ভূমি, সেখানেই বালি। লক্ষণে মনে হয়, এলাকার স্থানে স্থানে পানি ছিল। ছিল গাছপালা-তরুলতা। অধিবাসীরা চাষাবাদ করত, ফসল উৎপাদন করত। অন্তত চল্লিশ মাইল দীর্ঘ এবং দশ-বারো মাইল প্রস্থের এই অঞ্চলে এক সময় মানুষের বসবাস ছিল। অধিবাসীরা অধিকাংশই ছিল মুসলমান। তবে অদ্ভুত ধরনের বিশ্বাস লালন করত তারা।
ফেরআউনী আমলের এই প্রাসাদ-ধ্বংসাবশেষগুলোকে মানুষ প্রচণ্ড ভয় করে। আশপাশের এলাকাগুলোও এমন যে, দেখামাত্র মানুষের গা শিউরে উঠে। ভুলেও এখানে পা রাখে না কেউ। মানুষের বিশ্বাস, এ অঞ্চলে ফেরাউনদের বহগুলো বসবাস করে। দিনের বেলা এরা পশুর রূপ ধারণ করে যোরাফেরা করে। কখনো এদেরকে উটের উপর সওয়ার সিপাহীর বেশে দেখা যায়। আবার কখনো রূপসী নারীর আকৃতিতে দৃষ্টিগোচর হয়। রাতের বেলা সেখান থেকে ভয়ংকর ধরনের শব্দ শুনতে পাওয়া যায়।
.
বছর কয়েক হল, এ ধ্বংসাবশেষগুলো মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে। তার আগে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী যখন অত্র অঞ্চলে নতুন সেনাভর্তির অভিযান শুরু করেছিলেন, তখন থেকে তাঁর সৈন্যরা এ এলাকার আশপাশ দিয়ে ঘোরাফেরা করতে শুরু করে। এলাকার অধিবাসীরা তাদের হুশিয়ার করে দিয়েছিল, যেন তারা টিলার অভ্যন্তরে প্রবেশ না করে। স্থানীয় লোকেরা তাদেরকে রহস্যময় শব্দ, ভয়ংকর বস্তু ও বদহদের নানা কাহিনী শোনায়।
এ এলাকা থেকে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী অনেক নতুন সৈন্য পেয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের চিন্তা-চেতনা পাল্টে যায়। সীমান্ত প্রহরীরা রিপোর্ট দিয়েছিল যে, তাদের টহলদার সান্ত্রীরা পর্যন্ত কখনো অত্র এলাকায় প্রবেশ করত না এবং কখনো কাউকে সেদিকে যেতে দেখেনি। কিন্তু এখন অনেকেই ভেতরে যাওয়া আসা করছে এবং যারা যাচ্ছে, ফিরে আসার পর তাদের চেহারায় কোন ভীতির ছাপ পরিলক্ষিত হয় না। এখন শোনা যাচ্ছে, প্রতি বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত ধ্বংসাবশেষের অভ্যন্তরে মেলা বসে। তারপর একটি ঘটনা এই ঘটে যে, সীমান্তরক্ষীদের চার পাঁচজন সিপাহী হঠাৎ একদিন লাপাত্তা হয়ে যায়। তাদের ব্যাপারে রিপোর্ট দেয়া হল যে, তারা পালিয়ে গেছে।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী একদিকে যেমন শত্রুর দেশে নিজের গুপ্তচর ঢুকিয়ে রেখেছিলেন, তেমনি নিজের দেশেও গুপ্তচরদের জাল বিছিয়ে রেখেছিলেন। অমুসলিম ঐতিহাসিকগণ বিশেষভাবে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রশংসা করেছেন যে, তিনি গুপ্তচরবৃত্তি ও কমান্ডো স্টাইলের যুদ্ধকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রশিক্ষণের নতুন পন্থা উদ্ভাবন করেছিলেন এবং প্রমাণ করেছিলেন যে, মাত্র দশজন সৈন্য দ্বারা এক হাজার সৈন্যের কাজ করা সম্ভব। তবে এটা সত্য কথা যে, মুসলমান হওয়ার কারণে ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর এই বিদ্যাকে ইতিহাসের পাতায় যতটুকু স্থান দেয়া উচিত ছিল, ততটুকু দেয়নি। অবশ্য তত্ত্বালের ঐতিহাসিকগণের রচনা থেকে জানা যায় যে, ইসলামের এই মহান প্রহরী ইন্টেলিজেন্স এবং গেরিলা ও কমান্ডো অপারেশনে কী পরিমাণ অভিজ্ঞ ছিলেন। দেশের অভ্যন্তরে তার গোয়েন্দা বাহিনী পরতে পরতে দৃষ্টি রাখত এবং সেনা হেডকোয়ার্টারে রিপোর্ট সরবরাহ করত। তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ হল, মিসরের দূর-দূরান্তের এমন সব এলাকার তৎপরতার সংবাদও কেন্দ্রে পৌঁছে যেত, যেসব এলাকা সম্পর্কে বলা হতো যে, স্বয়ং খোদাও এ এলাকার কথা ভুলে গেছেন। অবশ্য সংবাদদাতারা সেসব এলাকার জনসাধারণের শুধু বাহ্যিক পরিবর্তনই প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হয়েছে এবং তার রিপোর্ট কেন্দ্রে পৌঁছিয়েছে। অভ্যন্তরে কী সব ঘটনা ঘটেছিল, তার সন্ধান তারা লাভ করতে সক্ষম হয়নি। এতটুকু তথ্য লাভ করার পর এক পর্যায়ে নিহত কিংবা নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল দুজন গুপ্তচর।
