সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ডাকে তাঁবুতে প্রবেশ করে দুরক্ষী। কিন্তু তারাও হামলা করে সুলতানের উপর। এতক্ষণে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী আহত করে ফেলেন দ্বিতীয় রক্ষীকে। তবুও লড়ে যাচ্ছে সে। এখন সাথে এসে যোগ দেয় তার অপর দুসঙ্গী। হুঁশ-জ্ঞান-সাহস ঠিক রেখে মোকাবেলা করে যান সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। আল্লাহর রহমত, এমনি সময়ে বাহিনীর কমান্ডার এসে প্রবেশ করেন তাঁবুর ভেতর। অন্যান্য রক্ষীদেরও ডাক দেন তিনি। সুলতান আইউবীর নির্দেশে নিজে ঝাঁপিয়ে পড়েন আক্রমণকারীদের উপর। ছুটে আসে চার-পাঁচজন রক্ষী। চেঁচামেচি শুনে দৌড়ে আসেন আলী বিন সুফিয়ান ও তাঁর সঙ্গীরা। ঘটনা দেখে থ খেয়ে যান তারা। রক্তাক্ত দেহে লুটিয়ে আছে চারজন রক্ষী। মরে গেছে দুজন। একজনের মরি মরি অবস্থা, হুঁশ নেই তার। পেটটা উপর থেকে নীচ পর্যন্ত ফাঁড়া। বুকে গভীর দুটি জখম। চতুর্থজনের পেটে একটি জখম, অপর জখমটি উরুতে। মাটিতে বসে হাতজোড় করে চীৎকার করছে সে আমাকে বাঁচতে দাও, বোনটির জন্য আমাকে বাঁচাও!
নিজ রক্ষীদের নিরস্ত্র করেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। অবস্থা দেখে তারা এত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল যে, তৃতীয় লোকটিকে অচেতন অবস্থায় নিঃশ্বাস ফেলতে দেখেই ধমনী কেটে দেয় তার। চতুর্থজনকে তাদের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখেন সুলতান। এটি একদিকে যেমন তাঁর মমতার বহিঃপ্রকাশ, অপরদিকে ষড়যন্ত্রের মূল সূত্র উদঘাটনের জন্য একজনের বেঁচে থাকা আবশ্যকও বটে।
কাফেলার সাথেই ছিল সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ডাক্তার। সুলতান যেখানে যান, এই ডাক্তার সর্বদা তাঁর সঙ্গে থাকেন। সুলতান তাকে বললেন, যে কোন মূল্যে এ লোকটিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সুলতানের গায়ে এতটুকু আঁচড়ও লাগেনি। তিনি হাঁপাচ্ছেন। তবে মানসিক দিক থেকে তিনি সম্পূর্ণ শান্ত। আবেগ-উৎকণ্ঠা, রাগ-ক্ষোভ কিছুই নেই তার মনে। মুখে মুচকি হাসি টেনে তিনি বললেন, আমি বিস্মিত নই। এমনটি হওয়ারই কথা।
তবে আলী বিন সুফিয়ানের মনে বেশ অস্থিরতা পরিলক্ষিত হল। তাঁর দায়িত্ব ছিল, সুলতানের দেহরক্ষী হিসেবে যাকে নির্বাচন করবেন, যাচাই-বাছাই করে দেখবেন লোকটা নির্ভরযোগ্য কিনা। এখন তাকে দেখতে হবে বাহিনীর অবশিষ্ট সিপাহীদের মধ্যে এদের কোন সদস্য রয়ে গেছে কিনা।
প্রথম আক্রমণকারী রক্ষী যে পুরিয়াটা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর মুখে দিতে চেয়েছিল, সেটা পড়ে আছে সুলতানের বিছানায়। এক প্রকার পাউডার। রং সাদা। তার খানিকটা ছিটিয়ে পড়েছে বিছানায়। ডাক্তার পাউডারগুলো পরীক্ষা করে দেখলেন। বললেন, এগুলো বিষ- এমন বিষ যে, এর তিল পরিমাণও যদি কারো কণ্ঠনালী অতিক্রম করে, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই তার মৃত্যু ঘটে। এগুলো সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল শুনে তিনি আঁতকে উঠেন। ডাক্তারের নির্দেশে বিছানাটি উঠিয়ে বাইরে নিয়ে পরিস্কার করে আনা হয়।
জখমীকে তুলে নিজের বিছানায় শুইয়ে দেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। তরবারীর একটি আঘাত লেগেছে তার পেটে। অপরটি উরুতে। পেটের আঘাত আশংকাজনক নয়। তেরছা করে কাটা। উরুর জখম লম্বা ও গভীর। হাতজোড় করে সুলতানের নিকট জীবন ভিক্ষা চাইছে সে। সুলতানের বিরুদ্ধে তার ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। দৃষ্টিভঙ্গির কোন বিরোধও নয়। সে ভাড়াটিয়া ঘাতক। ধরা পড়ার পর এখন নিজের অবিবাহিতা বোনটির জন্যই তার যত অস্থিরতা। বারবার নিজেন নাম উচ্চারণ করে মিনতির সুরে বলছে- আমি মুসলমান। আপনি আমার অপরাধ ক্ষমা করুন মহামান্য সুলতান! আমার নিরপরাধ বোনের খাতিরে আমায় মাফ করে দিন।
মানুষের জীবন-মৃত্যু দুই-ই আল্লাহর হাতে। শান্ত সমাহিত অথচ ভাব-গম্ভীর কণ্ঠে বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। সুলতান বললেন, নিজ চোখেই তো দেখলে, কে মারেন আর কে জীবিত রাখেন। তবে দোস্ত! এ মুহূর্তে তোমার জীবনটা যার হাতে, তুমি তাকে দেখতে পাচ্ছ। নিজের অপরাধের প্রতি দৃষ্টি দাও। নিজের অসহায়ত্বের কথা একটু ভাব। আমি তোমাকে তোমার সতীর্থদের মরদেহের সাথে জীবন্ত মরুভূমিতে ফেলে আসব। মরুর শিয়াল আর নেকড়েরা তোমাকে জীবন্ত ছিঁড়ে ছিঁড়ে ভক্ষণ করবে। তোমার হুশ-জ্ঞান ঠিকই থাকবে, তুমি সব টের পাবে। কিন্তু পালাতে পারবে না। তুমি ধুকে ধুকে জীবন বিসর্জন দেবে আর নিজের পাপের শাস্তি ভোগ করবে।
অকস্মাৎ শিউরে উঠে জখমী। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর দুহাত ঝাঁপটে ধরে। উপুড় হয়ে পড়ে হাউ মাউ করে কেঁদে উঠে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? কোথা থেকে এসেছ? আমার সঙ্গে তোমার শত্রুতা কিসের?
আমি হাশীশীদের লোক। আমরা চারজন হাশীশী ছিলাম। কেউ দুবছর, কেউ তিন বছর আগে আপনার ফৌজে ভর্তি হয়েছি। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমাদেরকে আপনার দেহরক্ষী ডিভিশনে ঢোকানো হয়েছে। জবাব দেয় জখমী। অকপটে সব তথ্য ফাঁস করে দিতে শুরু করে সে। বলে- আপনার রক্ষী বাহিনীতে আমরা এই চারজন ছিলাম ঘাতক। বক্তব্যের ফাঁকে সুলতান ডাক্তারকে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ডাক্তার তাকে ঔষধ খাইয়ে দেন। রক্তক্ষরণ বন্ধ করার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। জখমীকে তিনি সান্ত্বনা দিয়ে বললেন- ভয় নেই, ঠিক হয়ে যাবে।
