সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী কায়রো থেকে দ্বি-প্রহরের পর রওনা হন। রাতের অর্ধেকটা কাটে সফরে আর বাকিটা বিশ্রামে। শেষ রাতে আবার সফর শুরু করেন। সূর্য উদয় হয়। রোদের তাপ প্রখর থেকে প্রখরতর হতে থাকে। চলতে থাকে কাফেলা। দ্বি-প্রহরের প্রচন্ড সূর্যতাপ ঘোড়াগুলোকে অস্থির করে তুলতে শুরু করে। কাফেলা থেমে যায়। অবস্থান গ্রহণ করে এমন একস্থানে, যেখানে পানি আছে, গাছ আছে, আছে টিলার ছায়াও। অল্প সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে যায় সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর তাবু। সুলতানের চারপাই ও চাদর বিছিয়ে দেওয়া হয় তাঁবুতে।
পানাহার শেষে শুয়ে পড়েন সুলতান। তাঁবুর সামনে-পিছনে দাঁড়িয়ে যায় দুরক্ষী। নিকটেই গাছের ছায়ায় বসে পড়ে অন্যান্য রক্ষীরা। ঘোড়াগুলোকে পানি পান করানোর জন্য নিয়ে যায় কয়েকজন। আলী বিন সুফিয়ান ও অন্যান্য কর্মকর্তাগণ একটি গাছের নীচে গিয়ে শুয়ে পড়েন। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর তাবু এখান থেকে দেখা যায় না। মরুভূমির সূর্য জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে আসমান জমিন। যে যেখানে ছায়া পেল বসে-শুয়ে পড়ল সকলে।
যে দুরক্ষীর উপর সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর তাবু পাহারার দায়িত্ব চাপে, তারা দুজন হাশীশী। এমন ঘটনা এই প্রথম। দীর্ঘদিন ধরে এমনি একটি সুযোগেরই সন্ধানে ছিল তারা। মিশন বাস্তবায়নে তাদের এখনই সুবর্ণ সুযোগ। রক্ষী বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য চলে গেছে ঘোড়াগুলোকে পানি পান করাতে। পানির কূপের অবস্থান একটি টিলার অপর প্রান্তে। কাফেলার মাল বহনকারী উটের চালকরাও উটগুলোকে পানি পান করানোর জন্য নিয়ে গেছে কূপে। তাদের মধ্যেও দুজন হাশীশী। চোখের ইশারায় ডিউটিরত হাশীশী রক্ষীদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে যায় তারা।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর তাবুর সম্মুখে দন্ডায়মান রক্ষী তাঁবুর পর্দাটা ঈষৎ ফাঁক করে ভিতরে তাকায়। ঈশারা করে বাইরের জনকে। গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। পিঠটা তার তাঁবুর দরজার দিকে ফেরানো। পা টিপে টিপে ভিতরে ঢুকে পড়ে রক্ষী। খঞ্জর-তরবারী কিছুই বের করেনি সে। হাতের রশিটাও রেখে এসেছে তাঁবুর বাইরে। সুঠাম, সুদেহী বলবান এক যুবক। শক্তিতে সুলতান আইউবীর দিগুণ না হলেও দেড়গুণ তো অবশ্যই।
রক্ষী সতর্ক পায়ে পৌঁছে যায় সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট। বিদ্যুদ্বেগে দুহাতে ঝাঁপটে ধরে সুলতানের ঘাড়। ঘুম ভেঙ্গে যায় সুলতানের। পার্শ্ব পরিবর্তন করলেন সুলতান। কিন্তু রক্ষীর পাঞ্জা থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারলেন না তিনি। আক্রমণকারী সান্ত্রী সুলতানের পিঠে কনুইচাপা দিয়ে এক হাত সরিয়ে নেয় ঘাড় থেকে। অপর হাতে চেপে ধরে রাখে সুলতানের ধমনী। কটিবন্ধ থেকে পুরিয়ার মত কি যেন একটা বের করে সে। পুরিয়াটা এক হাতেই খুলে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর মুখে ঢুকিয়ে দিতে যায়। সুলতানকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলতে চাইছে রক্ষী।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী অসহায়। পিঠে তার শক্তিশালী একটি দানবের চাপা দেয়া কনুই। ধমনীটা চেপে ধরে আছে সে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আছে সুলতানের। মুখটা ছিল খোলা। পুরিয়া দেখে মুখটা এখন বন্ধ করে ফেলেছেন তিনি। মৃত্যু তাঁর এসে গেছে মাথার উপর। তবু বুদ্ধি হারাননি সুলতান।
তরবারী-সদৃশ একটি খঞ্জর সর্বদা সঙ্গে থাকে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর। এটি তার অলংকার। বাঁধা থাকে কোমরে। সেটি বের করে হাতে নেন তিনি। আক্রমণকারী সুলতানের মুখে বিষ দেয়ার প্রচেষ্টায় ব্যস্ত। তার পাজরে খঞ্জরটি সেঁধিয়ে দেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। এক টানে বের করে আনেন। আঘাত হানেন পুনর্বার। পাজরে বিদ্ধ হয় আবারো। আক্রমণকারী রক্ষী গন্ডারের ন্যায় মোটা চামড়ার মানুষ। এত অল্প সময়ে সরবার নয় সে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী একজন সৈনিক। খঞ্জরের আঘাত ও কার্যকারিতা জানা আছে তাঁর। দ্বিতীয় আক্রমণের পর রক্ষীর পাজর থেকে খঞ্জরটি বের করে নেন তিনি। কয়েকটা মোচড় দিয়ে আরো ভিতরে সেঁধিয়ে ঝটকা এক টান দেন নীচের দিকে। আক্রমণকারীর নাড়িভুড়ি ও পেটের ভেতরটা বেরিয়ে আসে বাইরে।
শিথিল হয়ে আসে আক্রমণকারীর হাত দুটো। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ঘাড় ছুটে যায় তার হাত থেকে। অপর হাত থেকে ছুটে পড়ে যায় পুরিয়াটা। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। ধাক্কা দেন আক্রমণকারীকে। চারপাই থেকে নীচে গিয়ে পড়ে লোকটি। উঠে দাঁড়াবার শক্তি নেই তার।
মাত্র আধা মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে যায় এ যুদ্ধ। তাঁবুর বাইরে দণ্ডায়মান ছিল অপর রক্ষী। কিছু একটা পতনের শব্দ শুনতে পায় সে। পর্দা তুলে উঁকি দেয় তাঁবুর ভেতর। দৃশ্য দেখে চমকে উঠে। তরবারী উঁচু করেই ভেতরে প্রবেশ করে রক্ষী। আঘাত হানে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর উপর। ঝট করে তাঁবুর মধ্যবর্তী খুঁটির আড়ালে চলে যান তিনি। আঘাতটা পড়ে গিয়ে বাঁশের খুঁটির উপর। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী যেমন জন্মগত অসিচালক, তেমনি সুদক্ষ যোদ্ধাও। সাথে সাথে পাল্টা খঞ্জরের আঘাত হানেন আক্রমণকারীর উপর। আক্রমণকারীও সৈনিক। সুলতানের আঘাত প্রতিহত করে সে। সাথে সাথে রক্ষীবাহিনীর কমান্ডারকে আওয়াজ দেন সুলতান। পুনরায় আঘাত হানে আক্রমণকারী। সম্মুখ থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। চলে যান আক্রমণকারীর এক পার্শ্বে। পাল্টা আঘাত করেন সুলতান। সুলতানের এই খঞ্জরাঘাত ঠেকাতে ব্যর্থ হয় রক্ষী।
