খৃস্টানদের ভরসা মূলত বর্মাচ্ছাদিত বাহিনীর উপর। তাদের অধিকাংশ সৈন্য বর্মপরিহিত। সকলের মাথায় শিরস্ত্রাণ। উট-ঘোড়াগুলো পর্যন্ত বর্মাচ্ছাদিত। তাদের ইউরোপিয়ান ঘোড়াগুলো মরুভূমিতে অল্পসময়ে ক্লান্ত ও বেহাল হয়ে যায় বলে তারা আরব থেকে ঘোড়া ক্রয় করে এনেছে। কিন্তু সংখ্যায় তেমন বেশী নয়। তাই তারা মুসলমানদের কাফেলা থেকে ঘোড়া ছিনতাই করতে শুরু করেছিল। চুরি করেও এনেছে কিছু। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ঘোড় উন্নতজাতের। তার আরবী জাতের ঘোড়াগুলো অসীম সহনশীল। পিপাসায় অকাতর মাইলের পর মাইল ছুটতে পারে এগুলো।
এতো হলো খৃস্টানদের সামরিক প্রস্তুতি। এর বাইরে তারা আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ঘোষণা করে রেখেছিল। সে ব্যাপারে গোয়েন্দা প্রধান হরমুনের রিপোর্ট হল, সালাহুদ্দীন আইউবী মিসরের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এলাকা থেকে নতুন ভর্তি পাবেন না। অত্র অঞ্চলের কেউ তার বাহিনীতে ভর্তি হবে না। এই সেই এলাকা, যার ব্যাপারে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর উপ-গোয়েন্দা প্রধান হাসান ইবনে আবদুল্লাহ রিপোর্ট করেছিলেন যে, অমুক এলাকার মানুষ এখন সেনাবাহিনীতে ভর্তি হচ্ছে না এবং অনেক লোক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধাচারণ করছে।
.
এটি একটি অবাধ্য ও দাঙ্গাবাজ গোত্রের অঞ্চল। এক সময় এরা সুলতান আইউবীকে বেশ ভাল ভাল সৈন্য দিয়েছিল। কিন্তু এখন হরমুনের রিপোর্ট প্রমাণ করছে, খৃস্টানদের সন্ত্রাসী বাহিনী সে এলাকায় পৌঁছে গেছে। তাদের অপতৎপরতায় এখন সেখানকার পরিস্থিতি এত নাজুক হয়ে গেছে যে,হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ সংবাদ নেয়ার জন্য দুজন গোয়েন্দা প্রেরণ করেছিলেন দুজনই খুন হয়েছে। তাদের লাশ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। শুধু রহস্যময় ধরনের একটি সংবাদ পাওয়া গিয়েছিল যে, তাদেরকে চিরদিনের জন্য গুম করে ফেলা হয়েছে। বিশাল-বিস্তৃত সেই লোকালয়টি এখন দুর্ভেদ দুর্গ। সেখান থেকে কোন তথ্য সংগ্রহ করে আনা এখন মুসলমানদের পক্ষে অসম্ভব। শুধু এতটুকু তথ্য জোগাড় করা সম্ভব হয়েছে যে, সেখানকার জনসাধারণ মুসলমান বটে, তবে তারা কুসংস্কারাচ্ছন্ন একটি সম্প্রদায়।
সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে হরমুন জানান যে, তার পরিকল্পনা সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে চলছে। এখন তিনি মিসরের সবকটি সীমান্ত এলাকায় এ পন্থা প্রয়োগ করবেন। তারপর ধীরে ধীরে এর প্রভাব মিসরের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করবেন। হরমুন আশা প্রকাশ করেন যে, গোটা মিসরকেই তিনি তার প্রভাব-বলয়ে নিয়ে আসবেন। তিনি বললেন, আমি মুসলমানদের এমন একটি দুর্বলতাকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছি, যাকে তারা নিজেদের গুণ মনে করে। মুসলমান দরবেশ-ফকির, পীর-মুরীদ, মাওলানা মৌলভী এবং মসজিদের কোণে বসে আল্লাহ আল্লাহ জিকিরকারী সকলেই বুজুর্গ ধরনের এমন একদল লোককে নির্বিচারে ভক্তি-শ্রদ্ধা করে থাকে, যারা ইসলামী ফৌজের সেই সব সালারদের শত্রু মনে করে, যারা আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে খ্যাতি অর্জন করেছে। এই পীর-মাশায়েখগণ তাদের আপন আপন ভক্ত-মুরিদদের বলে থাকেন যে, আল্লাহ তাদের হাতে আছেন। তারা আল্লাহর খাস বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। তদের চিন্তা, কিভাবে তারা জনমনে সুখ্যাতি অর্জন করবেন। যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত হওয়ার হিম্মত তাদের নেই। তাই ফৌজের সালারগণ ময়দানে জীবনবাজি লড়াই করে যে খ্যাতি অর্জন করেছে, তারা ঘরে বসেই তা লাভ করতে চায়। প্রকৃত বিচারে মুসলমানদের এই সেনাপতিগণই সালাহুদ্দীন আইউবী ও নুরুদ্দীন জঙ্গী যাদের অন্যতম- খাঁটি মানুষ, আসল মুসলমান। দেশের মানুষ যদি ইবাদত-বন্দেগীতে তাদের নামও উল্লেখ করে, আমি বলব, তারা এর হকদার। কিন্তু তাদের খলীফারা ইবাদতের মধ্যে নিজেদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে ফেলেছেন। পাশাপাশি নামধারী আলেম ও ইমামদের একটি দলের আবির্ভাব ঘটেছে, যারা কাজ করতে ভয় পান। খলীফাদের ছত্রছায়ায় তারা জিহাদের বিকৃত ব্যাখ্যা দিচ্ছে, যাতে মানুষ জিহাদবিমুখ হয়ে তাদের নিকট গিয়ে ভীড় জমায় এবং তাদেরকে পীর বুজুর্গ,আল্লাওয়ালা জেনে শ্রদ্ধা করে। তারা এমন যাদুময় ভাষায় কথা বলে যে, সাধারণ মানুষ ভাবতে শুরু করে, তাদের হৃদয়ে এমন এমন ভেদ লুকায়িত আছে, যা আল্লাহ যাকে তাকে দান করেন না। ফলে সরল-সহজ মানুষ তাদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে যাচ্ছে। আমি সেই আলেম ও দরবেশদের কাজে লাগাচ্ছি। মুসলমানদের এই দুর্বলতা আমাদের অনেক ফায়দা দিচ্ছে। আমি মুসলমানদেরকে ইসলামেরই কথা শুনিয়ে শুনিয়ে ইসলামের মৌল চেতনা থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছি। ইতিহাস সাক্ষী আছে যে, ইহুদীরা তথ্যসন্ত্রাস দিয়েই ইসলামকে বেশ দুর্বল করে দিয়েছিল। আমি তাদেরই নীতিমালা অনুসারে কাজ করে যাচ্ছি।
এটিই সেই যুদ্ধক্ষেত্র, যার ব্যাপারে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। তার এত দুশ্চিন্তার মূল কারণ, এই যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁরই জাতির লোকেরা তাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করছে এবং সে যুদ্ধক্ষেত্র তাঁর দৃষ্টির আড়ালে।
***
তকিউদ্দীন ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়ে সালাহুদ্দীন আইউবী রণাঙ্গনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। সাথে চব্বিশজন ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর একটি বাহিনী। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর দেহরক্ষীদের এই সংখ্যা জানা ছিল খৃস্টানদের। তারা এও জানত যে, এই বাহিনীর চারজন হাশীশী, যারা নিজেদের যোগ্যতা ও বীরত্বের প্রমাণ দিয়ে সুলতানের দেহরক্ষী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। কিন্তু তারা সুযোগ পাচ্ছে না। কারণ, দেহরক্ষীদের সংখ্যা সব সময় চব্বিশ অপেক্ষা বেশী থাকে এবং তাদের ডিউটি পরিবর্তন হতে থাকে। এই চারজনের ডিউটি একত্রে পড়েনি কখনো। রক্ষীবাহিনীর কমান্ডার যতটুকু সম্ভব সাবধান থাকেন সব সময়। রক্ষীদের মধ্যে ঘাতক আছে, কমান্ডার তা জানতেন না বটে, কিন্তু তিনি সর্বদা সজাগ থাকতেন, পাছে কেউ দায়িত্বে অবহেলা না করে। এই সফরে সুলতান আইউবী নিজেই বললেন, রক্ষীদের পুরো বাহিনীকে তিনি সাথে রাখবেন না। চব্বিশজনই যথেষ্ট। অথচ, পথে খৃস্টান কমান্ডোদের আক্রমণের আশংকা আছে প্রবল।
