***
তিন-চার দিন পর।
কার্ক দুর্গে মিটিং বসেছে খৃস্টানদের। খৃস্টান সম্রাট ও সেনা অধিনায়কগণ বৈঠকে উপস্থিত। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর অগ্রযাত্রায় তারা শংকিত। তিনি শোবক নিয়ে গেছেন; যে কোন মুহূর্তে কার্কও আক্রান্ত হতে পারে বলে তারা বেজায় চিন্তিত। মুসলমানরা যদি শোবকের ন্যায় কার্কও জয় করে নিয়ে যায়, তাহলে জেরুজালেম রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে ভেবে তারা বিচলিত। তারা টের পেয়েছে যে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী সাবধানতার সাথে অগ্রসর হচ্ছেন। তিনি একটি এলাকা দখল করছেন আর নতুন ভর্তি দিয়ে সৈন্যের অভাব পূরণ করছেন। নতুন সৈন্যদেরকে পুরাতন সৈন্যদের সাথে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন এবং যখন নিশ্চিত হচ্ছেন যে, এবার এরা শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার যোগ্য হয়েছে, তখন সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছেন। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর এই কর্মধারাকে সামনে রেখেই খৃস্টানরা কার্কের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্ত করেছে, বাইরে এসে লড়াই করারও পরিকল্পনা প্রস্তুত। কিন্তু এ বৈঠকে তারা সেই পরিকল্পনায় পরিবর্তন সাধন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী তার বাহিনী ও মিসরের সাম্প্রতিক বিপ্লব সংক্রান্ত গোয়েন্দা প্রধান হরমুনের রিপোর্টই তাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর যে বাহিনীটি শোবক দুর্গ জয় করেছিল, তিনি তাদেরকে কায়রো নিয়ে গেছেন। কায়রোর বাহিনীকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দিয়েছেন। নূরুদ্দীন জঙ্গীর সামরিক সাহায্য ময়দানে পৌঁছে গেছে। সুলতান আইউবী কায়রো গিয়েছেন এবং কুচক্রী গাদ্দারদের শাস্তি দিয়ে আবার রণাঙ্গনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন, অতি অল্প সময়ের মধ্যে গুপ্তচর মারফত সে সংবাদ কার্ক পৌঁছে গিয়েছিল। কায়রোর উপ-রাষ্ট্রপ্রধান মোসলহুদ্দীনের গ্রেফতারি ও মৃত্যুদণ্ডের সংবাদ ছিল খৃস্টানদের জন্য অনভিপ্রেত। মোসলেহুদ্দীন ছিল খৃস্টানদের একজন সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ট। বৈঠকে এসব ঘটনাপ্রবাহের বিবরণ দিচ্ছিলেন গোয়েন্দা প্রধান হরমুন।
তিনি বললেন, মোসলেহুদ্দীনের মৃত্যুতে আমাদের বিরাট ক্ষতি হয়েছে ঠিক; কিন্তু তকিউদ্দীনের নিয়োগ আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক। তকিউদ্দীন সালাহুদ্দীন আইউবীর ভাই বটে, তবে আমাদের গুপ্তবাহিনী তাকে বাগে আনতে সক্ষম হবে। আরো আশার কথা হল, সালাহুদ্দীন এবং আলী বিন সুফিয়ান দুজনই কায়রোতে অনুপস্থিত।
আমি বুঝতে পারছি না যে, তোমার হাশীশীরা কি করছে! অভাগারা এখনো সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করতে পারল না! টাকা তো এ পর্যন্ত প্রচুর নষ্ট করলাম। বললেন সম্রাট রেমান্ড।
অর্থ যা ব্যয় করছি, নষ্ট হচ্ছে না। আমি আশা করছি, সালাহুদ্দীন আইউবী রণাঙ্গন পর্যন্ত পৌঁছুতে পারবেন না। তার সাথে যে চব্বিশজন দেহরক্ষী কায়রো গিয়েছিল, তাদের চারজন আমাদের হাশীশী সদস্য। মওকা তাদের হাতে এসে গেছে। সব আয়োজন আমি সম্পন্ন করে দিয়েছি। সালাহুদ্দীন আইউবীকে তারা পথেই হত্যা করে ফেলবে। সংবাদটা এই এসে পড়ল বলে। বললেন হরমুন।
আমাদের এত আত্মবিশ্বাস না থাকা উচিত। ধরে রাখ, সালাহুদ্দীন আইউবী নিহত হয়নি এবং জীবিত ও অক্ষত রণাঙ্গনে অবস্থান করছে। তার কাছে আছে এখন তাজাদম বাহিনী। নতুন ভর্তির পর এখন তার সৈন্য সংখ্যা অনেক। নূরুদ্দীন জঙ্গীর সাহায্যও পেয়ে গেছে। শোবকের ন্যায় দুর্ভেদ্য দুর্গ এখন তার দখলে। তার রসদ এখন কায়রো থেকে আসবে না। শোবকে তিনি বিপুল খাদ্য-সম্ভার জোগাড় করে রেখেছেন। এমতাবস্থায় আমাদের করণীয় কি, সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। আমি এই সুযোগ দিতে চাই না যে, আইউবী কার্ক অবরোধ করে ফেলবেন আর আমরা তার অবরোধে লড়াই করব। বললেন ফিলিপ অগাস্টাস।
আইউবীকে আমরা দুর্গ অবরোধ করার সুযোগ দেব না। আমরা দুর্গের বাইরে গিয়ে লড়াই করব এবং এমন ধারায় লড়ব যে, ধীরে ধীরে আমরাই বরং শোবক অবরোধ করে ফেলব। বললেন অপর এক খৃস্টান সম্রাট।
সালাহুদ্দীন মরু-শিয়াল। মরু এলাকায় তাকে পরাস্ত করা সহজ নয়। আমাদেরকে তিনি শোবক অবরোধ করার সুযোগ হয়তো দেবেন, কিন্তু বিনিময়ে স্বয়ং আমাদেরকেই তিনি অবরুদ্ধ করে ফেলবেন। আমি তার চাল বুঝে ফেলেছি। তোমরা যদি মুখোমুখি এনে তাকে লড়াই করাতে বাধ্য করতে পার, তাহলে আমি তোমাদেকে বিজয়ের গ্যারান্টি দিতে পারি। তবে একথা সত্য যে, তোমরা তাকে মুখোমুখি আনতে পারবে না। বললেন ফিলিপ অগাস্টাস।
দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত হল, অর্ধেক সৈন্য দুর্গের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হবে। তারা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনীর সন্নিকটে ছাউনী ফেলে অবস্থান নেবে এবং মুসলিম বাহিনীর গতিবিধির উপর কড়া নজর রাখবে।
এ পরিকল্পনায় যারা দুর্গের বাইরে গিয়ে লড়াই করবে, তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, সংখ্যায় তারা হবে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনীর তিনগুণ। দ্বিগুণ তো অবশ্যই। পেছন দিক থেকে আক্রমণ করার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে স্বতন্ত্র বাহিনী। পরিকল্পনায় স্থির করা হয়েছে, যেহেতু মুসলিম বাহিনীর রসদ ও অন্যান্য সাহায্য আসবে শোবক থেকে, তাই শোবক আর মুসলমানদের মধ্যকার ফাঁকা স্থানকে রাখতে হবে কমান্ডো বাহিনীর দখলে। সম্মুখ থেকে এত জোরালো আক্রমণ চালাতে হবে, যাতে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী একস্থানে স্থির হয়ে মুখোমুখি লড়াই করতে বাধ্য হন।
