আপনার সমস্যাগুলো আমি এখানে এসে বুঝতে পারলাম। মোহতারাম নূরুদ্দীন জঙ্গীও পুরোপুরি অবহিত নন যে, আপনি মিসরে একটি গাদ্দার বাহিনীর বেষ্টনীতে পড়ে গেছেন। এ ব্যাপারে তো আপনি তার সাহায্য নিতে পারতেন। বললেন তকিউদ্দীন।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী জবাব দিলেন
ভাই তকি! সাহায্য শুধু আল্লাহরই নিকট প্রার্থনা করা উচিত। সাহায্য প্রার্থনা আপনদের নিকট করা হোক বা দুশমনের নিকট, তা ঈমানকে দুর্বল করে দেয়। খৃস্টানদের বাহিনী বর্মপরিহিত। আমার সৈন্যরা আবৃত থাকে সাধারণ পোশাকে। তারপরও তারা খৃস্টানদের পরাজিত করেছে বারবার। ঈমান যদি লোহার মত শক্ত হয়, তাহলে লৌহবর্মের প্রয়োজন হয় না। বর্ম ও খন্দক নিরাপত্তার অনুভূতি সৃষ্টি করে এবং সৈন্যদের নির্ধারিত সীমানার মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলে। যুদ্ধক্ষেত্রে তুমি সব সময় পরিখার বাইরে থাকবে। ঘুরে-ফিরে লড়াই করবে। দুশমনের পিছনে যাবে না কখনো, বরং দুশমনকেই পিছনে রেখে লড়াই চালিয়ে যাবে। কেন্দ্র ঠিক রাখবে। পার্শ্ব বাহিনীকে ছড়িয়ে দেবে। দুশমনকে বেকায়দায় ফেলে হত্যা করবে। গেরিলা বাহিনী ব্যতীত কখনো যুদ্ধে যাবে না। গেরিলাদের দ্বারা দুশমনের রসদ ধ্বংস করাবে। পেছন থেকে যে রসদ আসবে, তাও ধ্বংস করবে এবং যা তাদের সাথে আছে, তাও ধ্বংস করবে। গেরিলাদেরকে দুশমনের পশুদের হত্যা কিংবা অস্থির করে তোলার কাজে ব্যবহার করবে। কখনো মুখোমুখি সংঘাতে লিপ্ত হবে না। যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করবে। দুশমনকে পেরেশান করে রাখবে। যে বাহিনীটি আমি রেখে যাচ্ছি, সেটি ময়দান থেকে এসেছে। তারা শোবক দুর্গ জয় করে এসেছে। এসেছে দুশমনের চোখে চোখ রেখে। এসেছে নিজের বহু সৈন্য শহীদ করিয়ে। জানবাজ গেরিলা বাহিনীও আছে এর মধ্যে। তাদের শুধু ইশারার প্রয়োজন। এই বাহিনীর মধ্যে আমি ঈমানের উত্তাপ সৃষ্টি করে রেখেছি। পাছে এমন যেন না হয় যে, তুমি নিজেকে সম্রাট ভেবে বস আর বাহিনীটির ঈমান ধ্বংস করে ফেল। আমাদের উপর যেসব হামলা হচ্ছে, তা আসছে আমাদের ঈমানের উপর। মনে রেখো, খৃস্ট সভ্যতা মিসরে ঢুকে পড়ছে বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মত।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী তার ভাই তকিউদ্দীনকে বিস্তারিত বুঝিয়ে দেন যে, সুদানে মিসর আক্রমণের প্রস্তুতি চলছে। সুদানীদের অধিকাংশ হল ওখানকার হাবশী উপজাতি, যারা না মুসলমান, না খৃস্টান। তাদের মধ্যে এমন কিছু মুসলমানও আছে, যারা মিসরের এই বাহিনীর পলাতক সৈনিক। বিদ্রোহের অভিযোগে তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী বললেন
কিন্তু তুমি ঘরে বসে দুমশনের অপেক্ষা করবে না। গোয়েন্দারা তোমাকে রিপোর্ট জানাতে থাকবে। হাসান ইবনে আবদুল্লাহ তোমার সাথে থাকবে। যখনই টের পাবে যে, দুশমনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং তারা আক্রমণ করার জন্য সমবেত হচ্ছে, সময় নষ্ট না করে সাথে সাথে তুমি হামলা করে ফেলবে এবং প্রস্তুত অবস্থাতেই দুশমনদের খতম করে দেবে। পেছনের ব্যবস্থাপনা শক্ত রাখবে। দেশবাসীকে যুদ্ধের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করতে থাকবে। আল্লাহ না করুন যদি তুমি পরাজিত হও, তাহলে নিজের ভুল স্বীকার করে নিয়ে জাতিকে পরাজয়ের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে অবহিত করবে। যুদ্ধে লড়া হয় জনগণের রক্ত ও অর্থে। যুদ্ধে দেশবাসীর সন্তানরাই শহীদ হয়, পঙ্গু হয়। তাই জনগণের সমর্থন নিয়েই কাজ করতে হবে। যুদ্ধকে রাজা বাদশাদের খেলতামাশা মনে করবে না। এটি একটি জাতীয় বিষয়। এতে জাতিকে সাথে রাখতে হবে।
আমি যে ফাতেমী খেলাফতকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলাম, তার সমর্থকরা এখনো আমাদের বিরুদ্ধে তৎপর। আমি জানতে পেরেছি যে, তারা নাকি একজনকে তাদের খলীফা নির্ধারণ করে রেখেছে। তাদের খলীফা আল আজেদ মৃত্যুবরণ করেছে ঠিক; কিন্তু এ আশায় তারা এই খেলাফতকে জীবিত রেখেছে যে, সুদানীরা মিসরে আক্রমণ করবে, আমাদের সৈন্যরা বিদ্রোহ করবে এবং এই সুযোগে খৃস্টানরা গোপনে ভেতরে ঢুকে ফাতেমী খেলাফত পুনর্বহাল করে দেবে। ফাতেমীরা হাসান ইবনে সাব্বাহর ঘাতক দলের সহযোগিতা পাচ্ছে। আমি আলী বিন সুফিয়ানকে সাথে করে নিয়ে যাচ্ছি। তার নায়েব হাসান ইবনে আবদুল্লাহ ও কোতোয়াল গিয়াস বিলবিসকে তোমার সাথে রেখে যাচ্ছি। এরা গুপ্ত বাহিনীর প্রতি নজর রাখবে। তুমি সেনাভর্তি বাড়িয়ে দাও এবং সামরিক মহড়া চালিয়ে যাও।
ইদানীং আমাদের নিকট সংবাদ আসছে যে, মিসরের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকা থেকে ফৌজে লোক পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা এ সংবাদও পেয়েছি যে, সেখানকার জনগণ সেনাবাহিনীর বিপক্ষে চলে গেছে। বলল হাসান ইবনে আবদুল্লাহ।
তার কারণ জানা গেছে কি? জিজ্ঞেস করেন আলী বিন সুফিয়ান।
আমার দুজন গুপ্তচর সে এলাকায় খুন হয়েছে। সেখান থেকে সংবাদ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথাপি আমি নতুন লোক পাঠিয়েছি। জবাব দেন হাসান।
আমার সন্দেহ, সেখানকার মানুষ নতুন কোন প্রোপাগান্ডার শিকার হয়ে পড়েছে। এলাকাটা বড় দুর্গম। মানুষগুলো বড় পাষাণ, বিশ্বাসে নড়বড়ে এবং সন্দেহপ্রবণ। বলল গিয়াস বিলবিস।
সংশয়প্রবণতা বড় এক অভিশাপ। যা হোক, তোমরা এলাকাটার প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখ এবং সেখানকার মানুষগুলোকে সংশয় থেকে রক্ষা করার পদক্ষেপ নাও। বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।
