সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী বললেন, খৃস্টানরা আমাদের এই ঐতিহাসিক দুর্বলতা সম্পর্কে সম্যক অবগত যে, আমরা ব্যক্তি ক্ষমতার সংরক্ষণ ও নিশ্চিতকরণের স্বার্থে সালতানাতের বিশাল অংশও বিসর্জন দিতে পারি। এটাই আমাদের ইতিহাসে পরিণত হতে যাচ্ছে।
তকিউদ্দীন ও আমার বন্ধুগণ! আমি যখন অতীতের প্রতি দৃষ্টিপাত করি এবং যখন বর্তমান যুগের গাদ্দারদের বিশ্বাসঘাতকতা ও চক্রান্তের জাল দেখতে পাই, তখন আমি এই আশংকাবোধ করি যে, একটি সময় আসবে, যখন মুসলমান তাদের ইতিহাসের সাথেও গাদ্দারী করবে। জাতির চোখে ধুলো ছিটিয়ে তারা লিখবে যে, তারাই বীর এবং তারাই দুশমনের নাকে রশি বেঁধে রেখেছে। অথচ তারা হবে দুশমনের তাবেদার। দুশমন হবে তাদের অন্তরঙ্গ বন্ধু। নিজেদের ব্যর্থতা ও পরাজয়ের উপর পর্দা ঝুলিয়ে রাখবে। ইসলামী সম্রাজ্য ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকবে এবং আমাদের স্বঘোষিত খলীফা তার দায়দায়িত্ব অন্যের উপর চাপাতে চেষ্টা করবে। মুসলমানদের একটি বংশধর এমন আসবে, যারা ইসলাম জিন্দাবাদ শ্লোগান দিয়ে। ঈমানী কর্তব্য শেষ করবে। নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে কিছুই তাদের জানা থাকবে না। তাদেরকে একথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার মতও কেউ থাকবে না যে, একদল মানুষ আপন বাড়ীঘর, স্ত্রী-স্বজন ত্যাগ করে দূরে মরু-প্রান্তরে পাহাড়ে-উপত্যকায়, বিদেশ-বিভূইয়ে গিয়ে লড়াই করে ইসলামের অস্তিত্ব ও পতাকা রক্ষা করেছে। তারা বিশাল বিশাল নদী-সমুদ্রে সাঁতার কেটেছিল। আকাশের বিদ্যুৎ-বজ্র, আঁধার-ঝড় কিছুই তাদের গতিরোধ করতে পারেনি। এমন এমন দেশে গিয়ে জীবন বাজি রেখে তারা লড়াই করেছে, যেখানকার পাথর খণ্ডও ছিল তাদের দুশমন। লড়াই করেছে তারা ক্ষুৎপিপাসায় বিনা অস্ত্রে বিনা বাহনে। তারা আহত হয়েছে। কেউ তাদের জখমে পট্টি বাঁধেনি। শহীদ হয়েছে। সঙ্গীরা তাদের জন্য কবর খনন করার সুযোগ পায়নি। তারা রক্ত ঝরিয়েছে নিজেদের। রক্ত ঝরিয়েছে শত্রুদের। আর ঠিক সেই সময়ে কসরে খেলাফতে আসর বসেছিল মদের। নেচে গেয়ে উলঙ্গ সুন্দরী মেয়েরা আনন্দ দিচ্ছিল খলীফা ও তার সাঙ্গদের। ইহুদী ও খৃস্টানরা সোনা আর নারীর রূপ দিয়ে অন্ধ করে দিয়েছিল আমাদের খলীফা ও আমীরদের। খলীফারা যখন দেখলেন যে, দেশের মানুষ সেই অস্ত্রধারী মুজাহিদদের ভক্ত-অনুরক্ত হয়ে যাচ্ছে, যারা ইউরোপ ও ভারত উপমহাদেশে ইসলামের ঝান্ডা উডডীন করেছেন, তখন তারা খলীফাদের টার্গেটে পরিণত হন। ব্যভিচারের ন্যায় অপবাদ আরোপ শুরু হয় তাদের উপর। বন্ধ। করে দেয় সৈন্য ও রসদ সরবরাহ।
এই মুহূর্তে আমার কাসেমের সেই অপরিণত বয়সী ছেলেটির কথা মনে পড়ছে, যে কারো কোন সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া হিন্দুস্তানের শক্তিধর এক শাসককে পরাজিত করেছিল এবং হিন্দুস্তানের বিশাল এক ভূখণ্ড কজা করে নিয়েছিল। ছেলেটি বিজিত এলাকায় এমন সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল যে, হিন্দুরা তার গোলামে পরিণত হয়ে যায় এবং তার স্নেহপূর্ণ সুশাসনে প্রভাবিত হয়ে মুসলমান হয়ে যায়। আমার যখন এই ছেলেটির কথা মনে পড়ে, তখন মনটা আমার ব্যথায় ঝাঁকিয়ে উঠে। কিন্তু তৎকালীন খলীফা তার সাথে কিরূপ আচরণ করলেন? তার উপর ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করলেন এবং অপরাধীর ন্যায় প্রত্যাহার করে নিলেন। বলতে বলতে হিচকি উঠে যায় সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর। বাম্পাচ্ছন্ন হয়ে উঠে তার দুনয়ন। থেমে যান তিনি।
বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ তার রোজনামচায় লিখেছেন
আমার বন্ধু সালাহুদ্দীন আইউবী তার ফৌজের হাজারো শহীদের লাশ দেখলেও বিচলিত হতেন না; বরং তার চোখ-মুখ উদ্দীপ্ত হয়ে উঠত। কিন্তু একজন গাদ্দারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে যখন তার লাশে চোখ ফেলতেন, তখন তার মুখমণ্ডল বিমর্ষ হয়ে উঠত এবং দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়াতে শুরু করত। তেমনি মুহাম্মদ ইবনে কাসিমের কথা বলতে বলতেও তার হিচকি এসে যায় তিনি বারুদ্ধ হয়ে পড়েন। তখন আমি নিজ চোখে দেখেছি যে, তিনি অশ্রু রোধ করার চেষ্টা করছিলেন।
তারপর তিনি বলতে লাগলেন- দুশমন তার কোন ক্ষতি করতে পারেনি। তাকে শহীদ করল তার আপন লোকেরা। দুমশন তাকে বিজেতারূপে বরণ করে নিল আর আপনরা তাকে আখ্যা দিল ব্যভিচারী।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী যিয়াদের পুত্র তারেকের কথাও উল্লেখ করলেন। সেদিন তিনি এতই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন যে, জবান তার থামছিল না যেন। অথচ স্বভাবগতভাবেই তিনি ছিলেন স্বল্পভাষী। ছিলেন বাস্তববাদী। আমরা সকলে নীরব বসে রইলাম। অদ্ভুত এক প্রতিক্রিয়া অনুভব হচ্ছিল আমাদের। সালাহুদ্দীন আইউবী একজন মহান নেতা ছিলেন নিশ্চিত। অতীতকে তিনি কখনো ভুলতেন না। সমকালীন সমস্যা ও সময়ের দাবীর প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। দৃষ্টি তার নিবদ্ধ হয়ে থাকত অনাগত সুদূর ভবিষ্যতের প্রতি।
খৃস্টানদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আমাদের ভবিষ্যতের উপর নিবদ্ধ। খৃস্টান সম্রাট ও শাসকবর্গ বলছে যে, তারা ইসলামকে চিরতরে খতম করে দেবে। তারা আমাদের সাম্রাজ্য দখল করতে চায় না। আমাদের হৃদয়গুলো তারা চিন্তার তরবারী দিয়ে কেটে ক্ষত-বিক্ষত করতে চায়। আমার গোয়েন্দারা আমাকে বলেছে যে, খৃস্টাদের সবচেয়ে কট্টর ইসলাম-দুশমন সম্রাট ফিলিপ অগাস্টাসের বক্তব্য হল, তারা তাদের জাতিকে একটি লক্ষ্য স্থির করে দিয়েছে এবং একটি ধারার প্রবর্তন করে দিয়েছে। এখন তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পর্যায়ক্রমে সে লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যাবে। তারা তরবারীর জোরে লক্ষ্য হাসিল করা প্রয়োজন মনে করে না। তরবারী ছাড়া অন্য অস্ত্রও আছে তাদের কাছে …। তকিউদ্দীন! তাদের দৃষ্টি যেমন ভবিষ্যতের প্রতি, তেমনি আমাদেরও ভবিষ্যতের উপর নজর রাখা দরকার। তারা যেভাবে আমাদের মধ্যে গাদ্দার সৃষ্টি করার ধারা চালু করে দিয়েছে, তেমনি আমাদেরও এমন সব উপায় অবলম্বন করা আবশ্যক, যাতে গাদ্দারীর জীবাণু চিরতরে শেষ হয়ে যায়। গাদ্দারদের হত্যা করতে থাকা কোন প্রতিকার নয়। গাদ্দারীর প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। ক্ষমতার মোহ দূর করে আমাদের রাসূল-প্রেম সৃষ্টি করতে হবে। আর তার জন্য জাতির মনে দুমশনের অস্তিত্বের অনুভূতি থাকতে হবে। মুসলমানদের জানতে হবে যে, খৃস্টানদের সভ্যতায় এমন অশ্লীলতা বিরাজমান, যা চুম্বকের ন্যায় আকর্ষণীয়। বিভিন্ন জাতি আপন ঐতিহ্য ভুলে গিয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে তাদের সভ্যতায়। তাদের ধর্মে মদপান করা বৈধ। মেয়েদের পরপুরুষের সামনে বিবস্ত্র নাচ-গান ও নির্জনে সময় কাটানো সবই সিদ্ধ। আমাদের ও তাদের মধ্যে বড় পার্থক্য এটাই যে, আমরা নারীর ইজ্জতের পাহারাদার আর তারা নারীর ইজ্জতের বেপারী। এই ব্যবধানটাই আজ আমাদের মুসলমান ভাইয়েরা মুছে ফেলতে চায়। তকিউদ্দীন! তোমার যুদ্ধক্ষেত্র দুটি। একটি মাটির উপরে, অপরটি মাটির নীচে। একটি হল দুমশনের বিরুদ্ধে আর অপরটি আপনদের বিরুদ্ধে। আমাদের নিজেদের মধ্যে যদি গাদ্দার না থাকত, তাহলে এ মুহূর্তে আমরা এখানে নয়, বৈঠক করতাম ইউরোপের হৃদপিন্ডে আর খৃস্টানরা আমাদের বিরুদ্ধে সুন্দরী মেয়ের পরিবর্তে ভালো কোন অস্ত্র ব্যবহার করত। আমাদের ঈমানের উত্তাপ যদি তীব্র হত, তাহলে এতদিনে খৃস্টানরা সে উত্তাপে জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে যেত।
