আপন ভাই তকিউদ্দীনের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন সুলতান। দীর্ঘ সফরে তিনি ক্লান্ত পরিশ্রান্ত। সুলতান তাকে বললেন, আমি তোমার চেহারায় চিন্তা ও ক্লান্তি দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু তুমি মুহূর্তের জন্যও আরাম করতে পারবে না। তোমার সফর শেষ হয়নি। শুরু হল মাত্র। আমাকে শিগগিরই শোবক পৌঁছুতে হবে। তেমাকে জরুরী কিছু কথা বলেই রওনা হব।
যাওয়ার আগে আরো একটি সিদ্ধান্ত দিয়ে যাবেন আমীরে মোহতারাম! যাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হল, তাদের বিধবা ও সন্তানের কি হবে? বলল নতুন নগর প্রশাসক।
এদের ব্যাপারেও সেই একই সিদ্ধান্ত, যা পূর্বেকার গাদ্দারদের পরিবার-পরিজনের ব্যাপারে দেয়া হয়েছিল। বিধবাদের ব্যাপারে তদন্ত কর, স্বামীদের ন্যায় তাদেরও কারুর দুশমনের সাথে যোগসাজস আছে কিনা দেখ। স্ত্রী-পূজাও আমাদের মধ্যে অনেক গাদ্দার জন্ম দিয়েছে। দেখনি, সুন্দরী নারী দিয়ে খৃস্টানরা কিভাবে আমাদের ভাইদের ঈমান ক্রয় করে নিয়েছে। এই বিধবাদের মধ্যে যারা সতী-সাধ্বী ও পাক্কা ঈমানদার বলে প্রমাণিত হবে, তাদেরকে তাদের মর্জি-মাফিক বিয়ে দিয়ে দাও। খবরদার! কারো উপর নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিও না। সাবধান! কোন নারী যেন অসহায় হয়ে না পড়ে এবং সম্মানজক ডাল-রুটি থেকে বঞ্চিত না থাকে। তাদের যেন অসহায়ত্ব বোধ করতে না হয়। খেয়াল রাখবে, কোন কুচক্রী মহল যেন একথা তাদের কানে দিতে না পারে যে, তোমাদের স্বামীদের অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। বরং তাদের বুঝাবার চেষ্টা কর, তোমাদের সৌভাগ্য যে তোমরা এরূপ স্বামীদের থেকে মুক্তি পেয়েছ। বিশেষ ব্যবস্থাপনায় তাদের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ করে। দাও। যাবতীয় ব্যয় বহন করবে বাইতুলমাল থেকে। মনে রেখো, গাদ্দারের সন্তান গাদ্দারই হবে এমন কোন কথা নেই। শর্ত হল, তাদের সঠিক শিক্ষা দিয়ে ঈমানদাররূপে গড়ে তুলতে হবে। তোমরা ভুলে যেও না যে, এরা মুসলমানের সন্তান। এদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেন এদের মনে কোন প্রকার অসহায়বোধ জাগতে না পারে। খবরদার! পিতার পাপের কাফফারা যেন সন্তানদের আদায় করতে না হয়। জবাব দেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।
***
শোবক রওনা হওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। তিনি ভাবছেন, পাছে তার অনুপস্থিতিতে খৃস্টানরা হামলা করে বসে কিনা। নূরুদ্দীন জঙ্গীর প্রেরিত বাহিনী ময়দানে পৌঁছে গেছে। কায়রোর বাহিনীও এগিয়ে যাচ্ছে সেদিকে। উভয় বাহিনীকে এলাকা ও পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে পরিচিত করে তুলতে হবে। নিজ দফতরে গিয়ে বসেন সুলতান। ডেকে পাঠান ভাই তকিউদ্দিন, আলী বিন সুফিয়ান, আলীর নায়েব হাসান ইবনে আবদুল্লাহ, কোতোয়াল গিয়াস বিলবিস এবং আরো কয়েকজন নায়েব-কর্মকর্তাকে। বেশিরভাগ উপদেশ প্রদান করেন ভাই তকিউদ্দীনকে। প্রথমে বৈঠকে তিনি ঘোষণা দেন, আমার অনুপস্থিতিতে আমার ভাই তকিউদ্দিন আমার স্থলাভিষিক্ত হবে এবং মিসরে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব পালন করবে। তার ঠিক ততটুকু ক্ষমতা থাকবে, যতটুকু ছিল সালাহুদ্দীন আইউবীর।
তকিউদ্দীন! আজ থেকে মন থেকে ঝেড়ে ফেল যে, তুমি সালাহুদ্দীন আইউবীর ভাই। অযোগ্যতা, অসততা, অবহেলা, গাদ্দারী, ষড়যন্ত্র কিংবা কোন অন্যায়-অবিচারে যদি লিপ্ত হও, তাহলে তোমাকেও সেই শাস্তিই ভোগ করতে হবে, যা শরীয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। তকিউদ্দীনের প্রতি দৃষ্টিপাত করে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।
আমি আমার কর্তব্য সম্পর্কে পরিপূর্ণ সচেতন আছি মোহতারাম আমীরে মেসের! মিসরের বিরাজমান সমস্যা সম্পর্কে আমি পূর্ণ ওয়াকিফহাল। অবনত মস্তকে বললেন তকিউদ্দীন।
শুধু মিসরই নয়, সমগ্র সালতানাতে ইসলামিয়া এই হুমকির সম্মুখীন। ইসলামের প্রসার ও ইসলামী সাম্রাজ্যের বিস্তারে এসব সমস্যা বিরাট এক প্রতিবন্ধক। তোমাকে স্মরণ রাখতে হবে, সালতানাতে ইসলামিয়ার কোন একটি ভূখণ্ড কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষের জমিদারী নয়। এর মালিক আল্লাহ। তোমরা এর পাহারাদার মাত্র। এর প্রতিটি অণু-পরমাণু তোমাদের হাতে আমানত। এর এক মুষ্ঠি মাটিও যদি তোমাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়, তাহলে আগে ভেবে দেখ, তুমি অন্যের হক নষ্ট করছ কিনা, আল্লাহর আমানতের খেয়ানত হচ্ছে কিনা। আমার কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শোন তকিউদ্দীন! ইসলামের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য এই যে, তার অনুসারীদের মধ্যে গাদ্দার ও কুচক্রী মানুষের সংখ্যা অনেক। মুসলমান যত গাদ্দার জন্ম দিয়েছে, এত আর কোন জাতি দেয়নি। আমাদের আল্লাহর পথে জিহাদের গৌরবময় ইতিহাস গাদ্দারীর ইতিহাসে পরিণত হতে চলেছে। স্বজাতি ও স্বধর্মের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে বেড়ানো যেন আমাদের ঐতিহ্যের রূপ ধারণ করেছে। আলী বিন সুফিয়ানকে জিজ্ঞেস কর তকি! আমাদের যেসব গুপ্তচর খৃস্টানদের এলাকায় দায়িত্ব পালন করছে, তাদের রিপোর্ট হল, খৃস্টান সম্রাটগণ, ধর্মীয় নেতৃবর্গ ও সচেতনমহল ইসলামের এই দুর্বলতা সম্পর্কে অবহিত যে, মুসলমান নারী আর ক্ষমতার লোভে নিজ ধর্ম, দেশ ও জাতির সিংহাসন উল্টিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না।
সভাসদ সকলের প্রতি একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন সুলতান। বললেন, আমাদের গোয়েন্দারা জানিয়েছে যে, খৃস্টানরা তাদের গুপ্তচরদের ধারণা দিয়েছে, মুসলমানদের ইতিহাস যতটা বিজয়ের, ততটা গাদ্দারীরও বটে। তারা যে পরিমাণ গাদ্দার জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছে, সে পরিমাণ বিজয় তারা অর্জন করতে পারেনি। তাদের রাসূলের ওফাতের পরপরই খেলাফতের দখলদারিত্ব নিয়ে মুসলমানরা পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত হয়। ক্ষমতার স্বার্থে তারা একে অপরকে হত্যা করে। কেউ খলীফা বা আমীর নিযুক্ত হলে নিজের মসনদের জন্য হুমকি হতে পারে এমন লোকদের অবলীলায় হত্যা করে। এমনকি প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য তারা শত্রুদের নিকট থেকে পর্যন্ত সহযোগিতা গ্রহণ করতে দ্বিধা করেনি। পারস্পরিক সংঘাতে তাদের জাতীয় ঐতিহ্য বিনষ্ট হয়েছে। রয়ে গেছে শুধু ব্যক্তিগত ক্ষমতার দাপট। থেমে গেছে তাদের সাম্রাজ্য বিস্তারের ধারা।
