তথ্য সংগ্রহের জন্য আলী বিন সুফিয়ান খৃস্টান অফিসারদের হাসান ইবনে আবদুল্লাহর হাতে সোপর্দ করেন এবং নিজে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সাথে শোবক রওনা হয়ে যান।
২.৪ ভয়ংকর ষড়যন্ত্র
ভয়ংকর ষড়যন্ত্র
বেঈমান-গাদ্দারের অপবিত্র খুন কায়রোর বালুকাময় জমিন চুষে নেয়নি এখনো। তার আগেই দুশ অশ্বারোহী নিয়ে কায়রো এসে পৌঁছেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ভাই তকিউদ্দীন। সুলতান আইউবী শিরচ্ছেদ করেছেন ষড়যন্ত্রকারী আমলাদের। মনে হচ্ছিল, কায়রোর মাটি এই মৃত মুসলমানদের খুন চুষে নিয়ে নিজের বুকে স্থান দিতে বিব্রতবোধ করছে, যারা খৃস্টানদের সাথে যোগ দিয়ে সালতানাতে ইসলামিয়ার পতাকাকে ভূলুণ্ঠিত করার ষড়যন্ত্র করছিল।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী লাশগুলো দেখলেন। কর্তিত মস্তকগুলোকে রেখে দেয়া হয়েছে নিষ্প্রাণ দেহগুলোর বুকের উপর। অবিচ্ছিন্ন রয়েছে মাত্র একটি মস্তক। এটিই সবচে বড় গাদ্দারের লাশ, যার উপর পরিপূর্ণ ও অখণ্ড আস্থা ছিল সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর। একটি তীর লোকটির ধমনীতে ঢুকে গিয়ে অপরদিক দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল। এটিই কায়রোর নগর প্রশাসক মোসলেহুদ্দীনের লাশ। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী যখন তাকে হাজির করে সেনাবাহিনীকে তার অপরাধের বিবরণ দিচ্ছিলেন, তখন ইসলাম-প্রেমী উত্তেজিত এক সৈনিক একটি তীর ছুঁড়ে তার ধমনী এফোঁড়-ওফোড় করে দিয়েছিল। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী সৈনিকের এই বেআইনী আচরণ্য ছিল সামরিক আইনের পরিপন্থী- এ জন্য ক্ষমার চোখে দেখলেন যে, কোন ঈমানদারই ইসলামের বিরুদ্ধে গাদ্দারী বরদাশত করতে পারে না। সৈনিকদের মধ্যে এই ঈমানী জযবা সুলতান আইউবী নিজেই সৃষ্টি করেছেন।
লাশগুলো দেখে সুলতান আইউবীর চেহারায় এতটুকু খুশীর ঝলকও পরিলক্ষিত হল না যে, প্রশাসনের এতগুলো গাদ্দার কুচক্রী ধরা পড়ল এবং তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হল। উল্টো তাকে বিমর্ষ মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, যেন তার কান্না পাচ্ছে। উদগত অশ্রু ঠেকাবার চেষ্টা করছেন তিনি। মনে তার প্রচণ্ড ক্ষোভ, যার প্রকাশ তিনি করেছিলেন এভাবে
এদের কারো জানাযা পড়া হবে না। লাশগুলো তাদের আত্মীয়-স্বজনের হাতে দেয়া যাবে না। লাশগুলো রাতের আঁধারে কোন এক গভীর গর্তে নিয়ে ফেলে মাটিচাপা দিয়ে সমান করে রেখে আস। পৃথিবীতে এদের নাম-চিহ্নও যেন অবশিষ্ট না থাকে।
আমীরে মোহতারাম! কোতোয়াল এবং সাক্ষীদের জবানবন্দী ও বিচারকের রায় লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষণ করা দরকার, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ অভিযোগ উত্থাপন করতে না পারে যে, এটি একক কারো রায় ছিল। স্বীকার করি, আপনার ফয়সালা যথার্থ। আপনি অতি ন্যায়সঙ্গত বিচার করেছেন। কিন্তু আইনের দাবী অন্যকিছু। বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সুহৃদ ও একান্ত বিশ্বস্ত কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ।
যারা কাফিরদের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে আল্লাহর দ্বীনের মূলোৎপাটনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, আল্লাহর বিধান তাদেরকে এই সুযোগ প্রদান করার অনুমতি দেয় কি যে, তারা আইনের সামনে দাঁড়িয়ে আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সাঃ) ও ঈমানদারদের ইজ্জতের অতন্দ্র প্রহরীদের মিথ্যা প্রতিপন্ন করুক? আমি যদি অবিচার করে থাকি, তাহলে এতগুলো মানুষ হত্যার দায়ে আমাকে মৃত্যুদণ্ড দাও এবং আমার মৃতদেহটা জনবসতি থেকে বহুদূরে কোন এক মরু প্রান্তরে নিয়ে ফেলে আস। শৃগাল-শকুনরা আমার লাশটা খেয়ে আমাকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলুক। কিন্তু আমার বন্ধুগণ! আমাকে শাস্তি দেয়ার আগে তোমরা পবিত্র কুরআনটা আলিফ-লাম-মীম থেকে ওয়ান্নাস পর্যন্ত পড়ে নিও। আর শাস্তি যদি দিতেই হয়, তাহলে আমার গর্দান উপস্থিত। আবেগাপ্লুত অথচ অতীব গুরুগম্ভীর কণ্ঠে উপস্থিত কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।
আপনি অবিচার করেননি মহান সেনাপতি কাজী শাদ্দাদ আসলে বলতে চেয়েছিল, পাছে আইনের অবমাননা হয়ে না যায় যেন। বলল একজন।
আমি বুঝতে পেরেছি। উদ্দেশ্য তার আয়নার মত পরিষ্কার। আমি আপনাদের শুধু এ কথাটাই বলতে চাই যে, গবর্নর যদি ব্যক্তিগতভাবে নিশ্চিত জানেন যে, অভিযুক্ত সত্যিই গাদ্দারীর অপরাধে অপরাধী, তাহলে তার কর্তব্য সাক্ষ্য-প্রমাণ ও অন্যান্য আইনী ঝামেলায় না জড়িয়ে আসামীকে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা। অন্যথায় বুঝতে হবে,গবর্নর নিজেও গাদ্দার। অন্তত অযোগ্য এবং বেঈমান তো অবশ্যই। আমি আশংকা করছি, যদি এদের বিচারকের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতাম, তাহলে এরা উল্টো আমাকেই অপরাধী সাব্যস্ত করে বসত। আমার বক্তব্য স্পষ্ট। তোমরা আমাকে গাদ্দারদের সারিতে দাঁড় করিয়ে দাও। দেখবে, আল্লাহর কুদরতী হাত আমাকে তাদের থেকে আলগা করে ফেলবে। তোমাদের হৃদয় যদি কাবার প্রভূর আলোতে উদ্ভাসিত হয়ে থাকে, তাহলে পাপিষ্ঠদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে ভয় কর না। তথাপি বন্ধু বাহাউদ্দিন শাদ্দাদ যে পরামর্শ দিয়েছেন, তোমরা তা বাস্তবায়ন করে ফেল। কাগজপত্র প্রস্তুত করে মাননীয় বিচারপতির স্বাক্ষর নিয়ে রাখ। লিখবে, আমীরে মেসের- যিনি মিসর সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতিও বটে- নিজের বিশেষ ক্ষমতাবলে এই অপরাধীদের যে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে, এদের অপরাধ সন্দেহাতীতরূপে প্রমাণিত।
