আরো একটি হুকুম জারি করে সবাইকে স্তম্ভিত করে দেন সুলতান। তিনি আদেশ করেন, এ ফৌজ এখান থেকে সরাসরি ময়দানে রওনা করবে। তোমাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র, সরঞ্জামাদি ও রসদপাতি পরে আসবে। এর অর্থ মিসরে কোন সৈন্য থাকছে না।
বাহিনী রওনা হয়ে যায়।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী গাদ্দারদের কর্তিত মস্তকগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে দেখেন। একজনের সাথে কথা বলতে গিয়ে ফুঁপিয়ে উঠেন তিনি। বেদনার অশ্রুতে ঝাপসা হয়ে আসে তাঁর নয়নযুগল। তিনি পোশাক পরিধান করেন এবং একদিকে হাঁটা দেন। হাঁটতে হাঁটতে সাথের কর্মকর্তাদের বললেন, আমার আশংকা হচ্ছে এই যে, দুশমনরা মিল্লাতে ইসলামিয়ায় এমনিভাবে গাদ্দার সৃষ্টি করতেই থাকবে এবং এমন দিন এসে যাবে, তখন যারা গাদ্দারদের শিরচ্ছেদ করবে, তারাও দুশমনকে বন্ধু ভাবতে শুরু করবে। আমার বন্ধুগণ! তোমরা যদি ইসলামকে সমুন্নত দেখতে চাও, তাহলে বন্ধু-শত্রুকে চিনতে শেখ।
মিসর খালি রেখে সেনা বাহিনীকে রণাঙ্গনে প্রেরণ করার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী
এ বাহিনীটি এখানে অবসর বসে ছিল। তাদেরকে কাজে ব্যস্ত রাখার উদ্দেশ্যে আমি এ আদেশ জারি করলাম। আমি আদেশ দিয়ে গিয়েছিলাম যে, সৈন্যদের যেন অবসর রাখা না হয়, সামরিক মহড়া চালু রাখা হয়। সৈন্যদের শহর থেকে দূরে কোথাও নিয়ে গিয়ে মাঝে-মধ্যে যুদ্ধাবস্থায় রাখা হয় এবং মানসিক প্রশিক্ষণও অব্যাহত রাখা হয়। কিন্তু আমার এ আদেশ পালন করা হয়নি। দায়িত্বশীল দুজন কর্মকর্তাকে আমি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছি। তারা চক্রান্ত করে সৈন্যদের নিষ্ক্রিয় রেখেছিল। অবসর পেয়ে সৈন্যরা মদ-জুয়ায় মন ভুলাতে এবং শত্রুর প্রোপাগান্ডায় কান দিতে শুরু করেছিল। আর তোমরা সম্ভবত ভাবছ যে, মিসরে এখন সৈন্য নেই। না, ভাবনার কিছু নেই। সৈন্য আসছে। আমার যে বাহিনী শোবক জয় করেছিল, তারা কায়রো ঢুকে গেছে। আমার পেছনে পেছনেই তাদের রওনা করানো হয়েছিল। তারা দুশমনকে এবং দুশমনের পাপাচারকে খুব কাছে থেকে দেখে এসেছে। তাদের হৃদয়কে কেউ বিদ্রোহী বানাতে পারবে না। শহীদের রক্তের সাথে তারা বেঈমানী করবে না। আর এখান থেকে যাদের প্রেরণ করা হল, তারা হয়ত কার্কের উপর হামলা চালাবে অথবা দুশমন তাদের উপর হামলা করবে। এ প্রক্রিয়ায় তারাও দুশমন চিনে ফেলবে। তোমরা মনে রেখ, যে সিপাহী দুশমনের চোখে চোখ রেখে একবার লড়াইয়ে লিখ হয়, কোন লালসা তাকে গাদ্দার বানাতে পারে না।
নুরুদ্দীন জঙ্গী ও নিজ ভাই তকিউদ্দীনের কাছে দূত প্রেরণ করে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী গোপনে কায়রোর উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন। নায়েবদের সাবধান করে দিয়ে যান যে, তার অনুপস্থিতির খবর যেন কেউ জানতে না পারে। রওনার সময় বলে যান, সুলতান জঙ্গী অবশ্যই সাহায্য পাঠাবেন। তিনি যে পরিমাণ সৈন্য পাঠাবেন, আমাদের ঠিক সে পরিমাণ সৈন্য এখান থেকে কায়রো পাঠিয়ে দেবে। বলে দেবে যেন পথে বেশি বিরতি না দেয়। তাতে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর উদ্দেশ্য ছিল দুটি। প্রথমতঃ মিসরের সৈন্যরা সত্যই যদি বিদ্রোহী হয়ে থাকে, তাহলে এরা সেই বিদ্রোহ দমন করবে। দ্বিতীয়তঃ মিসরের পরিস্থিতি যদি অনুকূল থাকে, তাহলে মিসরের ফৌজ ময়দানে চলে আসবে আর ময়দানের ফৌজ মিসর ফিরে যাবে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর কায়রো উপস্থিতির সংবাদও গোপন রাখা হয়। রাতারাতি তিনি যায়নুদ্দীনের চিহ্নিত গাদ্দারদের ঘুমন্ত অবস্থায়ই গ্রেফতার করান এবং আরো কয়েকটি স্থানে তল্লাশি চালান। ফাতেমার অপহরণকারী হাশীশী তিনজন কয়েকজন নাগরিকের নাম বলেছিল। গ্রেফতার করা হয় তাদেরও। পদমর্যাদার তোয়াক্কা করা হয়নি কারো।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর নির্দেশ মোতাবেক ফাতেমাকে যায়নুদ্দীনের হাতে তুলে দেয়া হয় এবং উপযুক্ত পাত্র দেখে মেয়েটিকে বিবাহ দিয়ে দিতে বলা হয়। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর এবার তকিউদ্দীনের অপেক্ষা করার পালা।
.
তিনদিন পর দুশ আরোহীসহ এসে উপস্থিত হন তকিউদ্দীন। মিসরের সার্বিক পরিস্থিতি, ঘটনা প্রবাহ এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচী সম্পর্কে অবহিত করে তাকে মিসরের ভারপ্রাপ্ত গবর্নর নিযুক্ত করেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। বলে দেন সুদানীদের প্রতি কড়া নজর রাখতে। প্রয়োজনে আক্রমণ করার অনুমতিও প্রদান করেন।
এবার শোবক অভিমুখে রওনা হতে উদ্যত হন সুলতান। ঠিক এমন সময়ে আলী বিন সুফিয়ান বলে উঠলেন, কার্কের খৃস্টানরা আপনার জন্য কিছু হাদিয়া প্রেরণ করেছে। অনুরোধ করছি, একটু অপেক্ষা করুন, মহামূল্যবান হাদিয়াগুলো এক নজর দেখে যান। বলেই সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে বিস্ময়ের মধ্যে ফেলে রেখে আলী বিন সুফিয়ান বাইরে বেরিয়ে যান। আমার সাথে আসুন বলে সুলতানকেও বেরিয়ে আসতে ইশারা দেন।
ঘোড়ায় চড়ে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী আলী বিন সুফিয়ানের সাথে এগিয়ে চলেন। সামান্য অগ্রসর হয়েই সুলতান দূর ময়দানে কতগুলো ঘোড়া দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। জিন বাঁধা প্রতিটি ঘোড়ার পিঠে। পাঁচশ ঘোড়া। পার্শ্বেই দণ্ডায়মান রশিবাধা আটজন খৃস্টান। প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি সীমান্তরক্ষী বাহিনী। বিস্মিত কণ্ঠে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী জিজ্ঞেস করলেন, এসব ঘোড়া কোথা থেকে আসল? আলী বিন সুফিয়ান এক ব্যক্তিকে ডেকে এনে সুলতানের সম্মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললেন, এ আমার গুপ্তচর। তিন বছর পর্যন্ত লোকটি প্রকাশ্যে খৃস্টানদের হয়ে গোয়েন্দাগিরি করে আসছে। এর দায়িত্ব ছিল খৃস্টান ও সুদানীদের মাঝে সংবাদ আদান-প্রদান করা। তারা একে তাদেরই গুপ্তচর বলে জানে। সম্প্রতি কার্ক গিয়ে খৃস্টান সম্রাটদের নিকট সুদানীদের পয়গাম পৌঁছায় যে, তাদের পাঁচশ ঘোড়া ও পাঁচশ জিনের প্রয়োজন। খৃস্টানরা চাহিদা অনুযায়ী ঘোড়া ও জিন এই আটজন সেনা অফিসারসহ প্রেরণ করে। এরা সেই সুদানী বাহিনীর নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছিল, যাদের মিসর আক্রমণে প্রস্তুত করা হচ্ছে। আমার সিংহ এদের উত্তর দিক থেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এক ফাঁদে এনে আটকে ফেলে এবং আমাদের এই সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে সংবাদ পাঠায়। তারা এলে লোকটি নিজের পরিচয় প্রদান করে এবং তাদের সহযোগিতায় ঘোড়াগুলো ও খৃস্টান সেনা অফিসারদের হাঁকিয়ে কায়রো নিয়ে আসে।
