***
তিন অথবা চার দিন পর।
ভোরের আলো এখনো পুরোপরি ফুটে উঠেনি। কায়রো অবস্থানরত সৈন্যরা ময়দানে সমবেত হওয়ার আদেশ পায়। সৈন্যদের মধ্যে কানাগুষা শুরু হয় যে, ব্যাপার কি? কেউ বলল, বিদ্রোহ হবে। কারো ধারণা, সুদানীদের হামলা আসছে। তাদের কমান্ডার পর্যন্ত জানে না এই সমাবেশের হেতু কি? নির্দেশটি জারী হয়েছে সেনাবাহিনীর কেন্দ্র থেকে।
সুবিন্যস্তভাবে সৈন্যরা ময়দানে এসে সমবেত হয়। সঙ্গে সঙ্গে একদিক থেকে ছুটে আসে সাতটি ঘোড়া। দেখে সকলে বিস্ময়ে হতবাক! কারণ, সামনের জন স্বয়ং সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। অথচ, তারা জানে, সুলতান শোবকে।
অদ্ভুত এক ভঙ্গিমা দেখালেন সুলতান। পরনের পাজামাটা ছাড়া সব খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। খুলে ফেলে দিলেন মাথার শিরস্ত্রাণও। সৈন্যদের সারির সম্মুখ দিয়ে হেলে-দুলে এগিয়ে গেল ঘোড়া। তারপর মোড় ঘুরিয়ে আবার সকলের সম্মুখে এসে উচ্চস্বরে সুলতান আইউবী বললেন, আমার শরীরে তোমরা কেউ কোন জখম দেখতে পাচ্ছ? আমি মরে গেছি না জীবিত আছি?
আমীরে মেসেরের হায়াত দীর্ঘ হোক। আমরা শুনতে পেয়েছিলাম যে, আপনি আহত হয়েছেন এবং আপনার অবস্থা আশংকাজনক। বলল এক উষ্ট্রারোহী।
এ সংবাদটা যখন মিথ্যা প্রমাণিত হল, তখন বাকী সেইসব গুজবও সত্য নয়, যা তোমাদের কানে দেয়া হয়েছে। বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। কথাটা তিনি এত উচ্চস্বরে বললেন যে, এর আওয়াজ শেষ সারি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তিনি বললেন, যেসব মুজাহিদের ব্যাপারে তোমাদের বলা হয়েছিল যে, তারা শোবকে সোনা-রূপা আর খৃস্টান ললনাদের নিয়ে আয়েশ করছে, তারা মূলত বালুকাময় মরুপ্রান্তরে পরবর্তী দুর্গ, তার পরের দুর্গ এবং তারও পরের দুর্গ জয় করার প্রস্তুতি নেয়ার কাজে পাগলের মত হয়ে আছে। তাদের রীতিমত খাবার পানিও জুটছে না। কেন? তার কারণ, খৃস্টান হায়েনাদের হাত থেকে তারা তোমাদের মা-বোন-কন্যাদের ইজ্জত রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। শোবকে আমরা মুসলমান কন্যা ও তাদের মা-বাবাদের অবস্থা যা দেখেছি, তাহল, কন্যাদের রাত কাটছে খৃস্টানদের শয্যায় আর তাদের মা-বাবারা ধুকে ধুকে মরছে খৃস্টানদের বেগার খেটে। কার্ক, জেরুজালেম ও ফিলিস্তীনের খৃস্টান নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতে বর্তমানে মুসলমানদের এই একই করুণ অবস্থা বিরাজ করছে। সেখানকার মসজিদগুলো এখন আস্তাবল। কুরআনের পবিত্র পাতা অলিতে গলিতে পিস্ট হচ্ছে খৃস্টানদের পায়ের তলায়।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর এই তেজস্বী ও স্পর্শকাতর বক্তৃতা শুনে কমান্ডার চিৎকার করে উঠল, তারপরও আমরা এখানে বসে থাকি কেন? আমাদেরও কেন ময়দানে পাঠানো হচ্ছে না?
তোমাদেরকে এখানে এ জন্যে বসিয়ে রাখা হয়েছে যে, তোমরা দুশমনের প্রোপাগান্ডা শুনে শুনে কান ভারি করবে এবং নির্দ্বিধায় তা বিশ্বাস করবে। এখানে বসে বসে তোমরা নিজেদের পতাকার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে, যাতে সুদানীদের সহযোগিতায় খৃস্টানরা এই ভূখন্ডে দখল প্রতিষ্ঠা করতে এবং তোমাদের বোন কন্যাদের সম্ভম বিনষ্ট করতে পারে। পবিত্র কুরআনকে তোমরা নিজের হাতে ধরে কেন বাইরে নিক্ষেপ করছ না? কেন তোমরা পবিত্র কুরআনের অবমাননা খৃস্টানদের হাতে করাতে চাচ্ছ? তোমরা যারা নিজেদের ঈমানের হেফাজত করতে পার না, তারা জাতির ইজ্জতের হেফাজত কিভাবে করবে? গম্ভীর কণ্ঠে বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।
সুলতানের এই জবাবে সমগ্র বাহিনীতে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়ে যায়। অবশেষে সুলতান বললেন, এখানে তোমরা কয়েকজন কমান্ডারকে দেখতে পাচ্ছ না। আমি তাদেরকে তোমাদের দেখাচ্ছি। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী একদিকে ইশারা করলেন। গলায় রশি লাগানো দুহাত পিঠমোড়া করে বাঁধা দশ-এগার ব্যক্তিকে সেদিক থেকে নিয়ে আসা হল। সৈন্যদের সারির সম্মুখ দিয়ে তাদের নিয়ে যাওয়া হল। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ঘোষণা করলেন, এরা তোমাদের কমান্ডার ছিল। কিন্তু এরা সেই জাতির বন্ধু, যারা তোমাদের রাসূল ও তোমাদের কুরআনের দুশমন। এরা এখন বন্দী।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী খিজরুল হায়াতের হত্যাকাণ্ড এবং মোসলেহুদ্দীনের গ্রেফতারির বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করেন। মোসলেহুদ্দীনকে সকলের সামনে নিয়ে আসা হল। লোকটি এখনও পাগলপ্রায়। গত রাতে কোতোয়ালীর পাতাল কক্ষে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী লোকটাকে দেখে এসেছেন। সুলতানকে চিনেনি মোসলেহুদ্দীন। স্বপ্নের সাম্রাজ্য আর নিজের ক্ষমতার কথা উল্লেখ করে করে স্বগতোক্তি করছিল সে। এবার ঘোড়ায় বসিয়ে তাকে সেনাবাহিনীর সম্মুখে উপস্থিত করেন সুলতান। সৈন্যদের প্রতি চোখ বুলিয়ে সে বলে উঠে, তোমরা আমার ফৌজ। তোমরা মিসরের সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ফেল। আমি তোমাদের সম্রাট। সালাহুদ্দীন আইউবী মিসরের দুশমন। তোমরা তাকে হত্যা করে ফেল…।
এক নাগাড়ে বলেই যাচ্ছে মোসলেহুদ্দীন। পাগলের মুখ থেকে যেভাবে ফেনা বের হয়, তেমনি তার মুখে থেকেও ফেনা বেরুচ্ছে। হঠাৎ একটি শা শব্দ ভেসে এল ফৌজের মধ্য থেকে। একটি তীর এসে বিদ্ধ হয় মোসলেহুদ্দীনের ধমনীতে। লুটিয়ে পড়ার উপক্রম হয় তার রক্তাক্ত দেহ। ছুটে আসে আরো কয়েকটি তীর। বিদ্ধ হয় তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে। চীৎকার করে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী নিবৃত্ত করেন তীরন্দাজদের। তীরন্দাজদের সামনে বেরিয়ে আসতে আদেশ করেন কমান্ডারগণ। তারা বলে, আমরা একজন গাদ্দারকে হত্যা করেছি। এ হত্যা যদি অন্যায় হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের গর্দানগুলো উপস্থিত। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী তাদের ক্ষমা করে দেন। সুলতানের পরনে এখনো শুধু পাজামা, বাকী শরীর উন্মুক্ত। তিনি জল্লাদকে কাছে ডাকেন। অবশিষ্ট গাদ্দারদের তার হাতে তুলে দিয়ে তাদের মস্তকগুলো দেহ থেকে ছিন্ন করিয়ে দেন।
