গিয়াস বিলবিস ও হাসান পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেন যে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে পরিস্থিতি সম্পর্কে এখনই সংবাদ দেয়া প্রয়োজন। তার জন্য যায়নুদ্দীন আলীকেই নির্বাচন করা হল এবং বারজন অশ্বারোহীর মোহাফেজ বাহিনীর সাথে সেদিনই তাকে শোবকের উদ্দেশ্যে রওনা করা হল।
***
তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় শোবক পৌঁছে যায় কাফেলা। যায়নুদ্দীনকে দেখে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী যেমন বিস্মিত হন, তেমনি হন আনন্দিত। এই ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে পূর্ব থেকেই তিনি অবহিত ছিলেন। বুকে জড়িয়ে ধরেন একজন অপরজনকে। যায়নুদ্দীন বললেন, আমি ভালো সংবাদ নিয়ে আসিনি। রাজকোষ পরিচালক খিজরুল হায়াত খুন হয়েছেন। নগর প্রশাসক মোসলেহুদ্দীন তার ঘাতক। গিয়াস বিলবিস তাকে গ্রেফতার করে কোতোয়ালীতে আটকে রেখেছেন।
সংবাদ শুনে বিবর্ণ হয়ে যান সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। যায়নুদ্দীন সুলতানকে সান্ত্বনা দেন এবং মিসরের বর্তমান পরিস্থিতির বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করেন। মিসরে অবস্থানরত সৈন্যদের সম্পর্কে তিনি বললেন, তাদের মধ্যে অস্থিরতা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। গুজব রটানো হয়েছে যে, সুলতান শোবক-বিজয়ী সৈন্যদের বিপুল সোনা রূপা দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন এবং তাদের মাঝে খৃস্টান মেয়েদেরকে ভাগ-বাটোয়ারা করে দেয়া হয়েছে। মিসরের সৈন্যদের মনে এই ভীতি সৃষ্টি করা হয়েছে যে, বিশাল এক সুদানী বাহিনী মিশর আক্রমণ করতে যাচ্ছে, যার মোকাবেলা করা স্বল্পসংখ্যক মিসরী সৈন্যদের পক্ষে সম্ভব হবে না। সুদানীরা মিসরী বাহিনীর সব সৈন্যকে হত্যা করার পরিকল্পনা নিয়ে আসছে এবং সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীও এমনটিই কামনা করছেন। তাছাড়া এই গুজবও ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে যে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী রণাঙ্গনে গুরুতর আহত হয়েছেন এবং তার অবস্থা আশংকাজনক। কমান্ডার তার মন মত কাজ করছে। যায়নুদ্দীন জানান, আপনার আহত হওয়ার সংবাদ এমনভাবে ছড়ানো হয়েছে যে, এ ব্যাপারে মিসরীদের মনে কোন সংশয় নেই। ফলে মোসলেহুদ্দীনের ন্যায় একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি খৃস্টানদের মদদে মিসরকে খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত করার এবং নিজের ক্ষমতা পাকাঁপোক্ত করার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে।
কালবিলম্ব না করে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী অতি বিচক্ষণ একজন দূতকে ডেকে পাঠান এবং সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গীর নামে একটি পয়গাম লিখে তাতে মিসরের সঠিক পরিস্থিতির বিবরণ তুলে ধরেন ও সামরিক সাহায্য প্রার্থনা করেন। পত্রে সুলতান লিখেছেন
আমি যদি এখানেই থেকে যাই, তাহলে মিসর হাতছাড়া হয়ে যাবে। আর যদি মিসর চলে যাই, তাহলে শোবকের বিজয় পরাজয়ে পরিণত হবে। উদ্ধারকৃত অঞ্চল কোনক্রমেই হাতছাড়া করা যাবে না। আমি এখানেই থাকব, নাকি মিসর চলে যাব, তা এখনো স্থির করতে পারিনি…।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী দূতকে বলে দেন যে, তুমি দিন-রাত ঘোড়া হাঁকাতে থাকবে। ঘোড়া ক্লান্ত হয়ে গেলে সামনে যাকেই পাবে, তার থেকে ঘোড়া বদল করে নেবে। দিতে না চাইলে তাকে হত্যা করে নিয়ে যাবে। সুলতান তাকে এই নির্দেশনাও প্রদান করেন যে, পথে দুশমনের কবলে পড়ে গেলে বেরিয়ে যাওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করবে। ধরা পড়ে গেলে পত্রখানা মুখে দিয়ে গিলে ফেলবে। পত্রটি কোনক্রমেই যেন দুশমনের হাতে না যায়।
দূত রওনা হয়ে যায়।
সুলতান অনুরূপ আরো একজন দূতকে ডেকে আনলেন। আপন ভাই তকিদ্দীনের নামে একখানা পত্র লিখে অনুরূপ নির্দেশনা দিয়ে তাকে প্রেরণ করেন। এই পত্রে তিনি ভাই তকিউদ্দীনকে লিখলেন—
তোমার নিকট যা কিছু সম্পদ আছে, যত সৈন্য সংগ্রহ করতে পার, নিয়ে এই মুহূর্তে ঘোড়ায় চড় এবং কায়রো পৌঁছে যাও। পথে অযথা সময় নষ্ট কর না। তোমার সাথে আমার সাক্ষাৎ কোথায় হবে এ মুহূর্তে আমি বলতে পারছি না। আদৌ হবে কিনা তাও জানিনা। যদি কায়রোতে আমার সাক্ষাৎ না পাও কিংবা যদি আমার মৃত্যু সংবাদ পাও, তাহলে মিসরের শাসন-ক্ষমতা হাতে তুলে নিও। মিসর বাগদাদের খেলাফতের একটি সাম্রাজ্য। আর মহান আল্লাহ এ সাম্রাজ্যের শাসনভার ন্যাস্ত করেছেন আইউবী বংশের উপর। রওনা হওয়ার পূর্বে আব্বাজানের সঙ্গে দেখা করবে এবং অবনত মস্তকে আবেদন জানাবে, তিনি যেন তোমার পিঠে হাত বুলিয়ে দেন। আম্মাজানের কবরে ফাতেহা পাঠ করে তার আত্মা থেকে দোয়া নিয়ে আসবে। আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। আমি যেখানেই থাকি ইসলামের ঝান্ডা অবনমিত হতে দেব না। তুমি মিসরে ইসলামের ঝান্ডাকে বুলন্দ রাখ।
এই দূতও রওনা হয়ে যায়।
.
প্রথম দূত যখন নূরুদ্দীন জঙ্গীর নিকট গিয়ে পৌঁছে, তখন তার বাম বাহু তরবারীর আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত এবং পিঠ তীরবিদ্ধ। লোকটি সুলতান জঙ্গীর পায়ের উপর লুটিয়ে পড়ে। জঙ্গীর হাতে পত্ৰখানা তুলে দিয়ে সে শুধু এতটুকু বলতে সক্ষম হয় যে, পথে শক্রর কবলে পড়ে গিয়েছিলাম। আল্লাহর রহমতে পত্রখানা নিয়ে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। বলেই দূত শহীদ হয়ে যায়।
নূরুদ্দীন জঙ্গীর বাহিনী যখন শোবকের নিকটে পৌঁছে, তখন দুর্গ ও শহরময় সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যে, খৃস্টানদের বিশাল এক বাহিনী আক্রমণে ধেয়ে আসছে। মুহূর্তের মধ্যে মুসলিম বাহিনী মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। কিন্তু কাফেলা আরো নিকটে এলে দেখা গেল এ জঙ্গীর বাহিনী। গগনবিদারী তাকবীর ধ্বনি ভেসে এলো কানে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর নায়েবগণ সংবর্ধনা দেয়ার জন্য দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসেন।
