***
প্রথম দিকে বিলবিসকে ভুল বোঝাবার চেষ্টা করে অপহরণকারীরা। কিন্তু তাদের সোজা পথে নিয়ে আসেন বিলবিস। তিনজন পৃথক পৃথক যে জবানবন্দী পেশ করে, তাতে স্পষ্ট প্রমাণিত হল যে, এরা হাশীশী দলের সদস্য। খৃস্টানদের হয়ে মোসলেহুদ্দীনকে হাত করেছে এরাই। বিপুল অর্থ সম্পদ আর একটি সুন্দরী মেয়ে দেয়া হয় মোসলেহুদ্দীনকে। সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সফল হতে পারলে মিসরের সীমান্ত এলাকায় একটা প্রদেশ গঠন করে দেয়া হবে বলেও তাকে ওয়াদা দেয়া হয়ে। যার শাসন ক্ষমতা থাকবে তার ও এই খৃস্টান মেয়েটির হাতে।
মোসলেহুদ্দীন ধীরে ধীরে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের হাত করতে শুরু করে। কিন্তু অনেকের ব্যাপারে সফল হলেও খিজরুল হায়াতকে বাগে আনতে সক্ষম হল না। অথচ মিশন বাস্তবায়নে রাজকোষের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করা ছিল অপরিহার্য। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর একান্ত অনুগত আপোসহীন খিজরুল হায়াতের বর্তমানে যা তার পক্ষে অসম্ভব। রাজকোষের রক্ষীবাহিনীর সকলেই নির্বাচিত জানবাজ সৈনিক। এদের সরিয়ে অনুগত লোকদের নিয়োগ দিতে হবে মোসলেহুদ্দীনের। তার আগে দুনিয়া থেকে সরানো প্রয়োজন খিজরুল হায়াতকে। দুজন হাশীশী ও বিদ্রোহীদের দ্বারা গঠন করতে হবে এ বাহিনী।
মোসলেহুদ্দীনের তালিকা অনুযায়ী বেশ কজন কর্মকর্তাকে হত্যা করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয় ধৃত এই তিন অপহরণকারীর উপর। তারা খৃস্টানদের পক্ষ থেকে এ কাজের পারিশ্রমিক যথারীতি পেয়ে আসছিল। এভাবে ভাড়ায় মানুষ খুন করা ছিল তাদের পেশা। তাই উপরি লাভের জন্যও তারা চেষ্টা করত। এ সূত্রেই অতিরিক্ত পঞ্চাশ আশরাফী ও দুটুকরা সোনার চুক্তি হয় তাদের মোসলেহুদ্দীনের সাথে। খিজরুল হায়াতের হত্যার পর এ বখশিশ পরিশোধ করার কথা। কিন্তু মোসলেহুদ্দীন তা আদায় করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলল, পূর্ণ পারিশ্রমিক তো তোমরা পেয়েই আসছ। এর জন্য এত পীড়াপীড়ি করছ কেন? জবাবে মোসলেহুদ্দীনকে হুমকি দেয় ঘাতক দল। মোসলেহুদ্দীন তার স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়ে বলে, নিয়ে যাও, তোমরা একে উপযুক্ত দামে বিক্রি করতে পারবে।
.
এখনো ছাদের সাথে ঝুলে আছে মোসলেহুদ্দীন। বাঁধন খুলে যখন তাকে নামানো হল, তখন সে অচেতন। তার রক্ষিতা মেয়েটির কক্ষে গিয়ে দেখা গেল, সে পড়ে আছে মৃত। তার মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছিল। ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে রিপোর্ট দিলেন, মেয়েটি বিষপানে আত্মহত্যা করেছে। ছোট্ট একখণ্ড কাপড় পড়ে আছে তার পার্শ্বে। স্পষ্ট বুঝা গেল, এতে কি বাঁধা ছিল, যা লুকানো ছিল তার পোশাকের ভেতর।
দীর্ঘক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে আসে মোসলেহুদ্দীনের। এখনো স্পষ্ট কথা সরছে না তার মুখ দিয়ে। ছানাবড়া চোখে তাকায় সকলের প্রতি। তারপর বিড় বিড় করে আবোল তাবোল বলে কি যেন। মুখে ঔষধ দেন ডাক্তার। তবু সুস্থ হচ্ছে না মোসলেহুদ্দীন।
সে রাতেই সর্বজন শ্রদ্ধেয় এক ব্যক্তির আগমন ঘটে গিয়াস বিলবিসের নিকট। নাম তার যায়নুদ্দীন আলী ইবনে নাজা আল-ওয়ায়েজ। তিনি বিলবিসকে বললেন, শুনতে পেলাম, কয়েকজন গুপ্তচর ও সন্ত্রাসী নাকি ধরা পড়েছে। তাদের নিকট থেকে তোমরা অনেক তথ্য জানতে পারবে। তবে আমিও তোমাদের কিছু তথ্য দিতে চাই।
পীর-মুরশিদ না হলেও যায়নুদ্দীন ধর্ম, রাজনীতি ও সামাজিক জগতের এক মহান ব্যক্তিত্ব। বড় বড় বহু আমলা-কর্মকর্তা তার শিষ্য। সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে পীরের মত মান্য করে। তিনি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানতে পেরেছেন যে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ও তার সেনাবাহিনীর অনুপস্থিতির সুযোগে দুশমন ফায়দা হাসিল করছে এবং এত সূক্ষ্মভাবে ষড়যন্ত্র ও বিদ্রোহের বিষ ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে যে, কাউকে ধরা সহজ নয়। প্রাথমিক রিপোর্টের পর যায়নুদ্দীন কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজেই গুপ্তচরবৃত্তি শুরু করেছেন। সেনাবাহিনীর ছোট-বড় অনেক অফিসার তার মাহফিলে যাওয়া-আসা করত। তাদের থেকেই তিনি অনেক তথ্য সংগ্রহ করেন এবং বেশকিছু কর্মকর্তার নাম-ধাম ও তাদের তৎপরতার খবর সগ্রহ করেন। যায়নুদ্দীন ব্যক্তিগত উদ্যোগে নাশকতাকারীদের বিরুদ্ধে এমন একটি দল গঠন করে নিয়েছিলেন, যারা অনেক সূক্ষ্ম তথ্যও সংগ্রহ করে ফেলে।
এক মিসরী ঐতিহাসিক মোহাম্মদ ফরিদ আবু জাদীদ তার সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী পুস্তকে মিসরের ষড়যন্ত্র ও বিদ্রোহের মুখোশ উন্মোচনের নায়ক হিসেবে যায়নুদ্দীন আলীর নাম উল্লেখ করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি তিন-চারজন ইতিহাসবেত্তার সূত্রও উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সে যুগের যেসব রচনা এখনো সংরক্ষিত আছে, তাতে প্রমাণিত হয় যে, রাজকোষ পরিচালকের হত্যাকাণ্ডেই খৃস্টানদের এসব ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যায়। যার ক্রীড়নক ছিল এমন কতিপয় মুসলমান, যারা ছিল সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর একান্ত বিশ্বস্ত।
যা হোক যায়নুদ্দীন আলী বললেন, আমি আরো কয়েকটা দিন আমার গুপ্তচরবৃত্তি চালু রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেই সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের সংবাদ শহরে এমনভাবে ছড়িয় পড়েছে যে, এখন তাদের সাথীরা গা-ঢাকা দিয়ে ফেলবে। তিনি গিয়াস বিলবিসকে ষড়যন্ত্রকারীদের নাম-ঠিকানা অবহিত করেন এবং হাসান বিন আবদুল্লাহ সহ তার গ্রুপটিকে গিয়াস বিলবিসের হাতে তুলে দেন।
