তল্লাশী চালিয়ে মোসলেহুদ্দীনের ঘরে যেসব সম্পদ পাওয়া গেল, তা রীতিমত ভাবিয়ে তুলল গিয়াস বিলবিসকে। মোসলেহুদ্দীন কেন খৃস্টানদের ফাঁদে আটকে গেল বুঝে ফেললেন তিনি। স্বয়ং তার রক্ষীতা মেয়েটি এতই চিত্তাকর্ষক ও বাকপটু যে, তাকে উপেক্ষা করতে হলে প্রয়োজন সুকঠিন ও নিষ্কম্প ঈমান।
বিলবিস উপলব্ধি করলেন, এ সুদূরপ্রসারী এক ষড়যন্ত্র, যা নিয়ন্ত্রিত হয় জেরুজালেম থেকে। তিনি মেয়েটিকে বললেন, মনের সব কথা বলে দাও; কিছুই গোপন রাখার চেষ্টা কর না। জবাবে মেয়েটি বলল, যা বলা সম্ভব ছিল, বলেছি; আর সম্ভব নয়। আমি ক্রুশের সাথে প্রতারণা করতে পারি না। ক্রুশে হাত রেখে আমি শপথ নিয়েছি, দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনে জীবন দিয়ে দেব, তবুও নিজের জাতি ও ধর্মের সাথে বেঈমানী করব না। আমার বলা এ পর্যন্তই শেষ। এবার আপনি যা ইচ্ছা করতে পারেন। মুক্তি দিয়ে যদি আমাকে জেরুজালেম কিংবা কার্ক পৌঁছিয়ে দেন, তবে আপনি যা চাইবেন, আমি তা-ই প্রদান করব। মোসলেহুদ্দীন আপনার হাতে বন্দী আছে। তাকে জিজ্ঞেস করে সব জেনে নিতে পারেন। তিনি আপনাদেরই ভাই। হয়তো তিনি সব বলে দেবেন।
বিলবিস মেয়েটিকে আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। চলে যান মোসলেহুদ্দীনের নিকট। বড় শোচনীয় অবস্থায় আছে মোসলেহুদ্দীন। দুবাহুতে রশি বেঁধে ছাদের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে তাকে। গিয়াস বিলবিস গিয়েই বললেন, দোস্ত মোসলেহ! যা জিজ্ঞেস করি, সত্য সত্য বলে দাও। বল, তোমার স্ত্রী কোথায়? তাকে কাকে দিয়ে অপহরণ করিয়েছ? তোমায় আরো অনেক প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। তোমার রক্ষিতা তার মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছে।
আমার বাঁধন খুলে দে নরাধম! আমীরে মেসের আসুন, আমি তোরও একই পরিণতি ঘটাব বলে রাখছি। ক্রুদ্ধ কণ্ঠে দাঁত কড়মড় করে বলল মোসলেহুদ্দীন।
ঠিক এমন সময় বিলবিসের এক আমলা তার কানে কানে কি যেন বলল। চমকে উঠেন বিলবিস। তৎক্ষণাৎ তিনি প্রকোষ্ট ত্যাগ করে দৌড়ে উপরে চলে যান। কক্ষে বসা আছে হত্যার অভিযোগে ধৃত মোসলেহুদ্দীনের স্ত্রী ফাতেমা এবং তাকে অপহরণকারী তিন ব্যক্তি। নিজে কিভাবে অপহৃত হল এবং কিভাবে অপহরণকারীরা ধরা পড়ল, ফাতেমা তার বিবরণ দেয় গিয়াস বিলবিসের নিকট।
বিলবিস ফাতেমা ও তিন আসামীকে পাতাল কক্ষে নিয়ে মোসলেহুদ্দীনের সম্মুখে উপস্থিত করান। তাদের দেখে চোখ বন্ধ করে ফেলে মোসলেহুদ্দীন। বিলবিস জিজ্ঞেস করেন, বল, এদের মধ্যে খিজরুল হায়াতের ঘাতক কে? কথা বলে না মোসলেহুদ্দীন। কথাটি তিনবার জিজ্ঞেস করেন বিলবিস। মোসলেহুদ্দীন তারপরও নীরব। পাতাল কক্ষের এক ব্যক্তিকে ইশারা দেন বিলবিস। এগিয়ে এসে ঝুলন্ত মোসলেহুদ্দীনের কোমর জড়িয়ে ধরে ঝুলে পড়ে লোকটি। সুঠাম-সুদেহী লোকটির দেহের সম্পূর্ণ ওজন চাপ ফেলে মোসলেহুদ্দীনের দুবাহুতে। রশিবাধা বাহু দুটো ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয় মোসলেহুদ্দীনের। প্রচণ্ড ব্যথায় কুঁকিয়ে চীৎকার করে উঠে মোসলেহুদ্দীন বলল, মাঝের জন। তিনজনকে মোসলেহুদ্দীনের নিকট থেকে সরিয়ে নিয়ে যান বিলবিস। বলেন, এবার সব ঘটনা খুলে বল, অন্যথায় এখান থেকে কেউ জীবন নিয়ে ফিরে যেতে পারবি না।
আপোসে পরামর্শ করে তারা সব বলে দেবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। বিলবিস আলাদা আলাদা কক্ষে পাঠিয়ে দেন তাদের। ফাতেমাকে নিয়ে যান উপরে। ফাতেমা জানায়, তার মা সুদানী, পিতা মিসরী। তিন বছর আগে সে পিতার সাথে মিসর এসেছিল। নজরে পড়ে মোসলেহুদ্দীনের। তিনি পিতার নিকট লোক পাঠান। মূল্য কত নির্ধারণ হয়েছিল তা জানে না ফাতেমা। মোসলেহুদ্দীনের ঘরে মেয়েকে রেখে যায় পিতা, হাতে করে নিয়ে যান একটি থলে। একজন মৌলভী ও কয়েকজন লোক ডেকে বিয়ে পড়িয়ে নেন মোসলেহুদ্দীন। মোসলেহুদ্দীনকে প্রাণভরে ভালোবাসত ফাতেমা। এই তিন বছরের দাম্পত্য জীবনে কখনো স্বামীর প্রতি ফতেমার সন্দেহ হয়নি যে, লোকটি এত বাজে। মোসলেহুদ্দীন মদ্যপান করত না। তার ঘরের বাইরের তৎপরতা সম্পর্কে কিছুই জানত না ফাতেমা।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর শোবক চলে যাওয়ার পরপর পাল্টে যায় মোসলেহুদ্দীন। গভীর রাত পর্যন্ত বাইরে কাটাতে শুরু করে। এক রাতে ফাতেমা দেখতে পায় যে, স্বামী তার আজ মদ খেয়ে এসেছে। ফাতেমার পিতাও ছিল মদ্যপ। মদের ঘ্রাণ আর মদ্যপ চিনে সে ভালোভাবে। কিন্তু ভালোবাসার খাতিরে স্বামীর এই অপরাধটুকু সে ক্ষমার চোখে দেখে। তারপর ধীরে ধীরে ঘরে অচেনা লোকদের আনাগোনা শুরু হয়। এক রাতে মোসলেহুদ্দীন আশরাফীভর্তি দুটি থলে ও কয়েক টুকরা সোনা ফাতেমাকে দেখিয়ে ঘরে রেখে দেয়। আরেক রাতে মদ খেয়ে মাতাল অবস্থায় ঘরে এসে ফাতেমাকে বলল, যদি মিসরের উত্তরাঞ্চল- যা রোম উপসাগরের তীরের সাথে সংযুক্ত আমার হাতে এসে যায়, তা তোমার নিকট কেমন লাগবে? নাকি সুদানের সীমান্তবর্তী এলাকাটা নেব? তোমার যেটা পছন্দ হবে, আমি হব তার রাজা আর তুমি হবে রাণী। ফাতেমা অত বিচক্ষণ নয় যে, এর রহস্য বুঝতে পারে। সে এতটুকুই বুঝে, স্বামীধন তার মদ খেয়ে মাতাল হয়ে এসেছে। স্বাভাবিক অবস্থায় তো আর এসব কথা তিনি বলেন না।
তারপর একদিন ঘরে নিয়ে আসে অপরূপ সুন্দরী একটি মেয়ে। সাথে দুজন পুরুষ। তখন থেকেই ঘরে থেকে যায় মেয়েটি। বিয়ে-শাদী হয়নি। ফাতেমাকে ঘনিষ্ঠ বানাবার অনেক চেষ্টা করে মেয়েটি। কিন্তু দিন দিন তার প্রতি ঘৃণাই বাড়তে থাকে ফাতেমার। বুক থেকে স্বামীকে ছিনিয়ে নিল যে মেয়ে, তার সঙ্গে খাতির কিসের! তারপর সংঘটিত হল খিজরুল হায়াতের হত্যার ঘটনা।
