এক আমেরিকান লেখক এন্টেনী ওয়েস্ট বিভিন্ন ঐতিহাসিকের উদ্ধৃতি উল্লেখ করে লিখেছেন, খৃস্টানদের কাছে সৈন্য ছিল সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সৈন্য অপেক্ষা চারগুণ বেশী। তন্মধ্যে বর্মধারী পদাতিক এবং অশ্বারোহী-উজ্জ্বারোহী সৈন্য ছিল বিপুল। এতগুলো সৈন্য সরাসরি আক্রমণ করলেও মুসলমানদের বেশী সময় টিকে থাকতে পারার কথা ছিল না। কিন্তু শোবকের শোচনীয় পরাজয় ও ক্ষয়ক্ষতিতে তারা ছিল ভীত-সন্ত্রস্ত। এন্টনী ওয়েস্ট আরো লিখেছেন যে, খৃস্টান বাহিনীটি ছিল বিভিন্ন রাজ্যের সম্মিলিত বাহিনী, যারা বাহ্যত ছিল ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু মুসলমানদের নির্মূল করার ইস্যুতে তারা একমত হলেও কমান্ডার- অধিনায়কগণের মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষমতা দখল ও নিজ নিজ রাজ্যের সম্প্রসারণ। ফলে কার্যত তাদের শক্তি ছিল বহুধা বিভক্ত।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, খৃস্টানরা ছিল ষড়যন্ত্র আর নাশকতার ওস্তাদ। মুসলমানদের কোন ভূখণ্ড দখল করে নিলে সেখানে তারা গণহত্যা আর নারীর সম্ভ্রমহানীর মহড়া শুরু করে দিত। পক্ষান্তরে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী প্রেম ভালোবাসা ও চারিত্রিক গুণাবলী দ্বারা শত্রুর মন জয় করে নিতেন। তাছাড়া নিজের সৈনিকদের তিনি এমনভাবে গঠন করে নিয়েছিলেন যে, মাত্র দশজন সৈনিকের একটি গেরিলা দল খৃস্টানদের এক হাজার সৈনিকের ক্যাম্পে আক্রমণ চালিয়ে সব তছনছ করে দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে যেত। নিজের জীবন বিসর্জন দেয়াকে তারা সামান্য কুরবানী মনে করত। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী যুদ্ধের ময়দানে তার স্বল্পসংখ্যক সৈন্যকে এমনভাবে পরিচালনা করতেন যে, প্রতিপক্ষের বিশাল বাহিনী তাদের কাছে অসহায় হয়ে পড়ত। শোবক জয়ের লড়াইয়েও তিনি তার সেই বিচক্ষণতার প্রদর্শন করেছিলেন। এসব বিবেচনা করেই খৃস্টানরা সরাসরি আক্রমণের পরিকল্পনা ত্যাগ করে এবং বিকল্প কৌশল অবলম্বন করে। কিন্তু সেই কৌশলও কতটুকু সুফল বয়ে আনবে, তাতেও তারা ছিল সন্দিহান। তাই নিরুপায় হয়ে তারা মিসরে বিদ্রোহের আগুন প্রজ্বলিত করার এবং মিসর আক্রমণ করার জন্য সুদানীদের উস্কানি দেয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করে।
মিসরের নগর প্রশাসক মোসলেহুদ্দীনের পক্ষ থেকে একের পর এক আশাব্যঞ্জক রিপোর্ট পাচ্ছিল কার্কের খৃস্টানরা। এখনও তারা এই সংবাদ পায়নি যে, মিসরের রাজকোষের পরিচালক খিজরুল হায়াত নিহত হয়েছেন এবং এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য নায়ক অভিযোগে মোসলেহুদ্দীনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কার্ক পর্যন্ত এ সংবাদ পৌঁছতে সময়ের প্রয়োজন অন্তত পনের দিন। কারণ, মিসর-কার্ক যাতায়াতের সোজা পথ এখন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর দখলে। মিসর থেকে কার্ক যেতে বহুদূর পথ ঘুরে যেতে হবে দূতের। যে রাতে মোসলেহুদ্দীনের স্ত্রী ফাতেমা অপহৃত হয়েছিল, বহু সময় ব্যয়ে এক দূত সে রাতে সংবাদ নিয়ে কার্ক পৌঁছে। দূত রিপোর্ট দেয় যে, মিসরে বিদ্রোহ করার পরিবেশ এখন অনুকূল, কিন্তু সুদানীরা এখনও হামলা করার জন্য প্রস্তুত নয়। তাদের ঘোড়ার অভাব। উট আছে অনেক। আরো অন্তত পাঁচশ উন্নত ঘোড়া না হলে তারা সামনে অগ্রসর হতে পারবে না। জিনও প্রয়োজন সমানসংখ্যক।
.
তিন-চার দিনের মধ্যে পাঁচশ জিন ও ঘোড়ার ব্যবস্থা করে দেয় খৃস্টানরা। এগুলোকে এমন পথে রওনা করান হয়, যে পথ সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে, এ পথে গেলে ধরা পড়ার কোন আশংকা নেই। মিসর থেকে আগত দূতই পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঘোড়াগুলো। লোকটি সুদানী। গুপ্তচরবৃত্তি করছে তিন বছর ধরে। ঘোড়ার সাথে আছে আটজন খৃস্টান সেনা অফিসার। সুদানী হামলার নেতৃত্ব দেয়ার জন্য যাচ্ছে তারা। তাদের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে যে, সালাহুদ্দীন আইউবীর সৈন্যদের এখান থেকে বের হতে দেয়া হবে না।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী শুধু এতটুকু জানতেন যে, মিসরের পরিস্থিতি ভালো নয়। অবস্থা যে এত নাজুক ও বিস্ফোরনুখ, তা তিনি জানতেন না। আলী বিন সুফিয়ান তাকে আশ্বস্ত করে রেখেছিলেন যে, গুপ্তচরবৃত্তির এমন জাল তিনি বিছিয়ে রেখেছেন, অঘটন ঘটার আগেই তিনি সব খবর পেয়ে যাবেন। খিজরুল হায়াতের হত্যাকাণ্ড ও মোসলেহুদ্দীনের সংবাদ তিনি জানতেন না। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে সংবাদ দেয়ার জন্য গিয়াস বিলবিসকে পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি বললেন, আগে তদন্ত সম্পন্ন করে নেই; সুলতানকে সংবাদ দেব পরে।
***
টহল বাহিনীর কমান্ডার ফাতেমাকে রাতে আলাদা এক তাবুতে থাকতে দেয়। রাতের শেষ প্রহরে তাকে ও তিন অপহরণকারীকে আটজন রক্ষীর সাথে রওনা করা হয় কায়রো। সূর্যাস্তের পর এ কাফেলা কায়রো গিয়ে পৌঁছে এবং চলে যায় সোজা গিয়াস বিলবিসের দপ্তরে।
গিয়াস বিলবিস খিজরুল হায়াত ও ফাতেমার অপহরণ ঘটনার তদন্তে ব্যস্ত। তিনি মোসলেহুদ্দীনের ঘরে তল্লাশী চালান এবং তার রক্ষীতাকে তুলে নিয়ে আসেন। রক্ষীতা নিজেকে উজবেক মুসলমান বলে পরিচয় দেয়। বিলবিসের চোখে ধুলো দেয়ার চেষ্টা করে মেয়েটি। বিলবিস মেয়েটিকে সেই কক্ষটির খানিক ঝলক প্রদর্শন করেন, যেখানে বড় বড় পাষাণহৃদয় পুরুষও মনের সব ভেদ উদগীরণ করে দেয়। ফলে নিজের আসল পরিচয় ফাঁস করে দেয় মেয়েটি স্বীকার করে, আমি খৃস্টান, এসেছি জেরুজালেম থেকে। পাশাপাশি মেয়েটি গিয়াস বিলবিসকে নিজের দেহ ও সম্পদের লোভ দেখাতে শুরু করে।
