***
ফাতেমা শুয়ে পড়ে। অপহরণকারীরা কোন অসদাচরণ করছে না দেখে ফাতেমার মনে খানিকটা স্বস্তি ফিরে আসে। শোয়া মাত্র দুচোখের পাতা বুজে আসে তার।
অল্পক্ষণ পরই হঠাৎ ফাতেমার চোখ খুলে যায়। দেখে অপহরণকারী তিনজন ঘুমিয়ে আছে। ফাতেমা প্রথমে ভাবে, কারো একটি খঞ্জর তুলে নিয়ে তিনজনকেই খুন করে ফেলি। কিন্তু তার অত সাহস হল না। তিনজন পুরুষকে একসাথে হত্যা করা একজন নারীর পক্ষে সহজ নয়। ঘোড়াগুলোর প্রতি তাকায় ফাতেমা। সব কটি ঘোড়ায় জিন বাঁধা। ফাতেমা উঠে দাঁড়ায়। পা টিপে টিপে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় ঘোড়ারগুলোর নিকটে। টিলার পেছনে আড়াল হয়ে যাচ্ছে সূর্য। ফাতেমা জানে না কায়রো এখান থেকে কোন্দিকে এবং কতদূর। কিন্তু তবুও তার পালাতে হবে। অপহরণকারীদের হাতে জীবন বিপন্ন করা অপেক্ষা বিস্তীর্ণ মরু অঞ্চলে ঘুরপাক খেয়ে খেয়ে জীবন হারানো শ্রেয় ফাতেমার কাছে।
ফাতেমা জিনকষা একটি ঘোড়ায় চড়ে বসে। ঘোড়া হাঁকায় দ্রুত। ধাবমান ঘোড়ার খুরধ্বনী জাগিয়ে তোলে ঘুমন্ত অপহরণকারীদের। ফাতেমাকে ঘোড়া হাঁকিয়ে টিলার দিকে যেতে দেখে ফেলেছে তারা। দুজন চড়ে বসে দুটি ঘোড়ায়। ঘোড়া হাঁকায়।
পর্বতঘেরা বন্দীদশা থেকে কিভাবে বের হতে হয় ফাতেমার তা জানা নেই। যে পথে সে এগিয়ে চলে, সে পথে বের হওয়ার সুযোগ নেই। মাথায় পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে আছে একটি টিলা। টিলা পর্যন্ত পৌঁছে যায় ফাতেমা। পিছনে ফিরে দেখে ধাওয়াকারীরা দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছে তার দিকে। ফাতেমা টিলার উপর উঠিয়ে দেয় ঘোড়াটি। শক্ত-সামর্থ ঘোড়া টিলা অতিক্রম করে নেমে যায় অপরদিকে। একদিকে মোড় ঘুরিয়েই পথ পেয়ে যায় ফাতেমা। ধাওয়াকারীরাও পৌঁছে যায় তার অতি নিকটে। ব্যবধান কমে আসছে ধীরে ধীরে। সম্মুখে সমুদ্রের ন্যায় বিশাল-বিস্তীর্ণ মরুভূমি চোখে পড়ে ফাতেমার। সেই মরুপথ অতিক্রম করে তারই দিকে এগিয়ে আসছে চারটি উষ্ট্রারোহী। ফাতেমা সর্বশক্তি দিয়ে চীৎকার করতে শুরু করে বাঁচাও! ডাকাতের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও। ফাতেমার নিকটে চলে আসে চার উল্লারোহী।
.
উষ্ট্রারোহীদের দেখে পেছন থেকে ঘোড়ার গতি হ্রাস করে ধাওয়াকারী অশ্বারোহীরা। ঘোড়ার মোড় ঘুরিয়ে পালাতে উদ্যত হয় তারা। উজ্জ্বারোহীরা ধাওয়া করতে শুরু করে তাদের। তীর ছুঁড়ে একজন। একটি ঘোড়ার ঘাড়ে গিয়ে বিদ্ধ হয় তীর। ব্যাথায় কুঁকিয়ে উঠে ঘোড়া। ছুটাছুটি করতে থাকে এলোপাতাড়ি। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে আরোহী। লাফিয়ে পড়ে যায় মাটিতে। পালাবার চেষ্টা করে অপরজন। থামতে নির্দেশ দেয় উল্লারোহীরা। ঘোড়া থামিয়ে দাঁড়িয়ে যায় অশ্বারোহী। দুজনকে ধরে ফেলে উষ্ট্রারোহীরা। ফাতেমার দেয়া তথ্য অনুযায়ী ধরে আনা হয় তৃতীয়জনকেও।
এরা চারজন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর টহল বাহিনীর সৈনিক। শক্ররা যাতে হঠাৎ করে আক্রমণ করতে না পারে এবং খৃস্টান সন্ত্রাসীরা যাতে মিসরে ঢুকতে না পারে, তার জন্য সমগ্র মরু এলাকায় টহলের ব্যবস্থা করে রেখেছেন আইউবী। সম্প্রতি তাদের হাতে ধরাও পড়েছে বেশ কজন সন্দেহভাজন। এবার তাদের ফাঁদে আটকা পড়ে তিন মুখোশধারী অপহরণকারী।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সৈন্যদের কাছে বৃত্তান্ত শোনায় ফাতেমা। আরো জানায়, মিসরের রাজকোষের পরিচালক, সুলতানের একান্ত আস্থাভাজন খিজরুল হায়াত আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন। নগর প্রশাসক মোসলেহুদ্দীন সে হত্যার নেপথ্য নায়ক। আমি তার স্ত্রী ফাতেমা। এ তিনজনের একজন তার ঘাতক।
ধৃতদের থেকে খঞ্জর নিয়ে নেয়া হয়। পিঠমোড়া করে বাঁধা হয় তাদের। তাদের তিন ঘোড়ার একটি পালিয়ে যায় তীরের আঘাত খেয়ে। তাই এবার দুটির একটিতে দুজন, অপরটিতে একজনকে বসিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় কমান্ডারের নিকট
চার মাইল পথ অতিক্রম করে সূর্যাস্তের আগে আগে তারা পৌঁছে যায় ক্যাম্পে। খর্জুর বীথিবেষ্টিত এ এলাকায় টহল বাহিনীর হেডকোয়ার্টার। কমান্ডারের সামনে নিয়ে যাওয়া হয় ফাতেমাকে। সেনা প্রহরায় বসিয়ে রাখা হয় মুখোশধারী আসামীদের। আগামী দিন কায়রো পাঠিয়ে দেয়া হবে তাদের।
***
কার্কে বসে বসে সালাহুদ্দীন আইউবীর অপেক্ষা করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে খৃস্টানরা। নবউদ্যমে প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে তাদের সেনাবাহিনী। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সৈন্যদের পথেই প্রতিরোধ করার প্রস্তুতি গ্রহণের দায়িত্ব পড়েছে ফ্রান্সের সৈন্যদের উপর। মুসলিম বাহিনীর উপর পেছন দিক থেকে আক্রমণ করার দায়িত্ব ন্যাস্ত হয় রেমন্ডের বাহিনীর উপর। কার্ক দুর্গ প্রতিরক্ষার দায়িত্ব জার্মানীর সেনাদের। এখন নতুন করে তাদের সঙ্গে যুক্ত করা হল ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের কিছু সৈন্যকে। গোয়েন্দা বিভাগ তাদের জানিয়ে দিয়েছে যে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী নতুন বাহিনী প্রস্তুত করছেন। খৃস্টান শাসকমণ্ডলী চেয়েছিল, তাদের সৈন্যরা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের উপর আক্রমণ চালিয়ে পেছনে সরে আসবে। কিন্তু তাতে দ্বিমত পোষণ করে তাদের গোয়েন্দা বিভাগ। গোয়েন্দা বিভাগের যুক্তি হল, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী তার প্রতিরক্ষাকে তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করে রেখেছেন। তার একটি হল টহল বাহিনী। তাছাড়া তার নিজের নিরাপত্তা রক্ষীদের একটি দল দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ঘুরে বেড়ায়। মরুভূমিতে কিছু একটা নড়াচড়া করতে দেখলেও নিকটে গিয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর এসব শক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেখে সুলতানের ক্যাম্পে আক্রমণের পরিকল্পনা থেকে সরে আসে খৃস্টানরা।
