***
কায়রোর উত্তরে বহু দূরে সবুজ-শ্যামল মনোরম একটি স্থান। চারদিকে উঁচু উঁচু টিলা। ফাতেমা সূর্যোদয়ের আগেই পৌঁছে গেছে সেখানে। অপহরণকারীদের ঘোড়া থেমে গেছে। ফাতেমাকে বের করা হয়েছে বস্তা থেকে। মুখের কাপড় সরিয়ে দেয়া হল, খুলে দেয়া হল হাত-পায়ের বাঁধন। তিন মুখোশধারীর কবলে অচেতন পড়ে আছে মহিলা।
অল্প সময়ের মধ্যে চৈতন্য ফিরে আসে ফাতেমার। চীৎকার জুড়ে দেয় সে। মুখোশধারীরা তাকে খাবার খেতে দেয়। কাঁপা হাতে একটু একটু করে খাদ্য মুখে দেয় ফাতেমা। পানি পান করে। আস্তে আস্তে চাঙ্গা হয়ে উঠে, দেহের শক্তি ফিরে আসে। হঠাৎ ফাতেমা উঠে দাঁড়ায় এবং দৌড় দেয় সামনের দিকে। মুখোশধারীরা কিছুই বলছে না। বসে বসে তামাশা দেখছে তারা। খানিক দুরে গিয়ে একটি টিলার আড়ালে চলে যায় ফাতেমা।
এবার ঘোড়ায় চড়ে বসে এক মুখোশধারী। ঘোড়া হাঁকায় এবং ছুটে গিয়ে ফাতেমাকে ধরে ফেলে। দৌড়ে দৌড়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে ফাতেমা। অবসন্ন দেহে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে। মুখোশধারী আরোহী তাকে ঘোড়ায় তুলে নেয় এবং নিজে তার পেছনে বসে ঘোড়া হাঁকিয়ে সাথীদের নিকট ফিরে যায়।
পালাবে? পালিয়ে যাবে কদ্দূর? এখান থেকে পালিয়ে কায়রো পৌঁছা একজন বলিষ্ঠ সুপুরুষের পক্ষেও তো সম্ভব নয়। শান্ত কণ্ঠে বলল অপহরণকারীদের একজন।
ফাতেমা কাঁদছে, চীৎকার করছে, বকাবকি করছে। আরেকজন বলল, আমরা যদি তোমাকে কায়রো ফিরিয়ে নিয়েও যাই, তবু তোমার রেহাই নেই। তোমার স্বামীই তোমাকে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন।
মিথ্যে কথা। চীৎকার করে বলল ফাতেমা।
না, সত্যি বলছি। আমরা তোমাকে পারিশ্রমিক হিসেবে এনেছি। তুমি আমাকে চিনতে পারনি। ঐ যে একজন লোক তোমার হাতে বিশ আশরাফীর একটি থলে দিয়ে এসেছিল, আমি সেই লোক। তুমি তোমার স্বামীকে বলে ফেলেছ যে, সে-ই খিজরুল হায়াতের খুনী। বোকামীবশত তুমি এও বলেছ যে, তুমি কোতোয়ালকে ঘটনাটা বলে দেবে। লোকটি তোমার প্রতি পূর্ব থেকেই অতিষ্ঠ ছিল। তার মন মেজাজ, প্রেম-ভালোবাসা সব কজা করে রেখেছে তার রক্ষিতা। মেয়েটি কে, কোত্থেকে এসেছে এবং কেনই বা এসেছে, তা আমি বলতে পারব না। পরদিন তোমার স্বামী আমাদের আস্তানায় আসে। লোকটা এতই বেঈমান যে, খিজরুল হায়াতের হত্যার বিনিময়ে তার আমাদেরকে পঞ্চাশ আশরাফী আর দুটুকরা সোনা দেয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু যখন কাজ হয়ে গেল, পাঠালো মাত্র বিশ আশরাফী। আমি তোমাকে কাজে লাগালাম। আশরাফীগুলো তোমার হাতে ফেরত দিয়ে এলাম, যাতে রহস্যটা তোমারও জানা হয়ে যায়। আমাদের তীর ঠিক জায়গায় আঘাত হানে। পরদিন আমাদের আস্তানায় এসে সে দিল পঞ্চাশ আশরাফী। সোনার টুকরা দুটির খবর নেই। আমার এই সাথীরা বলল, ওয়াদা যা ছিল, এখন আমরা তার চেয়েও বেশী আদায় করে ছাড়ব। না দিলে যে করে হোক, কোতোয়ালের কাছে সব ফাঁস করে দেব।
যা হোক, এবার তোমার স্বামীর মনে আশংকা জাগল যে, সে-ই যে খিজরুল হায়াতের ঘাতক, তুমিও তা জেনে ফেলেছ। উভয় সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে তিনি তোমাকে আমাদের হাতে তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ভাবলেন, আমরা যদি তোমাকে অপহরণ করে নিয়ে যাই, তাহলে আমাদের দাবী-দাওয়ার দায় থেকেও তিনি বেঁচে গেলেন, আর তুমি যে তার পথের কাঁটা, তাও সরে গেল। তারই পরিণতিতে তুমি এখন এখানে।
কাঁদতে কাঁদতে ফাতেমার চোখের অশ্রু শুকিয়ে গিয়েছিল আগেই। এবার এই কাহিনী শুনে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ে মহিলা। বিস্ফারিত নয়নে এক এক করে তাকাতে থাকে মুখোশধারী অপহরণকারীদের প্রতি। অপহরণকারীরা তাকে বোঝাতে চেষ্টা করে যে, তোমার অস্থিরতা, কান্না বা পলায়ন চেষ্টা সবই বেকার।
আমি তোমাকে আগেই দেখেছিলাম। মোসলেহুদ্দীন যখন বললেন, ঠিক আছে, শ্রমের বিনিময়ে তোমরা ফাতেমাকে তুলে নিয়ে যাও, আমি তখন তোমার মূল্য পরিমাপ করলাম। ভাবলাম, তুমি রূপসী যুবতী। আমি তোমাকে চড়া দামে বিক্রি করতে পারব। তার প্রস্তাব মেনে নিলাম। তিনি আমাদের জানালেন, রাতে তার ঘরে কোন চাকর থাকবে না, কুকুরটাও বাধা থাকবে। তবে ঘরের সদর দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকবে। আমরা তিনজন পরস্পরের কাঁধে দাঁড়িয়ে দেয়াল টপকে ঘরে প্রবেশ করি। খঞ্জর হাতে অতি সাবধানে আমি তোমার কক্ষের দিকে এগিয়ে যাই। তোমার স্বামীর প্রতি আমাদের বিশ্বাস ছিল না। আশংকা ছিল, ফাঁদে ফেলে তিনি আমাদের খুন করাতে পারেন। কিন্তু আমরা পথ সম্পূর্ণ পরিষ্কার পেয়েছি। নিরাপদে আমরা তোমাকে তুলে নিয়ে এলাম। বলল অপহরণকারীদের একজন।
তুমি নিশ্চিত থাক, আমরা তোমার সম্ভ্রমে হাত দেব না। আমরা ব্যবসায়ী। ভাড়ায় খুন আর অপহরণ করে দেয়া আমাদের পেশা। তোমার গায়ে হাত দেয়ার ইচ্ছা আমাদের নেই। তিনজন পুরুষ একজন নারীকে অপহরণ করে এনে বেকায়দায় ফেলে উপভোগ করা কোন গৌরবের বিষয় নয়। বলল আরেকজন।
তোমরা আমাকে ইস্কান্দারিয়ার বাজারে নিয়ে বিক্রি করে ফেলবে? আহ! এখন বুঝি আমাকে ইজ্জত বিক্রি করে বেড়াতে হবে। কাঁদো কাঁদো করুণ কণ্ঠে বলল ফাতেমা।
না, দেহ ব্যবসা করানোর জন্য জংলী ও যাযাবর মেয়েদের ক্রয় করা হয়। তুমি তো হেরেমের সম্পদ। বিক্রিত হয়ে তুমি সম্ভ্রান্ত কোন আমীরের ঘরে চলে যাবে। আমাদের উপযুক্ত মূল্য প্রয়োজন। আমরা তোমাকে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলব না। তুমি কান্নাকাটি-দুশ্চিন্তা বাদ দাও, তোমার চেহারার জৌলুস ফিরে আসুক। অন্যথায় বেশ্যাবৃত্তিই কপালে জুটবে। যাও শুয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম কর। বলল আরেকজন।
