গত পরশু সন্ধ্যায় মুখোশ পরিহিত অপরিচিত এক ব্যক্তি ঘরে এসেছিল। আমার মনিব মোসলেহউদ্দীন তখন ঘরে ছিলেন না। আগন্তুক দরজায় করাঘাত করলে আমি দরজা খুলে দিই। আগন্তুক বলল, আমি ফাতেমার সাথে দেখা করতে চাই। আমি বললাম, ঘরে কোন পুরুষ নেই; এ মুহূর্তে আপনি তার সাথে দেখা করতে পারবেন না। লোকটি বলল, তাকে বলুন, আমি আশরাফীগুলো ফেরত দিতে এসেছি। চুক্তি অনুযায়ী সবগুলো স্বর্ণমুদ্রা না দিলে আমি নেব না। আমি ফাতেমাকে গিয়ে বললে তিনি লোকটিকে ভেতরে ডেকে নিয়ে যান।
চাকরানী আরো বলে, ম্যাডাম আমাকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে বলেন এবং বলে দেন যে, হঠাৎ কেউ এসে পড়লে আমাকে সংবাদ দিও। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি ভেতরের যে ফিসূফিস্ শব্দ শুনতে পেয়েছি, তাতে লোকটির ক্ষোভ এবং ফাতেমার অনুনয়-বিনয় প্রকাশ পাচ্ছিল। তাদের কথোপকথন থেকে আমি যা বুঝতে পেরেছি, তাহল, আমি তোমাকে বলেছিলাম, তুমি আলী বিন সুফিয়ানের নায়েব হাসান ইবনে আবদুল্লাহকে হত্যা করবে। বিনিময়ে আমি তোমাকে পঞ্চাশটি আশরাফী আর দুটুকরা সোনা প্রদান করব। কিন্তু তুমি টার্গেট মিস করেছ। হাসান ইবনে আবদুল্লাহর পরিবর্তে তুমি খিজরুল হায়াতকে হত্যা করে এসেছ। তাই যা দিলাম, নিয়ে যাও। জবাবে আগন্তুক বলল, আপনি আমাকে পরিষ্কার বলেছিলেন, হাসান ইবনে আবদুল্লাহ অমুক সময় খিজরুল হায়াতের ঘরে যাবেন। আমি আপনারই নির্দেশনা মোতাবেক ওৎ পেতে বসে থাকি। ঠিক সময়ে এক ব্যক্তিকে খিজরুল হায়াতের ঘরের দিকে যেতে দেখলাম। গঠন-প্রকৃতি ঠিক হাসান ইবনে আবদুল্লাহরই ন্যায়। আমি তীর ছুঁড়ে সেখান থেকে পালিয়ে যাই। খুন করার সময় তো অত ভাবা-চিন্তা যায় না।
লোকটি ফাতেমার নিকট থেকে পঞ্চাশ আশরাফী দাবী করেছিল আর ফাতেমা অননুয়-বিনয় করছিলেন। অবশেষে তিনিও চটে গিয়ে বললেন, আসল লোককে খুন করে আসতে পারলে এই বিশ আশরাফী ছাড়া আরো পঞ্চাশ আশরাফী দেব। আর দুটুকরা সোনাও পাবে। যাও, কাজ করে আস। লোকটি বলল, আমার কাজ আমি করেছি। পূর্ণ পারিশ্রমিক আদায় না করে আজ আমি যাচ্ছি না। কিন্তু ফাতেমা রাজি হলেন না। লোকটি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে একথা বলে চলে যায় যে, দেবেন না। আমার পাওনা আমি উসুল করে ছাড়ব। ফাতেমা আমাকে বলে দেন যে, এই লোকটির আগমনের সংবাদ কেউ যেন ঘুণাক্ষরেও জানতে না পায়। আমাকে তিনি দুটি আশরাফী পুরস্কারও দেন। আজ সকালে তার কক্ষে গিয়ে দেখি, তিনি নেই। আমার মনে হয়, লোকটি প্রতিশোধস্বরূপ তাকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে।
সব শুনে গিয়াস বিলবিস মোসলেহুদ্দীনকে বাইরে বের করে দিয়ে কঠোর ভাষায় চাকরানীকে জিজ্ঞেস করেন, বলো, এই গল্প তোমাকে কে পড়িয়েছে? ফাতেমা না মোসলেহুদ্দীন?
কেউ নয়, এ তো আমার চোখের দেখা ঘটনা। চাকরানী জবাব দেয়।
সত্য বল, ফাতেমা কোথায়? কার সাথে গেছে সে?
চাকরানী ভয় পেয়ে যায়। সন্তোষজনক কোন জবাব দিতে পারল না সে। বিলবিস বললেন, বন্দীশালার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে যেতে চাও? আজ তুমি ফিরে যেতে পারবে না।
চাকরানী গরীব-অসহায় এক মহিলা। তার জানা ছিল, বন্দীশালার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে গেলে সত্য-মিথ্যা আলগা হয়ে যায়। তার আগে পৃথক হয়ে যায় দেহের জোড়া। মহিলা কেঁদে ফেলে। বলে, এখন আমার উপায় কি? সত্য বললে মনিবের শাস্তি ভোগ করতে হবে আর মিথ্যা বললে সাজা ভোগ করতে হবে আমার। হায় এখন আমি কি করি!
বিলবিস চাকরানীকে সাহস দেন এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করেন। চাকরানী বলল, হত্যার ঘটনার দ্বিতীয় দিন মুখোশ পরিহিত এক ব্যক্তি আমার মনিবের ঘরে এসেছিল। মনিব মোসলেহুদ্দীন তখন ঘরে ছিলেন না। আগন্তুক ফাতেমাকে ডেকে পাঠায়। লোকটি সদর দরজার বাইরে আর ফাতেমা ভেতরে। দুজনের মধ্যে কথা হয়। কিন্তু কি কথা হয়েছে আমরা তা শুনতে পাইনি। আগন্তুক চলে গেলে ফাতেমা কক্ষে ফিরে আসেন। হাতে তার ছোট্ট একটি থলে। ফাতেমা কক্ষে ফেরেন অবনত মস্তকে। পরদিন সন্ধ্যায় মনিব সব চাকর-চাকরানী ও সহিসকে পুরো রাতের জন্য ছুটি দিয়ে দেন।
আচ্ছা, এর আগে কি কখনো সব চাকর-চাকরানীকে এভাবে একত্রে ছুটি দেয়া
না। ইতিপূর্বে একজনের অধিক দুজনকে কখনো একত্রে ছুটি দেয়া হয়নি। খানিক ভেবে চাকরানী বলল, মজার ব্যাপার হল, সবাইকে ছুটি দিয়ে মনিব বললেন, কুকুরটা আজ রাতে বাধা থাকবে। অথচ এর আগে কুকুর প্রতিরাতে ছাড়া থাকত। বড় তেজস্বী কুকুর। অপরিচিত কাউকে দেখলেই হামলে পড়ে সাথে সাথে।
ফাতেমার সাথে মোসলেহুদ্দীনের সম্পর্ক কিরূপ ছিল? প্রশ্ন করেন বিলবিস।
বড় তিক্ত। অল্প কদিন আগে সাহেব অপরূপ সুন্দরী এক যুবতীকে ঘরে এনেছেন। এই মেয়েটি সাহেবকে গোলামে পরিণত করে ফেলেছে। ফাতেমার সাথে সাহেবের কথাবার্তাও বন্ধ ছিল। চাকরানী বলল।
গিয়াস বিলবিস চাকরানীকে আলগ বসিয়ে রেখে মোসলেহুদ্দীনকে ভেতরে ডেকে পাঠান। নিজে বাইরে বের হয়ে যান এবং মুহূর্ত পর দুজন সিপাহী নিয়ে ফিরে আসেন। সিপাহীরা মোসলেহুদ্দীনের দুবাহুতে ধরে টেনে-হেঁচড়ে বাইরে নিয়ে যেতে শুরু করে। মোসলেহুদ্দীন নিজেকে নির্দোষ প্রমাণিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু বিলবিস একে কয়েদখানায় বন্দী করে রাখ নির্দেশ দিয়ে বেরিয়ে যান। তার দ্বিতীয় নির্দেশ ছিল, মোসলেহুদ্দীনের ঘর ঘেরাও করে রাখ, যাতে কেউ বেরিয়ে যেতে না পারে।
