তোমার হৃদয়ে আমার শক্রতা ছাড়া আর আছেই বা কি? জানতে চায় স্ত্রী।
আমার মনে এখনো তোমার সেই প্রথম দিনের ভালোবাসা বিরাজ করছে। আচ্ছা, লোকটিকে কি তুমি চেন? বলল মোসলেহুদ্দীন।
লোকটি মুখোশপরা ছিল। কিন্তু তোমার মুখোশ তো উন্মোচিত হয়ে গেল। আমি তোমাকে চিনে ফেলেছি। তুমি খুনী। বলল স্ত্রী।
মোসলেহুদ্দীন জবাবে কি যেন বলতে চাইল। কিন্তু স্ত্রী তাকে থামিয়ে দিয়ে নিজে বলল, আমার মনে হয়, তুমি রাজকোষের সম্পদ আত্মসাৎ করেছ। খিজরুল হায়াত সে খবর পেয়ে গিয়েছিল। তাই ভাড়াটিয়া খুনী দ্বারা তুমি তাকে হত্যা করে পথের কাটা দূর করেছ।
তুমি আমার উপর মিথ্যা অপবাদ দিও না। রাজকোষের অর্থ আত্মসাৎ করা আমার কী প্রয়োজন?
তোমার নয়- টাকার প্রয়োজন তার, যাকে তুমি বিবাহ ছাড়াই ঘরে স্থান দিয়েছ। অকস্মাৎ আগুনের মত জ্বলে উঠে বলল স্ত্রী, মদের জন্য তোমার টাকার প্রয়োজন এ অভিযোগ যদি সত্য না হয়ে থাকে, তাহলে বল, এ চারটি গোড়াগাড়ী কোত্থেকে এসেছে। নিত্যদিন তোমার ঘরে যে নর্তকীরা আসে, তারা কি ফ্রি আসে? প্রতিদিন যে মদের আসর বসাও, তার ব্যয় আসে কোথা থেকে? বল।
আল্লাহর ওয়াস্তে তুমি চুপ হয়ে যাও। আমাকে খোঁজ নিয়ে জানতে দাও লোকটি কে ছিল। তবেই ঘটনার প্রকৃতরূপ তোমার সামনে উদ্ভাসিত হয়ে যাবে। বলল মোসলেহুদ্দীন।
এখন আর আমি চুপ থাকতে পারব না। আমার বুকটা তুমি প্রতিশোেধ-স্পৃহায় ভরে দিয়েছ। আমি সমগ্র মিসরকে জানিয়ে দেব, আমার স্বামী খুনী, একজন ঈমানদারের ঘাতক, তুমি আমার ভালোবাসার হন্তা। এ হত্যার প্রতিশোধ আমি নেবই। বলল স্ত্রী।
অনুনয়-বিনয় করে স্ত্রীর মুখ বন্ধ করতে চান মোসলেহুদ্দীন। অবশেষে দুদিন কোন কথা বলবে না বলে স্ত্রী প্রতিশ্রুতি দেয় তাকে। এ সময়ে মোসলেহুদ্দীন উক্ত লোকটিকে খুঁজে বের করে প্রমাণ করবেন যে, তিনি ঘাতক নন। মোসলেহুদ্দীন তার স্ত্রীকে আরো জানান, গিয়াস বিলবিস কয়েকজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে এবং শীঘ্রই আসল ঘাতকের সন্ধান বেরিয়ে আসবে।
***
রাত কেটে যায়। চলে যায় পরের দিনও। মোসলেহুদ্দীন ঘর থেকে উধাও। তার দ্বিতীয় স্ত্রী বা গণিকারও পাত্তা নেই। সন্ধ্যায় মোসলেহুদ্দীন ঘরে ফিরেন এবং সোজা ঢুকে পড়েন প্রথমা স্ত্রীর কক্ষে। প্রেম-ভালোবাসার কথা শুরু করেন তার সাথে। তার কাছে আসতে চাইছিল না স্ত্রী। কিন্তু এক পর্যায়ে ভালোবাসার প্রতারণার জালে আটকে যায় মহিলা। মোসলেহুদ্দীন তাকে জানায়, যে লোকটি তাকে বিশ আশরাফী দিয়ে গিয়েছিল, তাকে খুঁজছে সে। খানিক পর ঘুমিয়ে পড়ে স্ত্রী। সে রাতের জন্য মোসলেহুদ্দীন তার চাকরদের ছুটি দিয়ে দিয়েছিলেন। ঘরময় স্তব্ধতা বিরাজ করছে, যেমনটি অতীতে কখনো দেখা যায়নি। মোসলেহুদ্দীন স্ত্রীর কক্ষে শুয়ে থাকেন দীর্ঘক্ষণ। তারপর উঠে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।
.
মধ্যরাত। মোসলেহুদ্দীনের ঘরের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে যায় এক ব্যক্তি। তার কাঁধের উপর চড়ে বসে একজন। দুজনকে সিঁড়ি বানিয়ে দেয়াল টপকে ভেতরে লাফিয়ে পড়ে তৃতীয় একজন। ভেতর থেকে প্রধান ফটক খুলে দেয় সে। ভেতরে ঢুকে পড়ে তার সঙ্গীদ্বয়।
প্রহরার জন্য একটি কুকুর আছে মোসলেহুদ্দীনের ঘরে। প্রতিরাতেই ছাড়া থাকে কুকুরটি। কিন্তু আজ রশি দিয়ে বাঁধা। সম্ভবত চাকররা যাওয়ার সময় কুকুরটি ছেড়ে যেতে ভুলে গেছে।
ঘোর অন্ধকার। পা টিপে টিপে এগিয়ে চলছে তিনজন। একজনের পিছনে আরেকজন। তার পিছনে অপরজন। মোসলেহুদ্দীনের স্ত্রীর (যার নাম ফাতেমা) কক্ষের দরজায় করাঘাত করে একজন। দরজা খুলে যায়। অন্ধকার। ভিতরে ঢুকে পড়ে তিনজন। অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে মহিলার খাটের কাছে চলে যায় তারা। ফাতেমার মুখে হাত পড়ে একজনের। চোখ খুলে যায় তার। মনে করেছিল স্বামী মোসলেহুদ্দীনের হাত। জাগ্রত হয়েই হাতটা ধরে ফেলে ফাতেমা জিজ্ঞেস করে, কোথায় যাচ্ছ তুমি?
জবাবে একজন একটি কাপড় গুঁজে দিলো তার মুখের মধ্যে। সাথে সাথে লোকগুলো ঝাঁপটে ধরে ফাতেমাকে। আরেকটি কাপড় কষে চোখ-মুখ বেঁধে ফেলে আরেকজন। একটি বস্তা বের করে মুখ মেলে ধরে একজন। অপর দুজন হাত-পা বেঁধে বস্তার ভেতর ভরে ফেলে ফাতেমাকে। রশি দিয়ে বেঁধে ফেলে বস্তার মুখ। দুজন বস্তাটি কাঁধে তুলে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
ঘটনার সময়ে ঘরে কোন চাকর ছিল না। দাসীরাও সব ছুটিতে। সামান্য দূরে গাছের সাথে বাঁধা ছিল তিনটি ঘোড়া। লোক তিনজন চড়ে বসে ঘোড়ার পিঠে। বস্তাটি নিজের সম্মুখে রেখে নেয় একজন। কায়রো থেকে বেরিয়ে ইস্কান্দারিয়া অভিমুখে রওনা হয় ঘোড়া তিনটি, ফিরে আসেন মোসলেহুদ্দীনও।
সকালবেলা চাকর-চাকরানীরা ফিরে আসে। ফাতেমাকে তালাশ করে মোসলেহুদ্দীন। দুজন চাকরানী খোঁজাখোজি করে এসে জানায়, তিনি ঘরে নেই। কোথায় গেল ফতেমা শুরু হয় তল্লাশী। কিন্তু বাড়ীময় তন্নতন্ন করে খুঁজে পেতেও পাওয়া গেল না মোসলেহুদ্দীনের প্রথমা স্ত্রী ফাতেমাকে।
এক চাকরানীকে নির্জনে নিয়ে যায় মোসলেহুদ্দীন। দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন তার সাথে। তারপর তাকে সাথে নিয়ে চলে যান গিয়াস বিলবিসের কাছে। মোসলেহুদ্দীন গিয়াস বিলবিসকে জানায়, গত রাতে আমার স্ত্রী নিখোঁজ হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, ফাতেমাই খিজরুল হায়াতকে হত্যা করিয়েছে এবং খিজির মৃত্যুর সময় হাতের আঙ্গুল দ্বারা যে মোসলেহ শব্দটি লিখেছিলেন, সেটি মূলত তিনি মোসলেহুদ্দীনের স্ত্রী লিখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মৃত্যু তাকে বাকীটুকু লিখতে দেয়নি। তার প্রমাণস্বরূপ মোসলেহুদ্দীন সাথে নিয়ে যাওয়া চাকরানীকে পেশ করে। চাকরানী বলে–
